আর কোনও বিদেশি সাহায্য নয়। সম্পূর্ণ নিজেদের নকশায় এ বার ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন তৈরিতে হাত দিয়েছে নয়াদিল্লি। কোমর বেঁধে চলছে তার গবেষণা। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সাফল্য পেলে আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে একসারিতে চলে আসবে ভারত। পাশাপাশি, এতে বেজিং বা ইসলামাবাদের মতো শহরকে নিশানা করা যে অনেক সহজ হবে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের মে মাসে ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘কামিকাজ়ে’ ড্রোন নির্মাণের কথা ঘোষণা করে এনআইবিই লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা। মহারাষ্ট্রের পুণেয় রয়েছে তাদের সদর দফতর। দূরপাল্লার পাইলটবিহীন যানটির গবেষণা, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তায় একফোঁটাও বিদেশি ছোঁয়া থাকবে না বলে জানিয়েছে তারা। সেই লক্ষ্যে কয়েক কোটি টাকা খরচেও পিছপা নয় এনআইবিই।
এই ইস্যুতে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন পুণের প্রতিরক্ষা সংস্থাটির চিফ টেকনিক্যাল অফিসার (সিটিও) ও স্ট্র্যাটেজি হেড বালকৃষ্ণন স্বামী। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা এত দিন বিদেশি রাষ্ট্র, বিশেষত ইজ়রায়েলের সাহায্যে বহু ড্রোন বানিয়েছি। প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় পেয়েছি উৎপাদনের ছাড়পত্র। কিন্তু, এই প্রক্রিয়ায় আমাদের হাতিয়ারে নিজস্বতা থাকছে না। তাই বাইরের সাহায্য ছাড়া দূরপাল্লার ড্রোন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’
গত কয়েক বছরে দূরপাল্লার ‘আত্মঘাতী’ পাইলটবিহীন যান তৈরিকে পাখির চোখ করেছে বিশ্বের বহু দেশ। শুধু তা-ই নয়, ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে এই ধরনের ড্রোন তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র। সেই তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার নাম। এনআইবিইর ১,০০০ কিমি পাল্লার প্রস্তাবিত মানববিহীন যানে সেই মিশেল দেখা যাবে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, দূরপাল্লার হামলার জন্য ভারতীয় ফৌজের হাতে আছে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। এর চারটি শ্রেণিই বর্তমানে ব্যবহার করে এ দেশের স্থল, বিমান এবং নৌবাহিনী। সূত্রের খবর, গত বছরের (২০২৫) মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তানের ১১টা বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এই হাতিয়ার। তা সত্ত্বেও একাধিক কারণে দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, নৌ ও স্থলবাহিনীর হাতে থাকা ‘ব্রহ্মসের’ পাল্লা ৮০০ কিলোমিটার। বায়ুসেনার হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আরও কম দূরত্বে হামলা চালাতে সক্ষম। সেখানে এনআইবিইর ড্রোনে ১,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে অনায়াসে ওড়াতে পারবে এ দেশের ফৌজ। তা ছাড়া দু’টি হাতিয়ারের দামের ফারাকও অনেক বেশি। যুদ্ধ লম্বা সময় ধরে চললে ‘ব্রহ্মস’ ব্যবহারের খরচের ধাক্কা সহ্য করা সরকারের পক্ষে কঠিন।
দ্বিতীয়ত, ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে রণাঙ্গনের ‘রিয়্যাল টাইম ডেটা’ পাওয়া সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে ড্রোনের জুড়ি মেলা ভার। শত্রুর অবস্থান থেকে শুরু করে হাতিয়ার বা জ্বালানির ডিপোর যাবতীয় তথ্য কন্ট্রোল রুমে পাঠাতে থাকে এই ধরনের দূরপাল্লার মানববিহীন যান। ফলে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে নিয়ে কৌশল পাল্টে হামলা চালানোর সুযোগ পাবেন এ দেশের সেনা কমান্ডারেরা, যা সংঘাত পরিস্থিতিতে নিমেষে ঘোরাতে পারে খেলা।
দূরপাল্লার ড্রোনটির যাবতীয় তথ্য যথেষ্ট গোপন রেখেছে পুণের প্রতিরক্ষা সংস্থা। ফলে সেটি কত কেজি বিস্ফোরক নিয়ে উড়তে পারবে, তা জানা যায়নি। তবে সূত্রের খবর, পাইলটবিহীন যানটির নকশায় ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তি রাখছে এনআইবিই লিমিটেড। এতে শত্রুর রেডারকে ফাঁকি দিয়ে অনায়াসেই হামলা করতে পারবে সেটি। তা ছাড়া থাকবে নিজস্ব দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক্স যুদ্ধকৌশল।
অন্য দিকে যুদ্ধের সময় লুকিয়ে থাকা শত্রুদের খুঁজে খুঁজে নিকেশ করতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সম্পন্ন ড্রোন তৈরি করেছে ভারত। চমকের এখানেই শেষ নয়। দেশের বাইরে এ বার সেগুলি উৎপাদন করবে নয়াদিল্লি। ফৌজের অস্ত্রাগারে ঠাঁই পেতে চলা পাইলটবিহীন যানটির সাঙ্কেতিক নাম ‘কাল ভৈরব’। এর নকশা তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস’ বা এফডব্লিউডিএ।
সম্প্রতি, একটি বিবৃতিতে বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্তুগালে করবে তারা। এ দেশের সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের ইতিহাসে এই ঘটনা প্রথম। এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে লিসবনের একটি কোম্পানি, নাম ‘স্কেচপিক্সেল এলডিএ’। আর তাই ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’-এর সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করেছে তাঁরা।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণে বিশ্ব জুড়ে লিসবনের ‘স্কেচপিক্সেল এলডিএ’র বেশ খ্যাতি রয়েছে। চতুর্থ প্রজন্মের মার্কিন লড়াকু জেট এফ ১৬-এ ব্যবহার হচ্ছে তাদের তৈরি যন্ত্রাংশ। যুদ্ধবিমানটির মূল নির্মাণকারী সংস্থা হল যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’। সূত্রের খবর, ‘কাল ভৈরব’ ড্রোন উৎপাদনে স্টিমুলেশন সিস্টেম, কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তঃকার্যক্ষমতার কারিগরি সহায়তা দেবে পর্তুগিজ় সংস্থা।
তবে মূল নকশা ও প্রযুক্তির যাবতীয় স্বত্ব থাকবে বেঙ্গালুরুর সংস্থাটির হাতেই। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর আওতায় চলবে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন। গত বছর (২০২৫ সাল) প্রথম বার কৃত্রিম মেধার ড্রোনটিকে প্রকাশ্যে আনে ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’। তখনই এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর কথা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও সুহাস তেজ়স্কন্দরকে বলতে শোনা গিয়েছিল।
বেঙ্গালুরুর প্রতিরক্ষা সংস্থার কর্ণধার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘সামরিক প্রযুক্তিতে ভারত যে এগিয়ে গিয়েছে, সেটা দেখানোর সময় এসেছে। সেই কারণে ‘কাল ভৈরব’কে ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর মাধ্যমে দেশের সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য হল বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এতে আমাদের তৈরি হাতিয়ারের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।’’
বিশ্লেষকদের অবশ্য দাবি, ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য পর্তুগালকে বেছে নিয়ে এক ঢিলে একাধিক পাখি মেরেছে ভারত। লিসবন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) সদস্য হওয়ায়, তাদের হাতে আছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি। এগুলি আগামী দিনে নিজেদের তৈরি করা ড্রোন বা অন্য কোনও হাতিয়ারে ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে নয়াদিল্লি।
নেটোভুক্ত দেশগুলি প্রায়ই নিজেদের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি দেওয়া-নেওয়া করে থাকে। সেই তালিকায় প্রায়ই নাম দেখা যায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, পর্তুগাল ও স্পেনের। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, লিসবনে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নেটোর বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার পাবে ভারত। কারণ, সংশ্লিষ্ট ড্রোনটিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে সেখানকার সংস্থা ‘স্কেচপিক্সেল’।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ দিন ধরেই ইউরোপের বাজারে অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লির অস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে গ্রিস ও সাইপ্রাসের। এদের সামনে রেখে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় পাকিস্তানের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র তুরস্কের উপর চাপ বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে কেন্দ্র। পর্তুগালে ‘কাল ভৈরব’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ইউরোপের হাতিয়ারের বাজারে ভারতকে পা জমাতে সাহায্য করবে বলে আশাবাদী ওয়াকিবহাল মহল।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আরও একটি তত্ত্ব প্রকাশ্যে এসেছে। সেটা হল, ভারতীয় সেনার থেকে ‘কাল ভৈরব’-এর বিপুল বরাত পেয়েছে ড্রোনটির নির্মাণকারী ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’। কিন্তু, বেঙ্গালুরুর ইউনিটে মূলত গবেষণার কাজ চালিয়ে থাকে তারা। আর তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাইলটবিহীন যানগুলি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পর্তুগালের ‘স্কেচপিক্সেল’-এর সঙ্গে চুক্তি সেরেছে কর্নাটকের এই প্রতিরক্ষা সংস্থা।
সাবেক সেনাকর্তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধের সময় ভারতের সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের কারখানাগুলিকে নিশানা করতে পারে চিন বা পাকিস্তান। সে ক্ষেত্রে পর্তুগালে বাণিজ্যিক উৎপাদনের কারণে ‘কাল ভৈরব’-এর গায়ে লাগবে না কোনও আঁচড়। উল্টে দ্রুত সেখান থেকে ঘরের মাটিতে ফিরিয়ে এনে ওই ফৌজি ড্রোনেই পাল্টা প্রত্যাঘাতের সুযোগ পাবে এ দেশের বাহিনী।
‘কাল ভৈরব’ মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘ ক্ষণ উড়তে পারা পাইলটবিহীন যান। এর পাল্লা ৩,০০০ কিলোমিটার। টানা ৩০ ঘণ্টা ভেসে থাকার সক্ষমতা রয়েছে ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’-এর ড্রোনটির। শুধু তা-ই নয়, পাঁচ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে ‘কাল ভৈরব’। মূলত একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে হামলা চালিয়ে শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এর নকশা তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর সংস্থাটি। লক্ষ্য চিহ্নিত করার জন্য এতে আছে কৃত্রিম মেধা বা এআই প্রযুক্তি।
এ দেশের সেনাকর্তাদের ‘কাল ভৈরব’ পছন্দ হওয়ার নেপথ্যে ড্রোনটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, ঝাঁক বেঁধে হামলা করার সময় এআই প্রযুক্তিতেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এই পাইলটবিহীন যান। তা ছাড়া শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা, জ্বালানি এবং হাতিয়ারের ডিপো খুঁজে নিয়ে ওড়ানোর সহজাত সক্ষমতা রয়েছে ‘কাল ভৈরব’-এর।