ফুটবল। এই খেলাটি ঘিরে মানুষের আবেগের অন্ত নেই। চার বছর অন্তর আয়োজিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। তা দেখার জন্য বিশ্বের প্রায় সকল প্রান্তের মানুষজন মুখিয়ে থাকেন। যে দেশগুলি এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সেই দেশের নাগরিকদের উত্তেজনা তো চরমে থাকেই। যে সকল দেশ অংশ নেয় না, সেখানকার ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও ফুটবল বিশ্বকাপের মাহাত্ম্য কিছু কম নয়।
বিশ্বকাপের আগে আমাদের এই কলকাতার অলি-গলিতে ঢুঁ মারলেই দেখতে পাওয়া যায় নানা দেশের পতাকা। কেবল পতাকাই নয়, পাল্লা দিয়ে চলে দলাদলি। বন্ধুরাই তখন পরিণত হয় শত্রুতে। চলে দেদার ঝগড়া।
চলতি বছর ১১ জুন থেকে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বকাপ। এই প্রথম বার ৪৮টি দেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ফিফা। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে কেপ ভার্দে, উজ়বেকিস্তানের মতো নানা নতুন দেশ। তবে ভারত এ বারও সেই প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে পারেনি।
২০২৬ ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা হবে তিনটি দেশে। বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো। তিনটি দেশে আলাদা আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছে ফিফা। যদিও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হবে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে। ১১ জুন সেই ম্যাচে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকাকে খেলতে দেখা যাবে।
প্রতি বছরের মতো আসন্ন বিশ্বকাপেও খেলবে বহু খ্যাতনামী ফুটবলার। সকলের নজর যে তাঁদের দিকে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। তবে হাতেগোনা কিছু চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলারও এই তালিকায় রয়েছেন। এই বয়সে এসেও তাঁদের পায়ের জাদু দেখলে চমকে উঠতে হয়।
ফুটবল খেলতে প্রয়োজন পড়ে প্রচুর শক্তি এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতার। টানা ৪৫ মিনিট একনাগাড়ে মাঠের মধ্যে দৌড়ে চলা কোনও সাধারণ বিষয় নয়। মাঝে ১৫ মিনিট বিরতির পর আবার শুরু হয় ৪৫ মিনিটের জন্য ছুটে চলা। বিপরীত দলের ফুটবলারদের আটকানো, গোল করা, আরও কত কী! চল্লিশের বহু আগেই তাই বেশির ভাগ ফুটবলার অবসর নিয়ে নেন। কিন্তু কয়েক জন রয়েছেন যাঁরা এই বয়সে এসেও বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় পায়ে বল নিয়ে মাঠে নামেন।
এই তালিকায় প্রথমেই নাম আসে স্কটল্যান্ডের ক্রেগ গর্ডনের। স্কটিশ এই গোলকিপারের বয়স ৪৩। ক্রেগ ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপের প্রবীণতম ফুটবলার। যদিও তিনি প্রথম একাদশে থাকবেন, না তাঁকে বেঞ্চে রাখা হবে তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে দ্বন্দ্বের অন্ত নেই। এর অন্যতম কারণ হল ক্রেগকে ১ নম্বর জার্সি না দেওয়া। বদলে তাঁকে ২১ নম্বর জার্সি দেওয়াই ঠিক মনে করেছেন কোচ স্টিভ ক্লার্ক। ফুটবলের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমে যে গোলরক্ষককে মাঠে নামানো হয় তাঁকে ১ নম্বরের জার্সি দেওয়া হয়। যদিও এই চল স্প্যানিশ ফুটবলেই বেশি দেখা যায়।
ক্রেগ বর্তমানে স্কটিশ প্রিমিয়ারশিপের হার্ট অফ মিডলোথিয়ান নামের একটি ক্লাবে গোলরক্ষক হিসাবে খেলছেন। ফুটবলজীবনের শুরুতে ক্রেগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব সান্ডারল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন। ২০১৮ সালে রাশিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা এসম এল হাদারির পর ক্রেগই হবেন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামবেন।
দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছেন পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। এটি তাঁর জীবনের ছয় নম্বর বিশ্বকাপ হতে চলেছে। বর্তমানে ক্রিশ্চিয়ানোর বয়স ৪১ বছর। এই বয়সে এসেও তিনি বিশ্বকাপে অংশ নেবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন ভক্তকুল। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো সেই তাঁর পুরনো ৭ নম্বর লেখা জার্সি পরেই দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ময়দানে লড়তে নামবেন।
রোনাল্ডো কেমন খেলবেন, খেলা শুরু থেকেই তাঁকে মাঠে দেখা যাবে কি না এ সমস্ত নানা প্রশ্ন ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারণ, তারকা এই ফুটবলারের ঝুলিতে অজস্র চ্যাম্পিয়ন লিগ, লা লিগা প্রভৃতি নামকরা ট্রফি এবং খেতাব-সহ ইউরো কাপও রয়েছে। কিন্তু তাঁর ওয়ার্ল্ড কাপ ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন এখনও অধরাই রয়ে গিয়েছে। হয়তো চলতি বছরের বিশ্বকাপই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। কিছু দিন আগেই তিনি আল নাসেরের হয়ে খেলে সৌদি প্রো লিগ জিতেছেন। শেষ বিশ্বকাপে রোনাল্ডোকে চোখে জল নিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়তে দেখা গিয়েছিল। চলতি বছর রোনাল্ডো ওয়ার্ল্ড কাপের কত কাছে পৌঁছোতে পারেন সে দিকে তাকিয়ে রয়েছে প্রায় গোটা বিশ্বের মানুষজন।
চলতি বছর ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে নামা প্রবীণ ফুটবলারদের তালিকায় তিন নম্বরে রয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর একসময়ের সতীর্থ লুকা মদ্রিচ। বর্তমানে তাঁর বয়স ৪০ বছর। ২০১২ সালে লুকা স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। সেই ক্লাবে বহু বছর রোনাল্ডোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলেছেন তিনি। লুকার বাড়িয়ে দেওয়া অজস্র পাসে গোল হাঁকিয়েছেন রোনাল্ডো, বেঞ্জি়মারা। দীর্ঘ ১৩ বছর রিয়ালের হয়ে খেলার পর শেষ বছর তিনি সেই ক্লাব ছাড়েন। বর্তমানে লুকা এসি মিলানের হয়ে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসাবে খেলছেন।
২০১৮-তে লুকা মদ্রিচ সোনার বল জিতেছিলেন। ক্রোয়েশিয়া সেই বার বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। বিপরীতে ছিল ফ্রান্স। জিততে পারেননি লুকারা। চোখে জল নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁদের। সোনার বল হাতে নেওয়ার সময়ও লুকার চোখের কোণে জলবিন্দু চিকচিক করতে দেখা গিয়েছিল। এই বছর ক্রোয়েশিয়ার বালোঁ দ্যর জয়ী ‘এলএম১০’-এর সঙ্গে কী হতে চলেছে তা সময়ই বলতে পারবে।
ম্যানুয়েল নয়্যার। বহু ফুটবলপ্রেমীর কাছেই ৪০ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক ‘জার্মানির প্রাচীর’ হিসাবে খ্যাত। কারণ তাঁকে ভেদ করে গোলপোস্টে বল ঢোকানো সহজ বিষয় নয়। তাবড় তাবড় ফুটবলারের শট গোলপোস্টের জাল ছোঁয়া থেকে আটকে দিয়েছেন নয়্যার।
২০২৪ সালে নয়্যার আর্ন্তজাতিক ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন, যা তাঁর ভক্তদের মনে বিষাদের মেঘ এনেছিল। কিন্তু চলতি বছর হতে চলা বিশ্বকাপে জার্মানির স্কোয়াড সামনে আসার পরই চমকে গিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। সেখানে দেখা গিয়েছে নয়্যারের নাম। এমনকি কোচ জুলিয়ান ন্যাগেলসম্যান জানিয়েছেন, দলের প্রথম এগারোতেই থাকবেন নয়্যার। মাঠে গোলরক্ষক হিসাবে তাঁকেই সকলের আগে নামতে দেখা যাবে।
৪০ বছর বয়সি মেক্সিকান গোলরক্ষক গুইলেরমো ওচোয়া। এটি তাঁর ফুটবল জীবনের ছয় নম্বর বিশ্বকাপ হতে চলেছে। এ বারও তাঁকে প্রথম ১১-র দলে মাঠে নামতে দেখা যাবে কি না তা যদিও এখনও নিশ্চিত ভাবে জানতে পারা যায়নি। কিন্তু মেক্সিকোর ফুটবলারদের তালিকায় ওচোয়ার নাম দেখতে পাওয়া গিয়েছে।
দেশের হয়ে ১৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেলে নজির সৃষ্টি করেছেন ওচোয়া। তিনি প্রথম মেক্সিকান ফুটবলার যিনি ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন। লেয়নডস্কির মতো বহু বড় মাপের ফুটবলারদের পায়ে লেগে ছুটে আসা বলকে জালে ছোঁয়া থেকে আটকেছেন ওচোয়া। চলতি বছর তাঁর ‘বুড়ো হাড়ের’ জোর কতখানি তা দেখার জন্য মুখিয়ে রয়েছে বিশ্ব।
বসনিয়া এবং হার্জ়েগোভিনার হয়ে মাঠে নামবেন ৪০ বছর বয়সি ফুটবলার এডিন জ়েকো। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার এই দেশকে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে দেখা যাবে, যাতে জ়েকোর অবদান অতুলনীয়। সেই কারণে দলের অধিনায়ক হিসাবেও কোচ সারগেজ বার্বারেজ় তাঁকেই বেছে নিয়েছেন।
স্ট্রাইকার হিসাবে খেলা জ়েকোই দলের বাকি ফুটবলারদের নেতৃত্ব দেবেন। বর্তমানে তিনি এফসি সালকের হয়ে খেলেন। ৪০ বছর বয়সি এই স্ট্রাইকারের ঝুলিতে গোলের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। একসময় তিনি ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, রোমা, ইন্টার মিলানের মতো উল্লেখযোগ্য ক্লাবগুলির হয়ে খেলেছেন। জ়েকোর ঝুলিতে ৪০০-রও বেশি সংখ্যক গোল রয়েছে।
আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম দিকে থাকা একটি দ্বীপপুঞ্জ কেপ ভার্দে। এই অঞ্চলের জনসংখ্যা ছয় লক্ষেরও কম। ২০২৬-এর ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপের হাত ধরেই তাঁদের এই প্রতিযোগিতায় হাতেখড়ি হচ্ছে। আর সেই দেশেরই প্রথম সারির গোলরক্ষক হিসাবে মাঠে নামবেন ৪০ বছর বয়সি ভোজ়িনহা। ফুটবলজীবনের প্রায় অন্তিম প্রান্তে এসে বিশ্বকাপে তিনি কেমন খেলেন এবং ফলাফল কী হয় তা দেখার জন্য আগ্রহী ফুটবলপ্রেমীরা।