“আটির গাঙে ভাটি চলে।/ সোঁদরবনের নৌকা চলে।/ নৌকা চলে হাতের জোরে।/ দরিয়ার পাঁচ পীর বদর বদর।” নৌকা বাইচে সুন্দরবনের মানুষের গলায় শোনা যায় এমন হরেক শ্লোক। ভাগীরথী-হুগলির মোহনা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাদাবনের দেশে নদীর নামও ভারী বৈচিত্রময়— কলশের গাঙ, বোটে ভাঙি, বাতাকাটি, খেজুরছড়ির গাঙ ইত্যাদি। মিষ্টি জল সেখানে সাগরের নোনা জলে মেশে। স্থানীয় ভাষায় সে জল ‘দুধ নোনতা’। আর মেশে রাজনীতি, শুধু নদীর স্রোতে নয়, দেশের জলভান্ডারের স্তরেও। কখনও সেই রাজনীতি নদী, জল ঘিরে জাতীয় উন্নয়নের স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু উৎখাত করে স্থানীয় মানুষকে, কখনও তা রাজ্যগুলির মধ্যে বিরোধের জন্ম দেয়, কখনও আবার আন্তর্জাতিক চুক্তির দিকে পা বাড়ায়। এই বইয়ে সেই রাজনীতিই ধরা পড়েছে নানা সময়ে, নানা রূপে। দেখিয়েছে, নদী উপত্যকা প্রকল্প, বাঁধ, জলবণ্টন, জল-বিরোধ— সব কিছুকে ঘিরেই এ দেশের শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের কণ্টকময় পথ হাঁটা।
শুরুতেই জায়গা করে নিয়েছে গঙ্গা ও তাকে ঘিরে দীর্ঘকাল ভারতীয় রাজনীতির পথ চলা। নদী-জল নিয়ে লেখা বইয়ের এর চেয়ে যথার্থ সূচনা আর কী-ই বা! উঠে এসেছে গঙ্গা বাঁচাতে সন্ন্যাসীদের ‘প্রাণ পণ’ লড়াই, উল্টো দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবল উদাসীনতা। স্বামী নিগমানন্দ, বাবা নাগনাথের লড়াই প্রসঙ্গে লেখক বলেন, “তখনও নিজেকে গঙ্গাপুত্র বলে দাবি করে গেরুয়া শিবিরের প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের মসনদে বসেননি, এবং বসেই গঙ্গার বুকে প্রতি ১০০ কিলোমিটার অন্তর ব্যারেজ বানানোর প্রস্তাব আনেননি।”
বইয়ে বিস্তারিত আলোচিত সুন্দরবন, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রবল আঘাতে বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন যে অঞ্চল। ২০০৯-এ আয়লার ধ্বংসলীলার পর নদীবাঁধের পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওয়াটার রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে। রিপোর্টে উঠে আসে ৭৭৮ কিমি নদীবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য। অতঃপর বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়, যেগুলি সুন্দরবনের মানুষের কাছে ‘আয়লা বাঁধ’ নামে পরিচিত। আয়লার এক দশক পর আঘাত হানে আমপান, তার ঠিক এক বছর পর ইয়াস। তখনও পর্যন্ত বাঁধের নির্মাণ শেষ হয়নি। যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেও ব্যবহৃত মাটির মান আশানুরূপ নয়। তাই বর্ষার দিনে ভরা কটাল এলেই বাঁধ যায় ভেঙে। স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ আছে আরও। আমপানের পর বন দফতর সুন্দরবনে যে পাঁচ কোটি ম্যানগ্রোভ চারা লাগানোর কথা জানিয়েছিল, বাঁধের আশেপাশে তার একটিরও নাকি দেখা মেলেনি। পঞ্চায়েতের ১০০ দিনের কাজের মাধ্যমে যে সামান্য গাছ লাগানো হয়, সেগুলির বেশির ভাগও লাগানোর পরেই মরে যায়।
নদী জল রাজনীতি
সুপ্রতিম কর্মকার
৪৫০.০০
ধানসিড়ি
আলোচিত হয়েছে, বন্যাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে আবর্তিত হওয়া রাজনীতির কুচক্র। যেমন— সাম্প্রতিক কালে দামোদরের বন্যায় বার বার ভেসে গিয়েছে হাওড়া, হুগলির বিস্তীর্ণ জায়গা। দামোদরের ধারণক্ষমতা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, ৭৬ হাজার কিউসেক পরিমাণ জলের মাত্রা অতিক্রম করলেই ভেসে যাচ্ছে নিচু এলাকাগুলি। পলি পড়ে বোঝাই দামোদর অববাহিকার বাঁধ। জলধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে নদীপথ। তার একটি কারণ যদি হয় পলি পড়ে নদীখাতের গভীরতা কমে যাওয়া, অন্য কারণটি অবশ্যই নদীখাত দখল। বাম জমানায় নদীর খাত দখল করে নদীর জমির হাতবদল, নদীর জমির উপরে পাট্টা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল। পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে দুর্নীতি হয়েছে লাগামছাড়া। ‘ম্যান-মেড বন্যা’র তত্ত্ব যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমন তার পাশেই রাখা প্রয়োজন ‘রিভার এনক্রোচমেন্ট’ তত্ত্বও।
লেখক নদীর সঙ্গেই পানীয় জল, ভৌম জলের অনুসন্ধানেও ব্যাপৃত হয়েছেন। এ কাজে নিজেকে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সীমানাতেই আটকে রাখেননি। আলোচনা ছুঁয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রদেশ সরকারের জলের উপর মানুষের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া থেকে শুরু করে চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর ভয়ঙ্কর জলসঙ্কট। বাদ পড়েনি উন্নয়নের নামে লাদাখের পরিবেশ কার্যত ধ্বংস করে দেওয়ার কেন্দ্রীয় বন্দোবস্তের কথাও। সোনম ওয়াংচুককে ‘দেশের শত্রু’ জ্ঞানে হেনস্থা, মাধব গ্যাডগিলের পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় পাথর খাদানের বিরোধিতার কারণে তাঁর রিপোর্ট উপেক্ষা, গাড়োয়াল হিমালয়ে ভূমিধস প্রসঙ্গে পরিবেশবিজ্ঞানী রবি চোপড়া চারধাম প্রকল্পকে দায়ী করায় তাঁকে কমিটি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা— সবই এক সর্বনাশের পথে পা বাড়ানোর দিকে ইঙ্গিত করে।
সুপ্রতিম কর্মকার এর আগে তাঁর জলের ইতিকথা নদীর উপকথা বইটিতে বাংলার নদীগুলিকে ঘিরে থাকা হরেক মায়াময় উপকথা জড়ো করেছিলেন। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়ন আর মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা উপকথার দুনিয়া থেকে বার করে নদীগুলিকে আছড়ে ফেলেছে বাস্তবের রূঢ় মাটিতে। সেই ধ্বংসের ছবিটি শুধু বাংলায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে। বিপন্ন হচ্ছে জীবন, জীবিকা হারাচ্ছেন নদীকে নির্ভর করে বেঁচে থাকা অজস্র মানুষ। সচেতন হওয়ার সময়টুকুও যে আর অবশিষ্ট নেই, বইটি পাঠ করে সেই আশঙ্কাই প্রবলতর হয়। কী করণীয়, সেই আশার রেখাটুকুও জাগে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে