করোনা নিয়ে আমাদের চিন্তাধারা এখন অনেক বদলেছে। অধিকাংশ সংক্রমিত যে সুস্থ হতে পারেন, এটা শুনতে বা ভাবতে কিছু দিন আগেও মানুষ তৈরি ছিলেন না। মৃত্যু ছাড়াও করোনা থেকে নিস্তার মিলতে পারে, শুনলে অনেকেই ভাবতেন সত্য বিকৃত করা হচ্ছে। শোনাটা তো ক্ষণিকের। ঠেকে শেখাটাই আসল।
এত দিন একে অন্যকে প্রশ্ন করছিল— ‘কী করে বাঁচব?’, ‘আমার করোনা হলে পরিবারের কী হবে?’, ‘কোথায় ভর্তি হব?’, ‘ওখানে গেলে তো শুনেছি নিশ্চিত মৃত্যু!’ ইত্যাদি। সেই সমাজই অনাবৃত হয়ে অন্য ভাষা বলছে। আতঙ্কের খাঁচায় মাস দুয়েক কাটানোর পরে মুক্ত বিহঙ্গ মেপে পা ফেলে, ওড়ার ইচ্ছেয় বার বার আকাশের দিকে তাকায়। আমাদের অবস্থাও তেমন। এই মুহূর্তে করোনা নিয়ে আমাদের ভাবনাটা দেখছি-কিন্তু-দেখছি-না গোছের। কেউ কেউ আবার ন্যূনতম সতর্ক থাকতেও নারাজ। এই সময়ে বিজ্ঞানের মূল সূত্রগুলো ঠিক রেখে, মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থেকে, শাসকদের বাধ্যবাধকতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামী দিনের কথা বলা দরকার।
এর পর সংক্রমিতদের সবাই কি হাসপাতালে ঠাঁই নেবেন? পর্যাপ্ত শয্যা আছে কি? তা না হলে অসংখ্য উপসর্গহীন রোগীর জন্য পাড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক নিভৃতবাসের বন্দোবস্ত করা যায়। তাঁরা সেখানে দিনকয়েক কাটিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কী করণীয়, তা অবশ্য এখন নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। আপৎকালীন বিধিব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। এটাও ভাবতে হবে যে কেবল নির্দিষ্ট কোভিড হাসপাতালেই চিকিৎসা চলবে, না কি সব হাসপাতালেই যাবতীয় সতর্কতার শর্ত মেনে চিকিৎসা হবে? সংক্রমণের ফলে যাঁদের শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে, কেবল তাঁরাই জায়গা পাবেন সেখানে। সংক্রমণ যখন প্রতিদিন প্রবল গতিতে বেড়ে চলেছে, এবং এটাও বোঝা যাচ্ছে যে বেশির ভাগ আক্রান্ত উপসর্গহীন থেকেই ভাল হয়ে যাচ্ছেন, তখন শুধু যাঁদের জটিলতা বেশি তাঁদের চিহ্নিত করে হাসপাতালে ভর্তি করলে শুশ্রূষার কাজটা যথাযথ হয়। সকলেই চাইছে, মৃত্যুর হার কমুক। তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে।
উপসর্গহীন বা সামান্য অসুস্থদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিভৃতবাস তৈরি করতে পারলে স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের নিয়মিত দেখাশোনা করবেন, উপসর্গ বাড়লে প্রয়োজনে হাসপাতালে পাঠাবেন। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ ভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়। সবার জন্য কেন আদর্শ ব্যবস্থা হবে না, এই চিৎকারে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সময় নষ্ট হয়। উপসর্গহীনদের হাসপাতালে রাখার অর্থ ব্যবস্থাপনা শক্তির অপচয় এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর অহেতুক বোঝা চাপানো। দিনে এক বার করেও ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করতে এক জন চিকিৎসকের যে সময় খরচ, তাতে আরও বেশি অসুস্থকে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব। এখন থেকেই ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ ও মানবিক ব্যবহারের পরিকল্পনা ঠিক মতো না করলে হা-ক্লান্ত সৈনিক নিয়েই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাকি লড়াই করতে হবে।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর যথাযথ ব্যবহারের স্বার্থে উপসর্গহীনদের দিন দশেক হাসপাতালের বাইরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। সরকারি নির্দেশে বাড়িতে কোয়রান্টিনে থাকার কথা বলা হয়েছে, তাতে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের কথা ভাবা হয়নি। করোনা সংক্রমণ বেশি পৌঁছচ্ছে দুঃস্থ ও বস্তিবাসীর দরজায়। তার কারণ তাঁদের যূথবদ্ধ বাঁচা। তাই এলাকার কোনও আখড়ায় সংক্রমিতদের রাখলে এবং স্থানীয়দের এই কাজে যুক্ত করতে পারলে ভাল। দেশে গোষ্ঠী সংক্রমণের ঘোষণা সরকার কবে করবে, তার প্রতীক্ষায় বসে থেকে লাভ নেই।
পাড়ায় এ কাজ করতে গেলে কিছু মানুষ বাধা দিতে পারেন। তাঁদের সঙ্গে বার বার কথা বলে আতঙ্কমুক্ত করা এবং পারলে তাঁদের এ কাজে যুক্ত করা জরুরি। পুলিশ পাঠালে বরং সরকারের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কা। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী রেখাচিত্র প্রায় গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে, যাঁরা এত দিন করোনার নামে কাঁপছিলেন, তাঁরাও পাশের পাড়ায় কারও করোনা হয়েছে শুনে তেমন শিউরে ওঠেন না। সমাজে করোনা-ভীতি কিছু কমলেও ‘পাড়ায় কোয়রান্টিন সেন্টার হবে না’ গোছের আন্দোলন হচ্ছে এখনও। হয়তো রাজনৈতিক নেতাদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে। বাতাসে করোনা ছড়ায়, এমন অবৈজ্ঞানিক ভাবনা থেকে মানুষ যত দ্রুত বেরোবেন, তত মঙ্গল।
এই মুহূর্তে সরকারকে পাড়ায় করোনার কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলার চিন্তা করতে হবে। সরকারি নজরদারিতে স্থানীয়দের উপরেই দেখভালের দায়িত্ব থাকতে পারে। সব সময়েই এটা একটা বিকল্প হিসেবে কাজে আসতে পারে। আশার কথা, ধীরে হলেও বিভ্রান্তি ঘুচছে। গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে অ-প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যকর্মীদের যুক্ত করলে ব্যবস্থাপনা আরও পোক্ত হবে। এই অ-প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরাই মানুষের কাছে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খবর পৌঁছে দিতে পারেন। এ রাজ্যের সরকার তাঁদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে। করোনা প্রতিরোধে তাঁদের যুক্ত করলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও দৃঢ় হবে। বিকেন্দ্রীকৃত কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সমাজের বড় অংশের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা না গেলে ভবিষ্যতে সংক্রমণের ব্যাপকতায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেসামাল হওয়ার আশঙ্কা।
রোজকার চলাফেরা যে ভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে, তাতে সংক্রমণ রোধে এত দিনের লক্ষ্মণরেখা প্রায় অচল। প্রকৃতির মর্জি আর করোনার ‘শুভবুদ্ধি’র ভরসায় আমরা নিজেদের সঁপে দিয়েছি। সরকারি নজরদারি ও রক্তচক্ষুর ধার সম্ভবত কমছে। অতএব ভরসা সামাজিক উদ্যোগে। ভয় না পেয়ে, জোট বেঁধে রুখে দাঁড়াতে হবে পাড়ার সবাইকে।
চিকিৎসক, লিভার ফাউন্ডেশনের সচিব