Review of Books

ঔপনিবেশিক বঙ্গের মহামারি

বাংলার ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন গবেষণা হয়নি। সৌমিত্র বসু শূন্যস্থান পূরণ করলেন।

অরবিন্দ সামন্ত

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৫
Share:

কোভিড-১৯’এর অব্যবহিত পরেই এ দেশের জনস্বাস্থ্য, রোগব্যাধি, মহামারি ও অতিমারি নিয়ে গবেষণায় ইতিহাসবিদদের মধ্যে এক ধরনের বৌদ্ধিক তৎপরতা লক্ষ করা গিয়েছিল। কোভিডের প্রেক্ষিতে গবেষকরা বাংলার শতাধিক বছরের পুরনো মহামারিগুলিকে ফিরে দেখতে চাইছিলেন। কোভিড তো বটেই, বঙ্গে ঔপনিবেশিক আমলের ম্যালেরিয়া, বসন্ত, কলেরা, প্লেগ মহামারি নিয়েও আমরা সম্প্রতি নানা আলোচনা প্রকাশিত হতে দেখেছি। সবচেয়ে কম আলোচনা চোখে পড়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি বিষয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন পঞ্চাশ কোটি, অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। আনুমানিক দশ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আমাদের দেশেও কম মানুষ মারা যাননি। গবেষকদের অনুমান, কম করেও দেড় কোটি, অর্থাৎ দেশের প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে ডেভিড আর্নল্ড এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন, পশ্চিম ভারতের জনজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলে ইনফ্লুয়েঞ্জার অভিঘাত নিয়ে ডেভিড হার্ডিম্যান ও বম্বের ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে মৃদুলা রমান্না কাজ করেছেন। কিন্তু বাংলার ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন গবেষণা হয়নি। সৌমিত্র বসু শূন্যস্থান পূরণ করলেন।

লেখক ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির ‘ডিসকোর্স’কে মিশেল ফুকোর ‘বায়ো-পাওয়ার’ ও ‘বায়ো-পলিটিক্স’-এর তত্ত্বভূমিতে স্থাপন করে বলেছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি নিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের আপাত-মানবিক উদ্বেগ-দুর্ভাবনার মূলে ছিল এ দেশের নাগরিক-শরীরের উপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গোপন ইচ্ছা। হস্তক্ষেপ আসলে জনগণের শরীরী নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্ভাবিত একটি প্রকল্প। কথাটি নতুন নয়; ডেভিড আর্নল্ড, ডেভিড হার্ডিম্যান, মাইকেল ওরবয়স, হরিশ নারায়ণদাস প্রমুখ অনেকেই অন্য মহামারি প্রসঙ্গে এ কথাটি বলেছেন। কিন্তু বর্তমান লেখক বাংলার ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির ক্ষেত্রেও এটির প্রয়োগ দেখিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে।

শুরুতেই বলে রাখা ভাল, স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জার উৎপত্তি কিন্তু স্পেনে নয়, আমেরিকায়। বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধরত দেশগুলির সংবাদপত্রের উপর নানা সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। যুদ্ধে নিরপেক্ষতার কারণে স্পেন তার দেশে প্রাদুর্ভূত এই মহামারির কথা গোপন করে রাখেনি। আমেরিকায় ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটলেও আমেরিকান সরকার সেই সংবাদ যুদ্ধের কারণে গোপন করে। সুতরাং নামে ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ বলে পরিচিত হলেও এটি আসলে আমেরিকান ইনফ্লুয়েঞ্জা। লেখক পাঁচটি অধ্যায়ে তাঁর অনুসন্ধান বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে কলকাতা ও সংলগ্ন ভূখণ্ডে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির উৎপত্তি ও বিস্তার বিশদে আলোচনা করেছেন। বলছেন, ১৯১৮ সালে কলকাতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা-জনিত কারণে যে প্রায় ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের অধিকাংশই বাঙালি। এঁদের দাহ করা হয় তপসিয়া, মুরারিপুকুর, কাশী মিত্র শ্মশানঘাটে। তুলনায় উন্নততর জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সতর্কতা, জরুরি চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাদ্য জোগানের সুব্যবস্থার কারণে পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলের সাহেব নাগরিক ও সরকারি কর্মীদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল নগণ্য। ইনফ্লুয়েঞ্জা শহর থেকে সংলগ্ন গ্রামেগঞ্জে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল, ছড়িয়ে পড়ল নানা গুজব আর গল্পগাছা, শহরে ও গ্রামে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হল, লেখাপড়ার অভাবে ছোটদের বাবা-মায়েদের উদ্বেগ বাড়ল, উদ্বেগ বাড়ল চাকরিপ্রার্থীদের, সরকারি উদাসীনতার বিরুদ্ধে বাড়ল প্রতিবাদও। রোগ মোকাবিলায় সরকারি অব্যবস্থা, নীতিহীনতা, দ্বিচারিতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। তুলনায় রামকৃষ্ণ মিশন, রেড ক্রস সোসাইটি, হিন্দু সৎকার সমিতি মানবকল্যাণে অনেক সক্রিয় ছিল।

পাবলিক হেলথ অ্যান্ড দ্য প্যানডেমিক ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: অ্যান অ্যানালিসিস অব দ্য স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা (১৯১৮-১৯২০)

সৌমিত্র বসু

১৫৫.০০

পাউন্ড রাটলেজ

দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক আলোচনা করেছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি কী ভাবে নগর কলকাতা থেকে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ল, লোকক্ষয় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল। রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের কোনও কার্যকর সরকারি ব্যবস্থা না-থাকায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ধেয়ে চলল এ-পার বাংলা থেকে ও-পার বাংলার ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও আরও বহু জায়গায়। কলকাতায় যা ছিল ছোটখাটো বিপদ, সারা বাংলায় তা হয়ে উঠল বড় রকমের বিপর্যয়। এই বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারণ করল যখন জ্বরের সঙ্গে যুক্ত হল খাদ্যের অনটন, আকাল। এই বিষয়টি আমাদের এ-যাবৎতেমন করে জানা ছিল না। বিষয়টি গবেষক বিস্তৃত করেছেন গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে। দুর্ভিক্ষ বা অনটন ঔপনিবেশিক বাংলায় নতুন নয়। সেই ১৭৭০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এ দেশে মন্বন্তরের নিত্য আনাগোনা। কিন্তু লেখক বলছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ে পর্যবসিত করে ১৯১৮ সালের খরা, শস্যহানি ও খাদ্যাভাব, এবং তা নিরসনে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা।

চতুর্থ অধ্যায়ে লেখক রোগ, রোগী ও রাষ্ট্রের ত্রিপাক্ষিক সূত্রের টানাপড়েনে ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। উন্মোচন করেছেন রোগ, চিকিৎসা, ওষুধ আর সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভারসাম্যহীন দোদুল্যমানতা। পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হিসেবে এই মহামারির উচ্চ মৃত্যুহারজনিত জনবিন্যাসগত রদবদল, শ্রমের বাজারে পরিবর্তন, সমাজকল্যাণ প্রকল্পে নতুন ভাবনা, পারিবারিক গতিশীলতা সম্পর্কে আমাদের নতুন সামাজিক শিক্ষা।

লেখক ঔপনিবেশিক বাংলায় স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাবকে দেখেছেন জনস্বাস্থ্যের সমস্যাজনিত একটি ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে। ‘পাবলিক হেলথ’ কতটা ‘পাবলিক’ ছিল, তা তিনি বিচার করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর আখ্যান থেকে ‘পাবলিক’ বা জনমানুষ প্রায় অদৃশ্য। তাঁরা এসেছেন শুধু জীবিত ও মৃতের পরিসংখ্যান রূপে হাজিরা দিতে। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা সরকারি নথিতে নন্দিত হয় না, এঁদের প্রাণস্পন্দন শুনতে হলে কান পাততে হবে সাহিত্যে। কিন্তু সমকালীন বাংলা সাহিত্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির মৃত্যুজনিত কোন সামাজিক অভিঘাত-চিহ্ন লেখক লক্ষ করেননি। অথচ প্রতিবেশী ওড়িয়া সাহিত্যে স্প্যানিশ ফ্লু’র কথা আমরা পাই সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালার আত্মজীবনী কুল্লি ভাট-এ: “গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায়, শুধু ভেসে আছে মানুষের লাশ। খবর এল মারা গিয়েছেন আমার স্ত্রী মনোহরা দেবী।… হারিয়েছিলাম পরিবারের অনেককে।… মৃতদেহ সৎকারের কাঠও ছিল না কোথাও।” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন শেষ প্রশ্ন-এ, “স্কুল-কলেজ বন্ধ, হাটে-বাজারে দোকানে কবাট অবরুদ্ধ, নদীতীর শূন্যপ্রায়, শুধু হিন্দু ও মুসলমান শব-বাহকের ত্রস্ত পদক্ষেপ ব্যতিরেকে রাজপথ নিঃশব্দ, জনহীন। যে-কোনদিকে চাহিলেই মনে হয় শুধু কেবল মানুষজনই নয়, গাছপালা, বাড়ি-ঘর-দ্বারের চেহারা পর্যন্ত যেন ভয়ে বিবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে।” মহামারি শুধু মানুষকে হত্যা করে না, গভীর আতঙ্ক আঘাত করে পরিবেশও পারিপার্শ্বিককে।

লেখকের গল্পের গাঁথুনিটি আলগা, বক্তব্যের বাঁধুনি তত গোছানো নয়। তাই বেশ কিছু কথা ঘুরেফিরে সব ক’টি অধ্যায়েই ছড়িয়ে পড়েছে। ফলত গ্রন্থপাঠে পাঠকের ক্লান্তি ঠেকানো মুশকিল। এটি হয়েছে সম্ভবত এই কারণে যে, গবেষক তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে হাজির করেছেন বিপুল তথ্যসম্ভার, যা সংগৃহীত সে কাল-এ কালের গবেষণা-প্রবন্ধ, সরকারি-বেসরকারি নথি, সাময়িকপত্রের মন্তব্য, সংবাদপত্রের বিবরণ, বিজ্ঞাপন ও বহু বিচিত্র সূত্র থেকে। সমস্যা হল, নির্বিচার গ্রহণে তিনি মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়েছেন, কিন্তু প্রয়োজনমতো বর্জনে কুণ্ঠিত হয়েছেন। ছোটখাটো এ সব ত্রুটি সত্ত্বেও গ্রন্থটির প্রকাশ অবশ্যই একটি বড় কাজ। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এবং প্রমাদহীন মুদ্রণ প্রশংসাযোগ্য। তবে, বইটির ভারতীয় সংস্করণ বোধ হয় এত দিনেও বাজারে আসেনি। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্করণের যা দাম, সে টাকা খরচ করে সারস্বতচর্চা করা কিঞ্চিৎ মুশকিলই বটে। প্রকাশক কি ভারতীয় পাঠকদের কথা ভাববেন?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন