Indian Agriculture

কৃষিতে কৃত্রিম মেধার বিপ্লব

এত দিন চাষের বড় অংশই নির্ভর করত কৃষকের অভিজ্ঞতা, অনুমান এবং স্থানীয় আবহাওয়ার ধারণার উপর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে, বহু ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা আর যথেষ্ট নয়।

দেবাশিস মিথিয়া

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৭:১০
Share:

ভারতের কৃষি আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ জলের দ্রুত হ্রাস এবং মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট; অন্য দিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং শ্রমিক সঙ্কট। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান তুলনামূলক ভাবে কমলেও, এখনও প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কৃষির সঙ্কট কেবল একটি অর্থনৈতিক সঙ্কট নয়; তা সামাজিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে নতুন আশা জেগেছে।

এত দিন চাষের বড় অংশই নির্ভর করত কৃষকের অভিজ্ঞতা, অনুমান এবং স্থানীয় আবহাওয়ার ধারণার উপর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে, বহু ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা আর যথেষ্ট নয়। কখন বীজ বোনা হবে, কতটা জল লাগবে, কোন জমিতে কী ধরনের পুষ্টির ঘাটতি আছে, কোথায় রোগ ছড়াতে পারে— এই সব প্রশ্নে এখন ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই জায়গাতেই এআই-ভিত্তিক ডেটা অ্যানালিটিক্স কৃষিকে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। গত কয়েক দশকের আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, মাটির আর্দ্রতা এবং ফসলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এখন বীজ বোনার উপযুক্ত সময় সম্পর্কে আগাম পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশের একাধিক অঞ্চলে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। একই ভাবে তামিলনাড়ু সরকারের এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা উপকূলীয় কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বা অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমাতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতের বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অথচ এখনও অনেক ক্ষেত্রে জল ব্যবহারের পদ্ধতি অনুমাননির্ভর। এই পরিস্থিতিতে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ সেন্সর এবং এআই-চালিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা এবং ফসলের প্রকৃত জলের চাহিদা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। মহারাষ্ট্রের আখচাষে ব্যবহৃত ‘জল এআই’ প্রযুক্তি স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয় ভাবে ড্রিপ সেচ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জল সাশ্রয় হচ্ছে। ভবিষ্যতের কৃষিতে এই ধরনের ‘স্মার্ট ইরিগেশন’ জলসঙ্কট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।

এখন এআই-ভিত্তিক ইমেজ প্রসেসিং প্রযুক্তি গাছের পাতা বা শিকড়ের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করতে পারছে। ‘প্ল্যান্টিক্স’ বা ‘অ্যাগনেক্সট’-এর মতো অ্যাপ এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পঞ্জাব ও হরিয়ানায় কৃষকেরা এখন ড্রোন ব্যবহার করে শুধু আক্রান্ত অংশেই কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। এর ফলে রাসায়নিকের ব্যবহার যেমন কমছে, তেমনই চাষের খরচও কমছে। অন্য দিকে, ‘এগ্রিবাজার’ বা ‘ই-নাম’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম এখন বাজারদর এবং চাহিদার পূর্বাভাস দিতে শুরু করেছে। ফলে কৃষকেরা সরাসরি বড় ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কিছুটা কমছে এবং কৃষকের আয়ও বাড়ছে।

শ্রমিক সঙ্কটের কারণে বহু অঞ্চলে চাষের খরচ দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এআই-চালিত রোবোটিক হারভেস্টার এবং স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাক্টরের ব্যবহার কৃষিকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হরিয়ানার কর্নালের একাধিক কৃষক ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল কাটার সময় এবং শ্রমিক খরচ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমাতে পেরেছেন। একই সঙ্গে ফসল সংগ্রহের সময় অপচয়ও কমছে। অর্থাৎ কৃষিতে শুধু শ্রমের বিকল্প নয়; ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্তের অংশও।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এখন এই প্রযুক্তিকে কৃষিনীতির কেন্দ্রে আনতে চাইছে। মহারাষ্ট্র ‘মহা এগ্রি এআই পলিসি’-র মাধ্যমে কৃষকদের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মধ্যে আনার চেষ্টা করছে। বারামতি অঞ্চলে এআই-নির্ভর কৃষি পরামর্শ ব্যবস্থার ফলে আখের উৎপাদন এবং কৃষকদের আয়— দু’টিই বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের ‘বপন উপদেষ্টা’ বা তেলঙ্গানার ‘সাগু বাগু’ প্রকল্পও দেখাচ্ছে, সঠিক তথ্য ও প্রযুক্তি কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।

বিদেশের অভিজ্ঞতাও এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করছে। আমেরিকায় জন ডিয়ার-এর ‘সি অ্যান্ড স্প্রে’ প্রযুক্তি এআই-এর মাধ্যমে আগাছা শনাক্ত করে শুধুমাত্র সেই অংশেই কীটনাশক ছড়াচ্ছে। ইজ়রায়েলের ‘প্রস্পেরা’ স্টার্টআপ আলাদা আলাদা চারার স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট সেচ ও পরিচর্যার পরামর্শ দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডসে এআই-চালিত রোবট গ্রিনহাউসে স্বয়ংক্রিয় ভাবে ফল সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ কৃষি ক্রমশ ডেটা, সেন্সর, রোবোটিক্স এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত হচ্ছে।

তবে এই প্রযুক্তিগত আশাবাদের মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ভারতের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে এখনও স্মার্টফোন নেই। ডিজিটাল পরিকাঠামোও সর্বত্র সমান নয়। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা কে পাবে, আর কে পাবে না— সেই বৈষম্যের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। আরও বড় প্রশ্ন হল ডেটার মালিকানা। কৃষিজমি, উৎপাদন, আবহাওয়া এবং বাজার-সংক্রান্ত বিপুল তথ্য যদি বড় প্রযুক্তি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তা হলে ভবিষ্যতে কৃষির উপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে। প্রযুক্তি তখন কৃষকের ক্ষমতায়নের বদলে নির্ভরতার নতুন কাঠামোও তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই এআই-নির্ভর কৃষিকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটি নীতিগত, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রশ্নও। প্রযুক্তিকে সস্তায় কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্থানীয় ভাষায় প্রশিক্ষণ তৈরি করা, ডেটা সুরক্ষার স্পষ্ট নীতি গড়া এবং কৃষকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো জরুরি। কারণ কৃষি শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়; তা মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং সমাজের সঙ্গেও জড়িত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন