ভারতের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের হাতে হাত তালিবানের। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধরত পূর্ব ইউরোপের ‘সুপার পাওয়ার’-এর সঙ্গে সামরিক চুক্তি সেরে ফেলল হিন্দুকুশের কোলের পঠানভূমি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ক্রমাগত ‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। আর তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা সমঝোতায় ইসলামাবাদের রাতের ঘুম উড়তে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
গত ২৭ মে, বুধবার মস্কোয় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরাম’-এ রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তি সারে তালিবান শাসিত আফগানিস্তান। ওই সমঝোতাপত্রে সই করেন কাবুলের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব। ২০২১ সালের অগস্টে দ্বিতীয় বারের জন্য পঠানভূমির ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুলাইয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ক্রেমলিন।
তালিবান নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কুর্সিতে বসলেও বিশ্বের কোনও রাষ্ট্র এখনও তাঁদের মান্যতা দেয়নি। সেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম রাশিয়া। শুধু তা-ই নয়, বছর ঘুরতেই উচ্চ পর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনে তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে মস্কো। একে ক্রেমলিনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসাবেও দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সই হওয়া সামরিক চুক্তির ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি দেয়নি রুশ ও তালিবান। গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ইয়াকুব বলেন, ‘‘আমরা মস্কোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রসারিত করেছি। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ক্রেমলিন আমাদের যে সহযোগিতা দিচ্ছে, তার গুরুত্ব অপরিসীম।’’ তাঁর এই মন্তব্যের পরে এ ব্যাপারে তীব্র হয়েছে একাধিক জল্পনা।
পশ্চিমি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই চুক্তির জন্য ইউক্রেন রণাঙ্গনে মস্কোর সাফল্যকে নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ পঠান যোদ্ধাদের সরবরাহ করবে আফগান-তালিবান। ২০২৪ সালের জুনে উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকের (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া) সঙ্গে ঠিক এই ধরনের একটি সমঝোতা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বর্তমানে এর সুফল পাচ্ছে ক্রেমলিন।
মস্কো-পিয়ংইয়ং চুক্তির শর্ত মেনে গত দু’বছরে রাশিয়ায় কয়েক হাজার সৈনিক পাঠিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) কিম জং-উন। ইউক্রেনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের ঢালাও ব্যবহার করেছে মস্কো। পুতিনের এই ধরনের সমঝোতায় যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটাই কারণ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলা কিভের লড়াইয়ে কয়েক হাজার সৈনিক হারিয়েছেন তিনি।
সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ আবার মনে করেন, মস্কোর সঙ্গে কাবুল এবং পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কের বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের যুক্তি, মূলত দু’টি কারণে পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তালিবান নেতৃত্ব। এর এক দিকে রয়েছে আমেরিকা ও অপর দিকে পাকিস্তান। গত এক বছরে এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়েছে তাঁদের।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথের কয়েক মাসের মধ্যেই আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চেয়ে হুঙ্কার দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডিসেম্বর আসতে আসতে পাকিস্তানের সঙ্গে শুরু হয় সীমান্ত সংঘাত। ফেব্রুয়ারিতে কাবুলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসলামাবাদ, যার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন গজ়ব লিল-হক’ (ন্যায়ের প্রতিশোধ) রেখেছেন রাওয়ালপিন্ডির কমান্ডারেরা।
আফগান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই সক্রিয় আছে ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ বা টিটিপি নামের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ইসলামাবাদের চোখে তাঁরা সন্ত্রাসবাদী। রাওয়ালপিন্ডির অভিযোগ, পর্দার আড়াল থেকে এই টিটিপিকে মদত দিচ্ছে কাবুলের তালিবান সরকার। সীমান্তের ওপারে ‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ই আছে তাঁদের গুপ্তঘাঁটি।
পাকিস্তানের এই অভিযোগ অবশ্য পত্রপাঠ উড়িয়ে দিয়েছে আফগান তালিবান। এর জেরে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাবুলের বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধই ঘোষণা করে ইসলামাবাদ। সঙ্গে সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনীর নিশানায় চলে আসে সীমান্তবর্তী পাকতিকা-সহ পঠানভূমির একাধিক প্রদেশ। রাজধানী কাবুলেও বোমাবর্ষণ করে তারা। এর জবাবে জোরালো প্রত্যাঘাত শানাতে পারেনি ইয়াকুবের ফৌজ।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, এই পরিস্থিতিতে মস্কোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ায় আফগান তালিবানের হাতে উঠতে পারে অত্যাধুনিক রুশ হাতিয়ার। বিনিময়ে পঠানভূমি থেকে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট’ বা দায়েশকে সম্পূর্ণ নির্মূলের প্রতিশ্রুতি আদায় করা ক্রেমলিনের পক্ষে কঠিন নয়। তবে কাবুল যোদ্ধা সরবরাহ করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সম্প্রতি এই ইস্যুতে মুখ খোলেন নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা নজরদার সংস্থা ‘অবজ়ারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর গবেষক আলেক্সেই জ়াখরভ। তাঁর কথায়, ‘‘উত্তর কোরিয়াকে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। বিনিময়ে সৈন্য সরবরাহ করছেন কিম। কিন্তু কাবুলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। আর তাই ইউক্রেনের লড়াইয়ে পঠান যোদ্ধাদের তালিবান পাঠাবে, সেই আশা না করাই ভাল।’’
জ়াখরভ জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের জমিতে পাক ফৌজ ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’-এ নামলে আরও জটিল হতে পারে পরিস্থিতি। তখন দেশরক্ষায় বিপুল সৈনিকের প্রয়োজন হবে কাবুলের। আর তাই ইসলামাবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বস্তি পেতে তাঁদের চাই মস্কোর হাতিয়ার। ক্রেমলিনের আবার পঠানভূমি নিয়ে অন্য হিসাব রয়েছে। সোভিয়েত আমল থেকেই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে ‘বাড়ির উঠোন’ বলে ভেবে এসেছে রাশিয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে পুতিনের অন্যতম মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট’ বা দায়েশ। তাদের একটি আঞ্চলিক শাখা হল আইএসআইএস-খোরাসান। মস্কোর গোয়েন্দাদের দাবি, বর্তমানে তাজ়িকিস্তান, উজ়বেকিস্তান, কিরঘিজ়স্তান, কাজ়াখস্তান এবং রাশিয়ায় কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে কট্টরপন্থা ছড়াচ্ছে তারা। চলছে সদস্য সংগ্রহও।
আইএসআইএস-খোরাসানের এ-হেন বাড়বাড়ন্ত ক্রেমলিনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। আর তাই সদ্য সই হওয়া সামরিক চুক্তিতে এই সংক্রান্ত কোনও বিষয় থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও ‘ইসলামিক স্টেট’-এর উপস্থিতির কথা খারিজ করেছেন তালিবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। তাঁর কথায়, ‘‘আফগানিস্তানে কোনও জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় নেই।’’
সাবেক সেনাকর্তারা জানিয়েছেন, আরও একটি বিষয় পুতিন-তালিবানকে কাছাকাছি আসতে সাহায্য করেছে। নিষেধাজ্ঞার নামে রাশিয়া ও আফগানিস্তান, দু’টি দেশেরই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আটকে রেখেছে পশ্চিমি দুনিয়া। অবিলম্বে সেটা শৃঙ্খলামুক্ত করার দাবি তুলে চুক্তির সময় সুর চড়ায় মস্কো।
চুক্তির পর পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও রুশ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগু বলেন, ‘‘পশ্চিমি দেশগুলির আটকে রাখা আফগানিস্তানের যাবতীয় সম্পত্তি অবিলম্বে মুক্ত করা উচিত। ২০ বছর ধরে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তারা। সেই ঘটনার দায় নিয়ে এখন দেশটির পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব নিতে হবে তাদের।’’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে পাকিস্তান, এমনটাই অভিযোগ বিভিন্ন মহলে। আফগানিস্তানের ভিতরে সন্ত্রাসবাদের বীজ বোনার ক্ষেত্রেও ইসলামাবাদের প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে, কাবুলের সঙ্গে সামরিক চুক্তির পর নাম না করে সেই বিষয়ে বার্তা দিয়েছেন শোগুই।
রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘‘আফগানিস্তান বা তার আশপাশের দেশগুলিতে মার্কিন সেনাঘাঁটি গজিয়ে ওঠাকে আমরা কখনওই সমর্থন করতে পারি না। আর সেটা আমাদের তালিবান বন্ধুদের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের স্বাধীন ও সার্বভৌম মর্যাদাকে সম্মান করতে হবে।’’
সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, রুশ হাতিয়ার হাতে পেলে পাকিস্তানে আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াবে আফগান তালিবান। ইসলামাবাদের সামরিক ছাউনি, লড়াকু জেট এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিশানা করতে পারে তাঁরা। ভারতের জন্য সেটা যে সুখবর হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। তবে মস্কো কী ধরনের হাতিয়ার কাবুলকে সরবরাহ করে সেটাই এখন দেখার।