Math Tuition Culture of South Korea

‘আকাশ’ ছোঁয়াতে লক্ষ লক্ষ টাকা নেন ‘গণিতের ঈশ্বর’! যে দেশে গণিত শিক্ষকের আয়ের কাছে নায়ক-নায়িকাদের আয় শিশু!

দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে) এক শিক্ষক গণিতের উপর ভর করে হয়ে উঠেছেন তারকা। নাম হ্যুন উ-জিন। গণিতের কল্যাণে তিনি কেবল খ্যাতিই পাননি, তাঁর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সও ফুলেফেঁপে উঠেছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ ১৬:৫৯
Share:
০১ ১৭

গণিত বড়ই মজার একটা বিষয়। যাঁরা এই বিষয়টিকে ভালবাসেন, জটিল থেকে জটিলতর সমস্যাও তাঁরা সহজেই করে ফেলতে পারেন। তবে গণিতে যাঁদের ‘মাথা’ থাকে না, এই বিষয়টির থেকে খারাপ বোধ হয় তাঁদের আর কোনও কিছুই লাগে না। আমাদের আশপাশে সাধারণত এমনটাই হতে দেখা যায়।

০২ ১৭

ছোটবেলায় যোগ, বিয়োগ, গুণ-ভাগ, দু’য়ের নামতা, এ সমস্ত জিনিস দিয়ে গণিত-জীবনের হাতেখড়ি হলেও, বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়টির জটিলতা বাড়তে থাকে। তা বলে ছোটবেলায় শিখে আসা জিনিসগুলি ভুলে গেলে কিন্তু চলে না। তখন নামতাও মনে রাখতে হয়, আবার কঠিন ক্যালকুলাসও না মিললে মাথার চুল ছিঁড়তে হয়।

Advertisement
০৩ ১৭

ছাত্রসমাজের প্রচলিত মত অনুয়ায়ী, গণিতের চেয়েও বেশি খারাপ হন এই বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এ কথা যে কেবল যারা গণিত পারে না তাদের মধ্যেই প্রচলিত তা আর বলার বাকি রাখে না। সে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ‘খারাপ’ বলার কারণ একটাই, গণিত যে কঠিন তা এঁরা মানতে চান না। ‘ভোঁতা’ মাথায় গণিত ঢোকানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকেন এঁরা। ছাত্রছাত্রী হার মেনে নিলেও, তাঁরা হার মানতে নারাজ।

০৪ ১৭

এই হার না মানা হয়তো গণিতের প্রতি প্রেম না থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের দেশের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চক্ষুশূল করে তোলা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে) এক শিক্ষক গণিতের উপর ভর করেই হয়ে উঠেছেন তারকা।

০৫ ১৭

সেই শিক্ষকের নাম হ্যুন উ-জিন। গণিতের কল্যাণে তিনি কেবল খ্যাতিই পাননি, তাঁর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সও ফুলেফেঁপে উঠেছে। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় গণিতের সবচেয়ে দামি মাস্টারমশাই।

০৬ ১৭

এমনকি প্রিমিয়ার লিগ খেলা বিশ্ববিখ্যাত কোরিয়ান ফুটবলার সন হিউং-মিনের থেকেও বেশি অর্থের মালিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হ্যুন। ভারতীয় মুদ্রায় বার্ষিক তিনি প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা আয় করেন, যা দক্ষিণ কোরিয়ার নামী অভিনেতা-অভিনেত্রী, পপতারকা এবং ফুটবলারদের আয়ের চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বেশি।

০৭ ১৭

তবে কেবল হ্যুন নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার গণিতের শিক্ষকদের বাজার বাকিদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশিই গরম। সেখানকার অভিভাবকেরা লক্ষাধিক টাকা বেতন দিয়ে ছেলেমেয়ের জন্য গণিতের শিক্ষক রাখার আগে দু’বার ভাবেন না। নেপথ্যে রয়েছে একটি পরীক্ষা। সুনেয়ুং। সেটি ‘কলেজ স্কলেস্টিক এবিলিটি টেস্ট’ বা সিএসএটি নামেও পরিচিত।

০৮ ১৭

সুনেয়ুং বা সিএসএটিকে ঘিরে সেখানকার অভিভাবক-অভিভাবিকা-সহ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কাজ করে এক চাপা উদ্বেগ। আর সেই উদ্বেগকে কাজে লাগিয়েই সেখানকার গণিত শিক্ষকেরা কোটিপতি হয়ে ওঠেন।

০৯ ১৭

তবে সুনেয়ুং উদ্বেগ সৃষ্টি করার মতোই একটি বিষয়। আমাদের চলতি বাংলায় যেটিকে কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষজনের কাছে সেটিই সুনেয়ুং। কিন্তু কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা শুনে যদি তা ‘আর এমনকি বিষয়’ বলে ভাবেন, তা হলে খুবই ভুল করছেন।

১০ ১৭

প্রতি বছর শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী সুনেয়ুং পরীক্ষায় বসলেও, পাশ করেন হাতেগোনা কয়েক জন। তাঁরা সেই রাষ্ট্রের নামী তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। বাকিদের ঠাঁই হয় অন্যান্য কলেজে।

১১ ১৭

দক্ষিণ কোরিয়ার সেই নামী তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে সিওল ন্যাশনাল, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি এবং ইওনসেই ইউনিভার্সিটি। এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নামের আদ্যাক্ষরগুলিকে মিলিয়ে এদের একত্রে ‘স্কাই’ বলা হয়। ছেলেমেয়েকে ‘স্কাই’ ছোঁয়ানোর স্বপ্নেই বাবা-মায়েরা সঞ্চয়ের অর্ধেকের বেশি টাকা উড়িয়ে দেন গণিত শিক্ষকের পিছনে।

১২ ১৭

এ তো গেল ‘স্কাই’য়ের গল্প। এ বার আসা যাক পরীক্ষার ঘনঘটা নিয়ে। প্রতি বছরের নভেম্বরে সুনেয়ুং পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেই দিন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় দক্ষিণ কোরিয়া। রাষ্ট্র জুড়ে কাজ করে ‘সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা’ সংঘটিত হওয়ার উদ্বেগ।

১৩ ১৭

৯ ঘণ্টা ধরে চলে এই বিশেষ পরীক্ষা। গণিত ছাড়াও ইংরেজি শ্রবণের বোধগম্যতার পরীক্ষাও করা হয়। বিশেষ এই পর্যায়টি ৩৫ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সেই সময় দক্ষিণ কোরিয়ার বিমানবাহিনী নিজেদের প্রশিক্ষণ পর্ব বন্ধ রাখে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর ইঞ্চিয়ন আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরেও বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়।

১৪ ১৭

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশেষ এই দিনে ছাত্রছাত্রীদের পূর্ণ সহায়তা প্রদান করে। এই দিন সকাল থেকে সাইরেন লাগানো বাইক নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান পুলিশকর্মীরা। যানজটে আটকে পড়া বা অন্য যে কোনও প্রকার বিপদ থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে সময়ের মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই হয় তাঁদের সে দিনের মূল কর্তব্য।

১৫ ১৭

সুনেয়ুং থেকে বাছাই করা হয় সেই দেশের নামী কর্পোরেট সংস্থাগুলির ভবিষ্যতের সিইও-দের। সেই কারণে গণিতের প্রশ্নপত্রে রাখা হয় কল্পনাতীত কঠিন সব প্রশ্ন। সেই প্রশ্নগুলি ‘কিলার কোশ্চেন’ হিসাবে খ্যাত। সরকারি স্কুলে পড়ানো পাঠ্যক্রমের বাইরে থেকে আসে এ সকল প্রশ্ন। সেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সে সমস্ত বিষয়ে পাঠ দেওয়ার উপরও থাকে কড়া নিষেধাজ্ঞা। অগত্যা দ্বারস্থ হতে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।

১৬ ১৭

এই কারণেই বিত্তশালী হয়ে ওঠেন হ্যুনের মতন শিক্ষকেরা। স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করা হ্যুন গণিতের জটিল সমস্যাকে সহজে সমাধান করার কায়দা শিখিয়ে দেন শিক্ষার্থীদের। হ্যুনের লেখা বই ‘নিউরোন’-এর প্রতি পাতায় রয়েছে এমন নানা ‘কিলার কোশ্চেন’-এর সহজ বিশ্লেষণ। প্রতি বছর এই বইয়ের ১০ লক্ষেরও বেশি কপি বিক্রি হয়, তেমনটাই জানাচ্ছে পরিসংখ্যান।

১৭ ১৭

সেই কারণে দিন দিন দক্ষিণ কোরিয়ায় স্কুলছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, গৃহশিক্ষকের কাছে দ্বারস্থ হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষাধিক টাকা খরচ করে সন্তানদের পড়িয়ে বাবা-মায়েরা লাভ করছেন নিশ্চয়তা এবং শান্তি। তাঁরা মনে করছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এ পথে এগোলেই উজ্জ্বল হবে। কিন্তু এই কারণে যে নিভৃতে প্রতিযোগিতার বাজারও বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই ধারণা বড় স্বপ্ন দেখা দক্ষিণ কোরিয়ার মা-বাবার মনকে এখনও ছুঁতে পারেনি।

সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement