ভারতের বিভিন্ন আদালতে, জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে, সরকারি হোমে নাবালকদের সংখ্যা বাড়ছে। সমাজকর্মীদের মতে অবজ়ার্ভেশন হোমে (যেখানে শুনানি চলাকালীন নাবালকদের রাখা হয়) থাকা ছেলেদের দশ জনের চার জনই প্রেমঘটিত কারণে ‘পকসো’ (যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে শিশু সুরক্ষা আইন, ২০১২) আইনে অভিযুক্ত। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ, আদালত, সমাজকর্মীরা বুঝতে পারছেন যে ‘পকসো’য় অভিযুক্ত নাবালকরা অধিকাংশই যৌন নির্যাতনকারী নয়, দু’পক্ষের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক ঘটেছে। কিন্তু আইনের চোখে ছেলেটি ‘অভিযুক্ত’ ও নাবালিকা মেয়েটি ‘নির্যাতিতা’ হয়ে যায়।
পকসো আইনটি কঠোর করার পক্ষে যুক্তি ছিল যথেষ্ট। শিশুদের (আঠারো-অনূর্ধ্ব ছেলে বা মেয়ে) উপর যৌন হেনস্থা, নির্যাতন ও অত্যাচারকে ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি, ২০২৩)-র রিপোর্ট অনুযায়ী শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের মধ্যে ৩৮ শতাংশ পকসো-র অন্তর্গত। যৌন নির্যাতনের ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির পরিচিত বা নিকট-আত্মীয়। পরিচিত প্রাপ্তবয়স্করা ভয় দেখিয়ে, ভুল বুঝিয়ে, গোপন খেলার ছলে প্রায়ই শিশুদের যৌন নির্যাতন করে থাকে। পকসো তৈরি হওয়ার আগে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ বা ‘অস্বাভাবিক যৌন আচরণ’-এর (পড়ুন সমকামী সম্পর্ক) ধারা প্রয়োগ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। এই পরিস্থিতিতে নারী ও কুইয়র আন্দোলন, শিশু অধিকার সংগঠন, নারী ও শিশু পাচার বিরোধী সংগঠন, আইন-বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করেন, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ বন্ধ করতে স্বতন্ত্র, লিঙ্গনিরপেক্ষ আইন দরকার। পকসো আইনের বিশেষত্ব হল, অভিযুক্তকে প্রমাণ করতে হবে সে নির্দোষ। অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি ন্যূনতম তিন বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড।
কিন্তু যদি যৌনসম্পর্ক হয় ভালবেসে? দু’জন নাবালক-নাবালিকা, বা এক জন অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে বয়সে একটু বড় ব্যক্তির মধ্যে প্রেম-ভালবাসা থেকে যৌনসম্পর্ক ঘটে যদি? তখনও পকসো আইন কি একই ভাবে প্রয়োগ করা হবে? সম্মতিমূলক সম্পর্ককে আইনের আওতার বাইরে রাখা যেতে পারে— এই প্রস্তাব আইন তৈরির সময়ও ওঠে, কিন্তু নানা কারণে গৃহীত হয়নি। এক, বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের পক্ষে অবহিত সম্মতি দেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। দুই, প্রথমে সম্মতি দিলেও পরে যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনা থাকে। নারী ও শিশু পাচারের বহু ঘটনায় পাচারকারী প্রথমে কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে, পরে ভুয়ো বিয়ে করে পাচার করে দেয়। তিন, আইন এ ধরনের অব্যাহতি দিলে বিচারের পথ পিচ্ছিল, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অপরাধী নিষ্কৃতি পেতে পারে। তাই পকসো আইন অনুযায়ী আঠারো-অনূর্ধ্ব ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে যে কোনও রকমের যৌন আচরণ ও সম্পর্ক আইনত অপরাধ।
কিন্তু এ কথাও সর্বৈব সত্য যে, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেয় না পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। একটি মেয়ের নিজের ইচ্ছায় প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করাকে ‘নিষিদ্ধ’ করে রেখেছে বহু পরিবার। ফলে অনেক নাবালিকা পছন্দের সঙ্গীকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এক সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকে। এ সব ক্ষেত্রে প্রায়ই মেয়ের পরিবার ছেলেটির বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের কেস ঠুকে দেয়। পুলিশ উদ্ধার করলে মেয়েটি হয়ে যায় ‘নির্যাতিতা’, ছেলেটি ‘অভিযুক্ত’। ছেলেটি নাবালক হলে তাকে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের কাছে হাজির করা হয়, শুনানি চলাকালীন তাকে অবজ়ার্ভেশন হোমে থাকতে হয়। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে— শিশুদের যত্ন ও সুরক্ষা আইন, ২০১৫ অনুযায়ী, ১৬-১৮ বছরের কোনও ছেলে বা মেয়ে গর্হিত অপরাধের জন্য অভিযুক্ত হলে, প্রাথমিক মূল্যায়নের পর বোর্ড তাকে শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা থেকে সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় স্থানান্তরিত করতে পারে। আর যদি পকসো আইনে অভিযুক্ত পুরুষের বয়স আঠারো বছরের বেশি হয় আর সঙ্গিনীর বয়স হয় আঠারো বছরের কম, এবং তাদের যৌন সংসর্গে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে তো কথাই নেই— ছেলেটির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হওয়া অবধারিত।
সম্মতিতে সহবাসের ক্ষেত্রে পকসো ধারায় মামলা শুরু হওয়ার পর প্রেমিক-প্রেমিকা তো বটেই, গোটা পরিবারের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছেলেটি ও তার ‘নির্যাতিতা’ বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে, হয়তো সন্তান আছে, পরিবার মেনে নিয়েছে, কিন্তু মামলা প্রত্যাহার করার উপায় নেই। এই সম্পর্কে তার সম্মতি ছিল, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির এই বয়ান আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতে মেয়েটি ও তার পরিবার বিরূপ সাক্ষী হয়ে যায়, তার পরেও আইনি ভোগান্তি চলতেই থাকে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ পালিয়ে-যাওয়া মেয়েটিকে উদ্ধার করে আনলেও সে বহু ক্ষেত্রে বাড়ি ফিরতে চায় না— কখনও মা-বাবার প্রতি বিরূপ মনোভাব, কখনও অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়ার ভয় থেকে। তার স্থান হয় সরকারি হোমে।
এমন ঘটনার সংখ্যা কম নয়— এনসিআরবি-র (২০২৩) রিপোর্ট অনুযায়ী, পকসো আইনে অভিযুক্তের পরিচয় বন্ধু, অনলাইন বন্ধু, বিবাহিত সঙ্গী, এমন ঘটনা কুড়ি হাজারেরও বেশি। এই অভিযুক্তরা সকলেই কিশোর বা কমবয়সি পুরুষ। একটি অসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে অসম, মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের ৭,৬০৪ পকসো মামলার মধ্যে ১,৭১৫ (২৪ শতাংশ) প্রেমঘটিত মামলা, এবং ৬১ শতাংশ মামলায় পকসো স্পেশাল কোর্টের পর্যবেক্ষণ হল যে এগুলি প্রেমঘটিত, কারণ দু’পক্ষের সম্মতি ছিল। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন হলেন অভিযোগকারী। এই গবেষণা অনুযায়ী, এ রকম মামলায় ৯৩ শতাংশ অভিযুক্ত খালাস হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এ রকম কোনও মামলায় অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হয়নি। যেখানে নির্যাতিতা যৌন নির্যাতন হয়েছে বলে সাক্ষী দিয়েছে, সেখানে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন আদালত এ ধরনের ‘রোমিয়ো-জুলিয়েট’ মামলা ঘিরে সমস্যার কথা ব্যক্ত করেছে। ২০১৯, ২০২১, ২০২৪-এ মাদ্রাজ হাই কোর্ট বার বার এই সমস্যাটিকে তুলে ধরেছে। ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্ট একই কথা বলেছে। জানুয়ারি, ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে পকসো মামলায় রোমিয়ো-জুলিয়েট ধারা প্রবর্তন করার সম্ভাবনা বিবেচনা করার কথা বলেছে।
পকসো-র অপব্যবহার ও বয়ঃসন্ধিকালীন যৌনসম্পর্ককে ‘অপরাধ’ বলে চিহ্নিত করা বন্ধ করা জরুরি। তা বলে যান্ত্রিক ভাবে যৌন সম্মতির বয়স আঠারো থেকে ষোলো বছরে কমিয়ে দিলেই সমাধান হবে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অব্যাহতির ধারাগুলিকে বিবেচনা করে, প্রয়োজন মতো পরিবর্তন ও ব্যবহার করে একটি সুষ্ঠু, স্পষ্ট অব্যাহতি ধারা তৈরি করতে হবে। তার সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তন, অভিভাবকদের সঙ্গে কথোপকথন, শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, পুলিশ, সমাজকর্মীদেরও শিশু সুরক্ষা, বয়ঃসন্ধিকালীন যৌনচেতনা ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শিশুদের অধিকার ও স্বাধীনতাকে আইনে ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। বুঝতে হবে যে প্রেমের সম্পর্ক, যা মানবজীবনে সহজ ও স্বাভাবিক, তাকে ‘অপরাধ’ করে তোলার ফলে কিশোর-কিশোরীরা সুরক্ষিত হওয়ার বদলে আরও বেশি জটিলতার সম্মুখীন হয়। তাদের নিজেদের শরীর-মন, চাহিদা ও আচরণ নিয়ে ছোটরা কী বলতে চায়, আমরা বড়রা সে কথা যেন একটু কান পেতে শুনি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে