সাপ বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর প্রাণী। সাপ দেখলে এমনিই অনেক মানুষের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার অবস্থা হয়। তার উপর সেই সাপ যদি হয় বিষাক্ত শঙ্খচূড়, চন্দ্রবোড়া বা গোখরো— তা হলে তো আর কথাই নেই।
তবে ভারতে বহু মানুষ এই সাপকেই ঈশ্বরের স্থানে বসান। অনেকেই সংস্কারের বশে সাপকে দুধ-কলা দিয়ে পুজোও করেন। পুরাণমতে, শিব বা মা মনসার সঙ্গে সাপের নিবিড় সম্পর্ক, তাই সুখ-শান্তির জন্য সাপের পুজো করেন অনেক গৃহস্থই।
কিন্তু জ্যান্ত সাপ যদি সামনে এসে যায়! ফণা তুলে দাঁড়ায়! প্রায় প্রত্যেকেরই ঘাম ছুটে যায়। শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় শীতল স্রোত। প্রাণে বাঁচতে হয় সে জায়গা ছেড়ে পালান না হলে লাঠিপেটা করে করুণ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয় ভুজঙ্গকে।
কিন্তু সে দিক থেকে অনন্য মহারাষ্ট্রের শ্বেতফল গ্রাম। সেই গ্রামে মানুষ আর সাপেদের মধ্যে অদ্ভুত সহাবস্থান। কেউই একে অপরকে ভয় পায় না। অত্যন্ত বিষধর সাপ স্বাধীন ভাবে গৃহস্থের বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়! তাদের দেখে আতঙ্কিত হয়ে মারতে যান না কেউ।
অবিশ্বাস্য হলেও সে কথা সত্যি। এটাই ভারতের একমাত্র গ্রাম যেখানে এমন নজির গড়ে উঠেছে এবং সাপের কামড়ে এখনও পর্যন্ত এই গ্রামে কোনও মৃত্যুও ঘটেনি বলে বলা হয়।
হারাষ্ট্রের সোলাপুর জেলার কারমালা তালুকের একটি গ্রাম শ্বেতফল। প্রায় ১,৭০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে গ্রামটি। ২০১১ জনশুমারি অনুযায়ী, এই গ্রামে মোট ৫১৭ পরিবারের বাস। জনসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার।
পুণে থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে গ্রামটি। শুষ্ক জলবায়ুর কারণে নানা প্রজাতির সাপেদের বসবাসের আদর্শ জায়গা শ্বেতফল। এই গ্রামের বাসিন্দাদের প্রত্যেকের মনেই যে কোনও প্রজাতির সাপের প্রতি অগাধ ভক্তি।
ভারতের অনেক অংশে নাগপঞ্চমীর মতো উৎসবের সময় সাপ পুজো করা হলেও, শ্বেতফলে এটি দৈনন্দিন জীবনেরই একটি অংশ। শ্বেতফলের বাসিন্দারা সাপকে পবিত্র প্রাণী হিসাবে গণ্য করেন। মহারাষ্ট্রের ওই শান্ত গ্রামে বাড়ির চারপাশে সাপের ঘোরাঘুরি, এমনকি ঘরে ঢুকে পড়াকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। ভয়ে চিৎকার করা বা তাদের তাড়ানোর চেষ্টা করার পরিবর্তে, বাসিন্দারা শান্ত থাকেন এবং তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যান।
গোখরো, কেউটে, চন্দ্রবোড়া, শাখামুটি-সহ নানা প্রজাতির বিষধর সাপ রয়েছে শ্বেতফল গ্রামে। তবে গোখরোর আধিক্যই বেশি। গ্রামের বড়রাই শুধু নয়, বাচ্চারাও সাপকে দেখে ভয় পায় না। সাপ নিয়েই খেলা করে তারা, ঠিক যেন তাদের খেলনা।
আরও অবাক করা বিষয় হল, প্রতি বাড়িতেই সাপেদের থাকার আলাদা ব্যবস্থাও করা রয়েছে শ্বেতফল গ্রামে। সাপ ইচ্ছামতো সময়ে ঘরে ঢুকে সেই স্থানে বিশ্রামও নেয়। আবার ইচ্ছা হলে বেরিয়ে যায়।
বিশ্রামাগারে সব সময়ই সাপের ‘খাবার’ও (দুধ) মজুত রাখা হয়। তবে এটা নেহাতই কুসংস্কার। সাপ সরীসৃপ প্রাণী। আর দুধ সরীসৃপদের জন্য মোটেও ভাল খাদ্য নয়।
কিন্তু শ্বেতফলে কি কখনও কাউকে সাপ কামড়ায়নি? গ্রামবাসীদের দাবি, এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে এই গ্রামে সিদ্ধেশ্বরের একটি মন্দির রয়েছে। সেখানে সাতমুখো কেউটে সাপ সিদ্ধেশ্বরের মাথার উপর ফণা তুলে রয়েছে। তামার এই দেবতার প্রতি তাঁদের অগাধ বিশ্বাস। তিনিই নাকি সাপে কাটা রোগীকে প্রাণ ফিরিয়ে দেন প্রতি বার। বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, এ-ও নেহাতই কুসংস্কার।
সর্প বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সাপ কখনও পোষ মানে না। এরা নিজেদের বিষের প্রয়োগ মাত্র দুই কারণে করে থাকে। এক, শিকার ধরার সময় এবং দুই, বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচাতে। অনেক সময় এমনও হয় যে, বিষাক্ত সাপ কামড় বসালেও বিষ ঢালে না, ‘ড্রাই বাইট’ বা শুকনো কামড় দেয় মাত্র।
কবে থেকে এবং কী ভাবে শ্বেতফলবাসীর মধ্যে এই অভ্যাস শুরু হয়েছিল তা অজানা। তবে মহারাষ্ট্রের এই গ্রামের কথা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে পর্যটকেরা ভিড় করেন এই গ্রামে। সাপের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান কাছ থেকে দেখে নেন তাঁরা।
তবে এখানে আর একটা বিষয়ও জানানো দরকার। কেউ কেউ মনে করেন, পর্যটনের প্রসারের জন্য এখানে সাপেদের উপরে নির্মম অত্যাচারও চলে। সাপ যাতে কামড়াতে না পারে, সে জন্য তার বিষদাঁত ভেঙে ফেলা হয়, বিষগ্রন্থি পর্যন্ত ছিঁড়ে দেওয়া হয়। অনেক সাপের মুখও নাকি সেলাই করে আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে না খেতে পেয়ে বা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক সাপ।
শ্বেতফল ভ্রমণের আদর্শ সময় সাধারণত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে, যখন আবহাওয়া তুলনামূলক ভাবে ঠান্ডা এবং ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক থাকে। এই অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম পড়তে পারে, যা দিনের সর্বোচ্চ সময়ে ভ্রমণকে কঠিন করে তোলে।
পর্যটকদের জন্য একাধিক নিয়মাবলিও রয়েছে শ্বেতফল গ্রামে। আগত পর্যটকদের স্থানীয় রীতিনীতি এবং ঐতিহ্যকে সম্মান করার অনুরোধ করা হয়েছে সেই নিয়মাবলিতে। দর্শনার্থীদের কোনও অবস্থাতেই সাপের ক্ষতি না করতে, উত্ত্যক্ত না করতে বা তাদের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাপ স্পর্শ করা বা ধরার চেষ্টার বিরুদ্ধেও জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে।