অথচ বাঙালিরাই অন্যত্র দারুণ গবেষণা করছে

বাংলা নবজাগরণের সময় সাহিত্য ও বিজ্ঞান একই সঙ্গে উন্নীত হয়েছিল উৎকর্ষের চরম শিখরে। এক দিকে রবীন্দ্রনাথ, অন্য দিকে জগদীশচন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি ছোট্ট ঘরে আবিষ্কৃত হল রেডিয়ো তরঙ্গ বা মিলিমিটার তরঙ্গ।

Advertisement

বিকাশ সিংহ

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Share:

বাংলা নবজাগরণের সময় সাহিত্য ও বিজ্ঞান একই সঙ্গে উন্নীত হয়েছিল উৎকর্ষের চরম শিখরে। এক দিকে রবীন্দ্রনাথ, অন্য দিকে জগদীশচন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি ছোট্ট ঘরে আবিষ্কৃত হল রেডিয়ো তরঙ্গ বা মিলিমিটার তরঙ্গ। মনে রাখতে হবে, তৎকালীন সময়ে বিজ্ঞানচর্চায় সরকারি অনুদানের প্রচলন হয়নি। ইংল্যান্ড কিংবা অন্যান্য দেশ থেকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আনাও প্রায় অসম্ভব। সামান্য টাকায় কলকাতার কলকব্জার বাজার থেকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে জগদীশচন্দ্র তৈরি করেছিলেন অপূর্ব সুন্দর ট্রান্সমিটার। হাতেকলমে কী ভাবে বিজ্ঞান করতে হয়, এর চর্চা জগদীশচন্দ্রই চালু করেন। জগদীশচন্দ্রের একটি নিজস্ব স্কুল ছিল বলা যেতে পারে। তাঁর ছাত্রমহলে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের মতো দিকপাল বিজ্ঞানসাধকরা।

Advertisement

স্বাধীনতার পরেও সাফল্যের ধারা বজায় থাকল কিছু দিন। কিন্তু অচিরেই তা ধুঁকতে লাগল। অভ্যাসের চাপে কাজ চলল বটে, কিন্তু তেজ, স্ফুলিঙ্গের বড় অভাব। তার পর ষাট-সত্তরের দশক এল তার বিধ্বংসী অস্থিরতা নিয়ে, ভাল ভাল ছেলেরা কলকাতা ছেড়ে দিল্লি-মুম্বইয়ের দিকে দৌড় লাগল। বাঙালি ক্রমশই সীমাবদ্ধ হতে লাগল। যে বাঙালি এক দিন সারা ইউরোপ, বিশেষত লন্ডন দাপিয়ে বেড়িয়েছে, সে এখন কলকাতার আশেপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। আমেরিকায় চাকরির খাতিরে দৌড় দিল, কিন্তু বিশেষ কেউ বিজ্ঞানে খুব একটা বড় কাজ করে উঠতে পারেননি।

এ দিকে, যত দিন গেল, মৌলিক গবেষণা তলানিতে গিয়ে ঠেকল আর ইঞ্জিনিয়ারিং হল সেরা গন্তব্য। ইঞ্জিনিয়ারদের মাইনে অনেক বেশি, পাশ করেই হাতে চাকরি। এ দিকে মৌলিক গবেষণায় কম করে আট বছর লেগে যাচ্ছে ‘পারমানেন্ট’ কাজ পেতে। সব থেকে বড় কথা হল, সামাজিক আবহাওয়াই আর মৌলিক গবেষণায় উৎসাহ জোগায় না, ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইটি পড়ে ফটাফট সংসার করবে, এটাই বাবা-মায়ের সাধ। এই যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, এটা কিন্তু শুধু বাংলার বা ভারতের নয়, মোটামুটি সারা বিশ্বের অস্বস্তির কারণ। মনমোহন সিংহের আমলে যখন অধ্যাপকদের মাইনে প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গেল, তখন আবার শিক্ষকতা এবং মৌলিক গবেষণার দিকে ঝোঁক একটু বাড়ল বটে, কিন্তু পাল্লাটা এখনও উল্টো দিকেই ঝুঁকে।

Advertisement

ভাল ছাত্ররা মনেপ্রাণে জানে, মৌলিক গবেষণার যে আনন্দ, যে শিহরন, অন্য কাজে তা নেই, সে কাজে মাইনে যতই হোক না কেন। বিভিন্ন আইআইটি-তে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা আমার বহু বার হয়েছে। অনেক উজ্জ্বল মেধাবী তরুণকে দেখেছি, চেয়েছিল মৌলিক গবেষণা করতে, কিন্তু সামাজিক আর পারিবারিক চাপে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ঢুকে পড়েছে।

কিন্তু সেটা তো বৃহত্তর সমস্যা। বাংলার এই ভয়াবহ হাল হল কেন? বাংলার তো মৌলিক গবেষণার একটা ধারা ছিল, কৃষ্টি ছিল, যেমন ছিল কিছুটা দিল্লিতে, মাদ্রাজে। পরে হোমি ভাবার কল্যাণে টাটা ইনস্টিটিউট। সেখানে শ্রেষ্ঠ মেধার ছেলেরা বেশির ভাগই বাঙালি। কিন্তু এখানে গবেষণার ঐতিহ্যটা ক্ষীণ, স্তিমিত। তবে কি কলকাতা বা বাংলার সামাজিক পরিবেশই দায়ী? বাংলায় উদ্যমের এতই অভাব? না কি ‘চলছে না, চলবে না’-র আন্দোলন লেখাপড়া তথা গবেষণার মাথা খেয়েছে?

তুলনা বাস্তবকে বুঝতে সাহায্য করে। টাটা ইনস্টিটিউটে বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে সিনিয়রদের আদর্শ হিসেবে রেখে কাজ করে যায়। বাংলায় সিনিয়রদের হেয় করাই যেন রেওয়াজ। বাংলায় যে শিক্ষা-বিরোধী নেতির রাজনীতি নকশাল আন্দোলন চালু করেছিল, তারই একটা অন্য রূপ গবেষণার পরিবেশকে নষ্ট করেছে।

সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এবং ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার-এর ভূতপূর্ব অধিকর্তা

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement