সত্যি ঘটনা অবলম্বনে অনেক সিনেমা-সিরিজ়-শো তৈরি হয়। কিন্তু কখনও রিয়্যালিটি শোর সাহায্যে বহু বছরের পুরনো খুনের ঘটনার কিনারা হওয়ার কথা কেউ শুনেছে? অবিশ্বাস্য মনে হলেও তেমনটা ঘটেছিল। ঘটেছিল খোদ ভারতেই।
একটি টেলিভিশন রিয়্যালিটি শো-তে সাধারণ কথাবার্তার সূত্র ধরে আট বছর আগে ঘটে যাওয়া একসঙ্গে তিনটি খুনের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছিল ১৪ বছর আগে। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হয়েছিল অভিযুক্ত দুই ভাইয়ের।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৮ সাল। ২০০৮ সালে ১৬ বছর বয়সি কিশোরী লাবণ্য এবং তার স্বামী সিলাম্বারাসনকে খুন করেন তামিলনাড়ুর ভেল্লাপুরমের বাসিন্দা পেশায় কাঠমিস্ত্রি ই মুরুগান এবং তাঁর ট্রাকচালক ভাই মাথিয়ারাসন। পরে মেয়ের খোঁজে আসা লাবণ্যের বাবা শেখরকেও খুন করে ভ্রাতৃদ্বয়।
তিন জনের দেহই এর পর নিজেদের বাড়ির কাছে একটি পুরনো কুয়োর পাশে পুঁতে রেখেছিলেন মুরুগান এবং মাথিয়ারাসন। পরিবারের তরফে তিন জনকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনও লাভ হয়নি। লাবণ্য, তার স্বামী এবং বাবা যে খুন হয়েছেন, তেমনটাও সন্দেহ করেননি কেউ।
জঘন্য অপরাধ করে ভালই কাটছিল মুরুগান এবং মাথিয়ারাসনের। কিন্তু চার বছর পর বাদ সাধে মুরুগানের কন্যা ভার্গবী। ২০১২ সালে একটি টেলিভিশন রিয়্যালিটি শো-তে অংশ নেয় ১৭ বছরের কিশোরী ভার্গবী। সেখানে ভার্গবী জানায়, প্রেমিক কে সতীশ কুমারের সঙ্গে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে এবং তাদের প্রাণহানি হতে পারে ভেবে শঙ্কায় রয়েছে।
কথা বলতে বলতে কেঁদেও ফেলে ভার্গবী। তবে রিয়্যালিটি শোর সঞ্চালক উল্লেখ করেন, তার বয়স মাত্র ১৭ বছর এবং তার উচিত বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। এর পরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে ভার্গবী জানায় যে তার বাবা তাকে খুন করবে। বাড়িতে সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলেও দাবি করেন ভার্গবী।
টেলিভিশনের পর্দায় ভার্গবী এ-ও দাবি করে যে, তার মা তাকে এক বার বলেছিলেন যে বাবা মুরুগান তিন জনকে খুন করে তাদের বাড়ির পেছনের উঠোনে পুঁতে রেখেছেন। ২০১২ সালের ২৮ মে প্রচারিত সেই পর্বটি দেখেছিলেন লাবণ্যের মা তথা শেখরের স্ত্রী জিভাও।
৩১ মে পুলিশের কাছে ছুটে যান জিভা। স্বামী শেখর এবং কন্যা লাবণ্যের নিখোঁজ হওয়ার চার বছর পুরনো অভিযোগটি পুনরায় দায়ের করেন তিনি। ২০১২ সালের ১ জুন মুরুগান, তাঁর ভাই মাথিয়ারাসান, স্ত্রী রাজেশ্বরী এবং এক কর্মচারী মূর্তি— চার জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে তামিলনাড়ুর পুলিশ।
এর পরেই মুরুগানের বাড়ি পৌঁছোয় পুলিশ। ভার্গবীর দাবিমতো, বাড়ির পেছনের উঠোনের কুয়োর পাশের একটি জায়গা খোঁড়া শুরু হয়। খননকার্য কিছু ক্ষণ চলার পরেই থ হয়ে যান উপস্থিত সকলে। মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে তিনটি কঙ্কাল।
এর পরেই মুরুগান এবং মাথিয়ারাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভিল্লুপুরম ফাস্ট ট্র্যাক মহিলা আদালতে মামলার শুনানি শুরু হয়। ওই তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মুরুগানকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। তাঁকে একযোগে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৯৫,০০০ টাকা জরিমানার সাাজা শোনান বিচারক জি শান্তি।
মুরুগানের ভাই মাথিয়ারাসানও একটি খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৩৫,০০০ টাকা জরিমানার সাজা শোনানো হয়। মুরুগানের স্ত্রী সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেলেও, মামলা চলাকালীন চতুর্থ অভিযুক্ত মূর্তি মারা যান।
কিন্তু কেন লাবণ্য, তার স্বামী এবং বাবাকে খুন করেছিলেন মুরুগান এবং মাথিয়ারাসান? তদন্তে উঠে এসেছিল মুরুগানের পরিবার এবং শেখরের পরিবার পূর্বপরিচিত ছিল। ব্যবসায়িক যোগও ছিল দুই পরিবারের মধ্যে।
ভিল্লুপুরম জেলার জিঞ্জির কাছে নাল্লামপিল্লাইপেত্রাল গ্রামে মুরুগান একটি আসবাবপত্রের কারখানা চালাতেন। শেখর ছিলেন তাঁর বন্ধু। ব্যবসায় অংশীদারও ছিলেন তিনি। শেখর এবং মুরুগান দু’জনে মিলেই ব্যবসা সামলাতেন।
অন্য দিকে, শেখরের কন্যা লাবণ্যও ওই কারখানায় কাজ করত। কিন্তু কিশোরী বয়সেই সিলাম্বারাসান নামে তরুণের প্রেমে পড়ে লাবণ্য। শেখর তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন না ভেবে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় যুগল। পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করে তারা।
বিয়ের পর আশ্রয়ের খোঁজে কুচিপালায়াম গ্রামে ফিরে এসে মুরুগানের কাছে সাহায্য চায় লাবণ্য এবং তার স্বামী। সাহায্য করতে রাজি হন মুরুগান। দম্পতিকে আশ্রয় দেন তিনি। কিন্তু তাঁর মাথায় তখন অন্য পরিকল্পনা চলছিল।
তদন্তকারীদের মতে, প্রেমের বিষয়ে মুরুগান ছিলেন কট্টরপন্থী। এই ধরনের প্রেমের সম্পর্ককে মান্যতা দিতেন না তিনি। প্রণয়ঘটিত সম্পর্কের বিরোধী ছিলেন, তা সে ব্যবসায়িক অংশীদারের কন্যাই হোক না কেন!
আর সে কারণেই লাবণ্য এবং তার স্বামী সিলাম্বারাসানকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন মুরুগান। তাঁকে সাহায্য করেন ভাই মাথিয়ারাসান। খুনের পর যুগলের দেহ পিছনের উঠোনে পুঁতে ফেলা হয়।
এক সপ্তাহ পর মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে মুরুগানের বাড়িতে পৌঁছোন শেখর। ভাই মাথিয়ারাসানের সাহায্যে তাঁকেও হত্যা করে মাটিতে পুঁতে দেন মুরুগান। স্বামী এবং কন্যা নিখোঁজ বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন শেখরের স্ত্রী জিভা। কিন্তু মামলাটি অমীমাংসিতই থেকে যায়, যত ক্ষণ না ভার্গবীর টেলিভিশন শো এই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করে।