মাঝ-আকাশে শত্রুর যুদ্ধবিমানকে দিকভ্রান্ত করে দেওয়া। কিংবা, ঘরে বসে বিপক্ষের ছাউনির হাঁড়ির খবর জোগাড় করা। ইরানি সাইবার হামলায় তটস্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল! শুধু তা-ই নয়, তেহরানের চালে ‘অকেজো’ হয়ে পড়ছে আমেরিকার গর্বের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ লড়াকু জেট এফ-৩৫ লাইটনিং টু। আর তাই সাবেক পারস্যের আকাশ দখলে আপাতত এই বিমানের ব্যবহার বন্ধ রেখেছে ইহুদি বায়ুসেনা।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু দিন আগে ইরানের বুকে বড়সড় হামলা চালাতে এফ-৩৫ জেটে চড়ে দেশটির আকাশসীমায় ঢোকে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী। কিন্তু, আক্রমণ স্থগিত রেখে তড়িঘড়ি নিজেদের ছাউনিতে ফিরে আসে তারা। পরে জানা যায়, এফ-৩৫-এর দিকনির্ণয় ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভুল পথে চালিত করছিল তেহরানের ফৌজ। সেটা বুঝতে পেরেই ‘অপারেশন’ স্থগিত করেন তেল আভিভের যোদ্ধা-পাইলটরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এফ-৩৫ যে সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে, সেটা বুঝতে পারায় বিরাট বিপদ এড়িয়েছে ইজ়রায়েল। নইলে সম্পূর্ণ ভুল নিশানায় হামলা চালিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা নষ্ট করত তারা। আর অস্ত্র শেষ হলে পাল্টা ইরানি ড্রোনের শিকার হতে হত তাদের। সে ক্ষেত্রে কয়েক কোটি ডলার মূল্যের বেশ কয়েকটি এফ-৩৫ ধ্বংস হওয়া এবং পাইলটদের মৃত্যুও হয়ত এড়াতে পারত না ছোট্ট ওই ইহুদি রাষ্ট্র।
কিন্তু প্রশ্ন হল, কী ভাবে এফ-৩৫কে দিকভ্রান্ত করছে ইরান? এর জবাবে একটি শব্দই ব্যবহার করছেন সাবেক সেনাকর্তারা। সেটা হল ‘জিপিএস স্পুফিং’। একে এক রকমের হ্যাকিং বলা যেতে পারে। তার জন্য ‘গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম’ বা জিএনএসএসে লাগাতার সাইবার আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। কারও মতে গোটা বিষয়টার নেপথ্যে আছে রাশিয়া এবং চিনের কুখ্যাত হ্যাকার বাহিনী।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’-এর তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির এফ-৩৫-এর সাফল্য অনেকাংশেই ‘গ্লোবাল পজ়িশনিং সিস্টেম’ বা জিপিএসের উপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো শত্রুর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালিয়ে থাকে এই জেট। আর তাই এর ককপিটে রয়েছে একাধিক সেন্সর। এর সাহায্যে প্রচণ্ড গতিতে থাকা অবস্থায় লক্ষ্য খুঁজে নিতে সমস্যা হয় না পাইলটের।
সামরিক বিশ্লেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো দিকনির্দেশ (নেভিগেশন) মাঝপথে আটকে ভুল তথ্য এফ-৩৫র ককপিটে পাঠাচ্ছে ইরানি হ্যাকারবাহিনী। ফলে দিকভ্রান্ত হচ্ছেন মার্কিন বা ইহুদি পাইলটরা। এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক লড়াকু জেট হারানোর নেপথ্যে এটা অন্যতম বড় কারণ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
উল্লেখ্য, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে গোড়া থেকেই ‘জিপিএস স্পুফিং’-এ এগিয়ে ছিল ইজ়রায়েল। অতীতে এই ধরনের ‘ইলেকট্রনিক্স’ যুদ্ধকৌশলে নিজেদের জাত চিনিয়েছে তেল আভিভ। শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটকে বার বার ভুল পথে পাঠাতে দেখা গিয়েছে তাদের। সেই কায়দাই এ বার ইরানি ফৌজ গ্রহণ করায় ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির উদ্বেগ যে বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইরান মদতপুষ্ট প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাস, হিজ়বুল্লা ও হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধে বহুল পরিমাণে ‘জিপিএস স্পুফিং’ ব্যবহার করে ইজ়রায়েলি ফৌজ। ওই সময় বিভিন্ন দিক থেকে হাজার হাজার রকেট ছুড়ে ইহুদিদের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় ছিল তারা। কিন্তু, ইহুদিদের সফল জিএনএসএস হ্যাকিংয়ের ফলে সেই লক্ষ্যে সফল হয়নি তারা।
তবে, ইজ়রায়েলি ‘জিপিএস স্পুফিং’-এর ফলে পশ্চিম এশিয়ায় ঝুঁকির মুখে পড়ে যাত্রিবাহী বিমানের চলাচল। ওই এলাকা দিয়ে উড়োজাহাজ নিয়ে যাওয়ার সময় পাইলটরা পাচ্ছিলেন ভুল তথ্য। বহু ক্ষেত্রে বিমানের দিকনির্ণয় ব্যবস্থা বা নেভিগেশন সিস্টেমকে পুরোপুরি ইহুদি হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই নিয়ে সরব হয় ভারত-সহ একাধিক দেশ। এর জেরে ‘জিপিএস স্পুফিং’-এ কিছুটা রাশ টানে তেল আভিভ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এফ-৩৫র সমস্ত কিছুই ‘গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম’-এর উপর নির্ভরশীল। এর সাহায্যেই শত্রুর দেশের ভিতরে ঢুকে কোন দিকে যেতে হবে, কী ভাবে আক্রমণ করতে হবে, তার যাবতীয় নির্দেশ পেয়ে থাকেন যোদ্ধা-পাইলট। মার্কিন লড়াকু জেটটিতে যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়, তার দিকনির্দেশও করে থাকে জিপিএফ। ইরানি হ্যাকাররা সেখানেই থাবা বসানোয় যুদ্ধবিমানগুলি দুর্বলতা বেআব্রু হয়ে গিয়েছে।
বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসারেরা অবশ্য তেহরানের এই যুদ্ধকৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের যুক্তি হল, জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করেও মার্কিন ও ইহুদি বায়ুসেনার এফ-৩৫ আটকানোর চেষ্টা করতে পারত তেহরান। কিন্তু, তারা সেটা করিনি। কারণ, আধুনিক প্রযুক্তিতে সিগন্যাল জ্যামিং ধরে ফেলার একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। সেখানে ‘জিপিএস স্পুফিং’ অনেক বেশি বিপজ্জনক।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জিপিএস হ্যাকিং ঠিক মতো হলে এফ-৩৫-এর ককপিটে থাকা পাইলট শত্রুর বদলে নিজেদের ছাউনিতে হামলার নির্দেশও পেতে পারেন। লড়াকু জেটটি থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রও দিকভ্রান্ত হয়ে নিজেদের ঘাঁটি বা গুরুত্বপূর্ণ শহরের দিকে যে ছুটবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সেই আশঙ্কা থেকে ইরানে ঢুকেও আক্রমণ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় ইজ়রায়েল।
ইহুদি গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’-এর সন্দেহ, লড়াকু জেটের ‘জিপিএস স্পুফিং’ করতে পশ্চিম ইরান, পূর্ব সিরিয়া এবং লেবাননের বুখারা উপত্যকা ব্যবহার করছে ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এ ব্যাপারে তাঁদের অন্যতম সহযোগী হল প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা। বেরুটে তাদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। আর তাই তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই তাদের সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে তেল আভিভকে।
২০১১ সালে দিকভ্রষ্ট হয়ে ইরানে আছড়ে পড়ে আরকিউ-১৭০ নামের একটি মার্কিন গুপ্তচর ড্রোন। সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে প্রতিরক্ষা গবেষকদের কাছে পাঠায় আইআরজিসি। করা হয় তার ফরেন্সিক পরীক্ষাও। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ওই ড্রোন থেকেই আমেরিকার হাতিয়ারে থাকা জিপিএস ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ হদিস ও তথ্য হাতে পায় তেহরান। এর উপর ভিত্তি করে বর্তমানে কাজ করছে তাদের হ্যাকার বাহিনী।
তবে ইরানি সাইবার হামলা শুধুমাত্র এফ-৩৫ই সীমাবদ্ধ আছে, তা ভাবলে ভুল হবে। চলতি বছরের মার্চে চিকিৎসা সরঞ্জাম নির্মাণকারী একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যভান্ডারে হামলা চালায় তেহরানের হ্যাকারবাহিনী। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গায়েব হয়ে যায় সেখানকার যাবতীয় নথি। সূত্রের খবর, ওই সময় ৭৯টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ওই সংস্থার দু’লাখের বেশি ডিভাইসের উপর ঘরে বসে নজরদারি করছিল আইআরজিসি।
ইরানি সাইবার হামলার জেরে গত মার্চে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত স্থগিত করে দেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের একাধিক হাসপাতাল। তদন্তে জানা যায়, এই কাজে ‘হান্ডালা’ হ্যাকারবাহিনীকে কাজে লাগিয়েছে তেহরান। সাবেক পারস্যের গোয়েন্দাবিভাগ এবং নিরাপত্তা মন্ত্রকের হয়ে কাজ করছে তারা। মোসাদের দাবি, মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী সিআইএর অনুকরণে একে তৈরি করেছে উপসাগরীয় ওই শিয়া মুলুক।
ইজ়রায়েলি গণমাধ্যমগুলির জানিয়েছে, ‘হান্ডালা’ হ্যাকারবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ ইয়াহিয়া হুসেইনি পাঞ্জাকি। তেহরানকে সাইবার যুদ্ধকৌশলে পটু করে তোলেন তিনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইহুদিদের যৌথ অভিযানে প্রাণ হারান শিয়া ধর্মগুরু তথা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই। ওই সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন পাঞ্জাকি। ওই আক্রমণে মৃত্যু হয় তাঁরও।
বর্তমানে পাঞ্জাকির স্থলাভিষিক্ত কাকে করা হয়েছে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর মৃত্যুর পর ‘জিপিএস স্পুফিং’ এবং বিভিন্ন পশ্চিমি টেক জায়ান্টগুলির হাঁড়ির খবর ফাঁসে সাইবার আক্রমণের ঝাঁজ বাড়িয়েছে তেহরান। কিছু দিন আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের (ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন) শীর্ষপদে থাকা কাশ পটেলের ইমেল হ্যাক করে ইরানি ‘হান্ডালা’ বাহিনী। তদন্তে নেমে এর এখনও কোনও কিনারা করতে পারেনি আমেরিকা।
গত ২৮ মার্চ ২৮ জন মার্কিন সামরিক ইঞ্জিনিয়ারের নাম, বাড়ির ঠিকানা ও পাসপোর্ট নম্বর-সহ একাধিক ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দেয় তেহরান। এরা প্রত্যেকেই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা লড়াকু জেটের বহরের সঙ্গে যুক্ত। সাইবার হামলার মাধ্যমেই তাঁদের হাঁড়ির খবর ‘হান্ডালা’ বাহিনী হস্তগত করেছে বলে একরকম নিশ্চিত ওয়াকিবহাল মহল।
মে মাসের গোড়ায় ইরানি হ্যাকারদের বিষয়ে সতর্ক করে একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রের দুঁদে গোয়েন্দাকর্তারা। সেখানে বলা হয়েছে, বেছে বেছে এফ-২২ র্যাফটার, এফ-৩৫ লাইটনিং টুর মতো জেট এবং থাড (টার্মিনাল হাইঅলটিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিশানা করছে তেহরানের ‘হান্ডালা’। এ ছাড়া আমেরিকার পানীয় জল পরিশোধন কেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রেও সাইবার হামলা চালাতে পারে তারা।