প্রবন্ধ ৪

‘মনরেগা’ নিয়ে ছেলেখেলা হয়েছে

মহাত্মা গাঁধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনা বা মনরেগা কি কংগ্রেসের ব্যর্থতার ‘জীবন্ত প্রমাণ’, না কি এক দশক আগে তৈরি হওয়া এই আইনটি শুধু দারিদ্র দূরীকরণের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে পশ্চাৎপদ মানুষের ক্ষমতায়নে রাষ্ট্রীয় সাফল্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত?

Advertisement

পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০১
Share:

মহাত্মা গাঁধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনা বা মনরেগা কি কংগ্রেসের ব্যর্থতার ‘জীবন্ত প্রমাণ’, না কি এক দশক আগে তৈরি হওয়া এই আইনটি শুধু দারিদ্র দূরীকরণের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে পশ্চাৎপদ মানুষের ক্ষমতায়নে রাষ্ট্রীয় সাফল্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত?

Advertisement

এই প্রকল্প সম্বন্ধে তাঁর প্রাথমিক অবস্থান থেকে কার্যত একশো আশি ডিগ্রি সরে এসেছেন নরেন্দ্র মোদী, নিজের আগেকার তির্যক মন্তব্যগুলো চুপচাপ গিলে ফেলেছেন। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জানিয়েছেন, দেশের গ্রামাঞ্চলের এক বিপুল অংশ যখন পর পর দু’বছর খরায় বিপর্যস্ত, সেই সময় এই প্রকল্পের আর্থিক বরাদ্দে যেন কোনও টান না পড়ে, তা তাঁরা নিশ্চিত করবেন। অনুমান করছি, আসন্ন বাজেটে জেটলি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।

প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী, শুধু এই দু’জনই মনরেগা সম্বন্ধে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিলেন, এমনটা বললে অন্যায় হবে। কংগ্রেসের একটা বড় অংশও এই প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফলে বিশ্বাস করতে চায়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহও সম্ভবত সে দলেই ছিলেন। কথা উঠেছিল, অদক্ষ গ্রামীণ শ্রমিককে ‘চড়া’ হারে মজুরি দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পের সুফল আসলে গরিবের কাছে পৌঁছবে না, মাঝপথেই বেহাত হয়ে যাবে। সত্যি বলতে কী, এই ধরনের আশঙ্কাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনও ছিল না।

Advertisement

আরও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। যেমন, যে রাস্তা একটা বর্ষাতেই ধুয়ে যায়, তেমন রাস্তা বানিয়ে কী লাভ? আর্থিক মন্দা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির যে দাওয়াই অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস দিয়েছিলেন, তার আয়ু ফুরিয়েছে বলেও অনেকেই ঘোষণা করেছিলেন। কেইনস-এর যুক্তি ছিল, যখন মন্দা চলবে, তখন প্রয়োজনে মাটি কাটা আর ফের সেই মাটি দিয়ে গর্ত বুজিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে হলেও কর্মসংস্থান করতে হবে।

মনরেগা-কে এক হাত নিয়ে রাজনীতির ময়দানে কিছু হাততালি কুড়োনোর সুযোগ নরেন্দ্র মোদী ছাড়েননি। তিনি তীব্র ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন, ‘আমি এই প্রকল্প বন্ধ করে দেব বলে ভাবছেন? আমার রাজনৈতিক বোধ আমায় সেই কাজটা করতে দেবে না। বিগত ষাট বছরে যে দারিদ্র দূরীকরণে (কংগ্রেস) সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, এই প্রকল্প তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। আমি ঢাকঢোল পিটিয়ে এই প্রকল্পটি চালিয়ে যাব।’

বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখার পর হয়তো মোদী-জেটলিরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারছেন। তাঁরা টের পাচ্ছেন, প্রকল্পটির রূপায়ণে অনেক ভুল ও খামতি থাকলেও গরিব মানুষের আয় বাড়ানোর কার্যকর উপায় হিসেবে এই প্রকল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

দেশের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস আর বিজেপি-র অর্থনৈতিক নীতিতে কোনও কালেই খুব একটা ফারাক ছিল না। ফলে, অরুণ জেটলির সঙ্গে তাঁর পূর্বসূরি পালনিয়াপ্পন চিদম্বরমের অবস্থানের মধ্যে বিরাট পার্থক্য নেই। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিমাংশু দীর্ঘ দিন ধরে মনরেগা-র গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখছেন। সম্প্রতি তিনি লিখেছেন, প্রকল্পটির সূচনার কৃতিত্ব যেমন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের, তেমনই ২০১০ সালের পর প্রকল্পের পালের হাওয়া কেড়ে নেওয়ার দায়ও তাদেরই। ‘শুধু যে এই প্রকল্পের জন্য অর্থবরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়েছিল, তা-ই নয়, প্রকল্পটির চরিত্রই বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। গোড়ায় যা ছিল চাহিদা-নির্ভর প্রকল্প, তাকে জোগান-নির্ভর করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল।’

তার ফল ভাল হয়নি। ২০০৯-১০ সালে এই প্রকল্পটিতে মোট ২৮৪ কোটি মানব-দিবস কর্মসংস্থান হয়েছিল। ২০১৪-১৫ সালে সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় ১৬৬ কোটি মানব-দিবসে। ২০০৯-১০ সালে পরিবারপিছু গড়ে ৫৪ মানব-দিবস কাজের ব্যবস্থা হয়েছিল। ২০১৪-১৫ সালে তা কমে হয়েছিল ৪০ মানব-দিবস। সেই একই সময়কালে ১০০ দিনের কাজ পাওয়া পরিবারের সংখ্যা ৭০ লক্ষ থেকে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ লক্ষে।

ইউপিএ-র আমলে প্রকল্পের মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার যে গড়িমসি করত, কিছু দিন আগে অবধি এনডিএ সরকারও ঠিক সেই পথেই চলছিল। ২০০৬-০৭ সালে এই প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছিল ৮৮২৩ কোটি টাকা। ২০১০-১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯,৩৭৭ কোটি টাকা। তার পর থেকে ব্যয় কমেই চলেছে। ২০১৫-১৬ সালের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৩৩,০০০ কোটি টাকার সামান্য বেশি। কিন্তু, বছরের প্রকৃত বরাদ্দ তার চেয়ে কম, কারণ এই টাকার মধ্যে ৪০০০ কোটি টাকার বকেয়া মজুরিও ধরা ছিল। হিমাংশুর হিসেব বলছে, মূল্যস্ফীতির অংশটুকু বাদ দিলে গত পাঁচ বছরে মনরেগা-য় খরচের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে গেছে। আর, প্রকল্প চালানোর খরচ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ!

তবে, আশা মরতে মরতেও মরে না। আঁচ করছি যে, দেশের সরকারি মহল এত দিনে বুঝেছে, এক দিকে মনরেগা-র বরাদ্দ কাটছাঁট করা আর অন্য দিকে বলা যে গরিব চাষির জন্য সরকারের বুক ফেটে যাচ্ছে— এই দুটো জিনিস এক সঙ্গে চলে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement