প্রতিভা: দল হিসাবে বিটলস-এর শেষ অ্যালবাম ‘অ্যাবে রোড’-এর প্রচ্ছদ। ১৯৬৯।
এই নির্বাচনী ঋতুতে আমরা যখন লক্ষ্মীর ভান্ডার বা অনুরূপ প্রকল্পের উপযোগিতা নিয়ে চর্চায় ব্যস্ত, পৃথিবীর অন্য এক প্রান্তে সে সময় চালু হয়েছে এক প্রকার ‘সরস্বতীর ভান্ডার’। ‘সরস্বতীর সাধক’দের একাংশকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য।
এমনিতে সরকারের তরফ থেকে দেশের জনগণের বিভিন্ন অংশের জন্য বিনামূল্যে নানা পরিষেবা এবং পণ্য বিতরণের উদাহরণ রয়েছে অনেক। আর আজ, যখন অতিমারি-উত্তর দুনিয়ায় অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটতর হচ্ছে, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্লাবন ভাসিয়ে দিতে চলেছে সামাজিক সুস্থিতিকে, গোটা পৃথিবী জুড়েই সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে আরও বেশি করে। এর একটি সার্বিক রূপ অবশ্য রয়েছে— ‘সর্বজনীন মৌলিক আয়’ বা ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’— আদ্যক্ষরে ‘ইউবিআই’। যেখানে বাছবিচার ছাড়াই প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এই ভান্ডারগুলি আসলে সামাজিক সুরক্ষার ঝাঁপি। ট্রাম্পের সমর্থক থেকে বার্নি স্যান্ডার্সের অনুগামী, উন্নয়ন-বিষয়ক অর্থনীতিবিদ বা রাজনীতিবিদ, ভারত কিংবা ফিনল্যান্ড, কানাডা অথবা মেক্সিকো, স্পেন থেকে নামিবিয়া— নাগরিকদের অন্তত কিছু অংশকে, কৃষক, ছাত্র, বেকার, মহিলা, প্রবীণ নাগরিক, বা সমাজের অন্য কোনও ভাগকে নগদ অর্থ প্রদানের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করা আজ অসম্ভব। এ সবের কার্যকারিতা, রাজনীতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বহুবিধ আলোচনার সুযোগ রয়েছে, নিশ্চয়ই। এই লেখায় আমরা সে সব যুক্তি-প্রতিযুক্তির অন্তহীন গোলকধাঁধাকে এড়িয়ে একটা অন্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।
দুনিয়া জুড়ে সর্বজনীন মৌলিক আয় নিয়ে চর্চা হলেও রাষ্ট্রের তরফে শিল্পী-সাহিত্যিকদের— তাঁরা শিল্পী-সাহিত্যিক, এই পরিচয়ের ভিত্তিতে— শর্তহীন নিয়মিত রোজগারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার ঘটনা বিরল। অথচ, অতিমারির অস্থির ডানার ঝাপটায় শিল্পী-সাহিত্যিক-কলাকুশলীদের অর্থনৈতিক অবস্থা অন্য অনেকের থেকেই বেশি খারাপ হয়েছে দুনিয়ার সর্বত্র। তার বড় কারণ, তাঁরা যে পণ্য বা পরিষেবা ‘উৎপাদন’ করেন, আপাতদৃষ্টিতে সেগুলি প্রয়োজনীয় পণ্য বা পরিষেবা নয়। ফলে, সমাজে আর্থিক অস্থিরতা বা সঙ্কট তৈরি হলে প্রথম কোপ পড়ে সেই পণ্য বা পরিষেবা কেনার উপরেই। এই পরিপ্রেক্ষিতেই শিল্পীদের সাহায্যার্থে ২০২২ থেকে ২০২৫ অবধি তিন বছর ধরে একটি পাইলট প্রকল্প চালাল আয়ারল্যান্ড। এবং, সেই পাইলটের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে আয়ারল্যান্ড চালু করেছে শিল্পীদের জন্য স্থায়ী মৌলিক আয়ের ব্যবস্থা। আয়ারল্যান্ডের এই ‘সরস্বতীর ভান্ডার’ লেখক, শিল্পী, অভিনেতা, গায়কদের কথা ভেবে। তাই আয়ারল্যান্ডের সংস্কৃতিমন্ত্রী প্যাট্রিক ও’ডোনোভান তাঁদের গর্বের এই কর্মসূচিকে বলেছেন ‘বিশ্বের ঈর্ষা’।
সিস্টিন চ্যাপেল হোক কি অজন্তার গুহাচিত্র, মোনালিসা হোক কিংবা মেঘদূতম— অতীতের অনেক মহান শিল্পীরই বিখ্যাত কাজের পিছনে ছিল বিত্তশালী পৃষ্ঠপোষকদের সমর্থন। শিল্প-সংস্কৃতির বিশিষ্ট সমালোচক উইলিয়াম ডেরেসিউইচ ২০১৫ সালে ‘দ্য ডেথ অব দি আর্টিস্ট— অ্যান্ড দ্য বার্থ অব দ্য ক্রিয়েটিভ অন্ত্রপ্রনর’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন দি আটলান্টিক-এ। তিনি লক্ষ করেন, সে সময়ই শিল্পীদের জীবনপথ চলেছে বিবর্তনের এক অনন্য পর্যায়ের মধ্য দিয়ে। শিল্পীরা নিজেরা কী প্রকাশ করতে চাইছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি মনোযোগ ও সময় তাঁদের দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের চাহিদার পিছনে। পরবর্তী কালে বহু গোত্রের শিল্পীর সাক্ষাৎকারের উপরে ভিত্তি করে লেখা তাঁর ২০২০ সালের বই দ্য ডেথ অব দি আর্টিস্ট: হাউ ক্রিয়েটরস আর স্ট্রাগলিং টু সার্ভাইভ ইন দি এজ অব বিলিয়নেয়ারস অ্যান্ড বিগ টেক-এ ডেরেসিউইচ বলেন, আমরা বাস করছি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময়কালে। রেনেসাঁসের যুগে শিল্পীরা ছিলেন কারিগর, উনিশ শতকে বোহেমিয়ান, বিশ শতকে পেশাদার। আর ডিজিটাল যুগে একটি নতুন মডেল মূর্ত হয়ে বদলে দিচ্ছে শিল্পের প্রকৃতি এবং সমাজে শিল্পীর ভূমিকা সম্পর্কিত আমাদের মৌলিক ধারণাগুলিকে।
আজকের শিল্পীদের জন্য পৃথিবীটা বেশ কঠিন। তারকাসম শিল্পীদের কথা হচ্ছে না— কিন্তু অনামী, অনাবিষ্কৃত শিল্পীরা কঠোর সংগ্রাম করে চলেছেন। গত কয়েক দশকে শিল্পকলায় বিভিন্ন ধরনের সহায়তার পরিমাণ কমেছে। এই পরিবর্তনের পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, এবং ইন্টারনেট। আমরা বেশি করে মনে করছি যে, সঙ্গীতই হোক বা সিনেমা, অথবা বই বা অন্য কোনও শিল্পবস্তু, তার জন্য আলাদা করে টাকা দেওয়ার আদৌ কোনও প্রয়োজন নেই, কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে খুব সহজেই তা ‘কপি’ করে নেওয়া যায়। পাইরেসি চলে দেদার— ফলে উপভোক্তারাও অভ্যস্ত হয়ে পড়েন বিনামূল্যে এই পণ্যগুলি পেতে। ২০১৬ সালে আমেরিকান অনলাইন পাবলিশিং প্ল্যাটফর্ম মিডিয়াম-এ লেখা একটি প্রবন্ধে কানাডিয়ান প্রযুক্তি-সাংবাদিক এবং লেখক প্যারিস মার্ক্স বলেছিলেন, “শিল্পকে মূল্য দিতে হলে আমাদের অবশ্যই সমর্থন করতে হবে একটি মৌলিক আয়ের ব্যবস্থাকে।” সুতরাং শিল্পীদের অর্থ জোগানোর এই সুরটা বাঁধা হচ্ছিল কিছু দিন ধরেই। এর সঙ্গে সম্প্রতি এসে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উতল হাওয়া, যা ভাসিয়ে দিচ্ছে আমাদের সভ্যতাকে। দেখা যাচ্ছে, চ্যাটজিপিটি-উত্তর দুনিয়ায় শিল্পী-সাহিত্যিকরা অন্য বহু পেশার তুলনায় বেশি বিপন্ন। আঁকিয়ে থেকে লেখক, গায়ক— সব শিল্পীকেই গ্রাস করে নিতে চাইছে এআই। খুব সহজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করে ফেলা যাচ্ছে ‘শিল্প’— এবং, বাজার তাকে মনুষ্যসৃষ্ট শিল্পের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসাবে স্বীকারও করছে। এ অবস্থায় দুনিয়া যদি মানুষের ছোঁয়ায় ঋদ্ধ শিল্পকে মূল্য দিতে চায়, শিল্পীকে দিতে হবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা।
ফরাসি ম্যাগাজিন সোশ্যালটার-কে এই শতকে শিল্পের এবং শিল্পীদের পরিবর্তনের রূপরেখা বর্ণনা করেছিলেন আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ এবং লেখক ডেভিড গ্রেবার, চমৎকার উদাহরণের সাহায্যে। বিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে তৈরি হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য সঙ্গীত আন্দোলন, বিশ্বকে যা আচ্ছন্ন করেছে প্রায় প্রতি দশকেই। তেমনটা আর ঘটছে না কেন? “পরবর্তী জন লেনন কোথায়? সম্ভবত কোথাও সুপারমার্কেটে বাক্স প্যাক করছে,” বলেছিলেন গ্রেবার। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জন লেনন-দের এই অর্থহীন কাজের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি দিয়ে সঙ্গীতচর্চার অনুকূল পরিবেশ ও অবকাশ জোগানো কি রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?
অতিমারির ফলে বিধ্বস্ত শিল্পী এবং সৃজনশীল শিল্পকর্মীদের সহায়তার জন্য আয়ারল্যান্ড তাই চালু করল ‘বেসিক ইনকাম ফর দি আর্টস’ (বিআইএ) পাইলট প্রকল্প। এই ‘সৃজনশীল শিল্পকর্মী’ কারা? আয়ারল্যান্ডে এর সংজ্ঞা অনেকটা বিস্তৃত। ঐতিহ্যবাহী হোক বা সমসাময়িক, ‘শিল্প’-এর চৌহদ্দিতে সেখানে পড়ে যে কোনও ধরনের সৃজনশীল বা ব্যাখ্যামূলক প্রকাশ— দৃশ্যশিল্প, থিয়েটার, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, অপেরা, চলচ্চিত্র, সার্কাস এবং স্থাপত্য। থিয়েটারের অভিনেতাই শুধু নন, নির্দেশক, সেট ডিজ়াইনার, আলো প্রক্ষেপকরাও এর পরিধিতে। যেমন, নৃত্যশিল্পীই শুধুমাত্র শিল্পী নন, মেকআপ আর্টিস্ট কিংবা কোরিয়োগ্রাফারও পড়বেন এই সংজ্ঞার আওতায়। ২০০০ জনকে দেওয়া হতে থাকল সপ্তাহে ৩২৫ ইউরো করে— তাঁদের যেন ঘিরে ফেলা হল এক সামাজিক সুরক্ষার জালে, আর তাঁদের সঙ্গে তুলনা হল বেসিক ইনকামের আওতার বাইরের ১০০০ জনের। পরিভাষায়, র্যান্ডামাইজ়ড কন্ট্রোলড ট্রায়াল বা আরসিটি। মৌলিক আয়ের পরিমাণ কিন্তু খুব বেশি নয়— আয়ারল্যান্ডের গড় মোট বার্ষিক বেতনের মোটামুটি ৩০%।
আইরিশ পাইলট প্রকল্পটির ফল বেশ ইতিবাচক। অঙ্ক কষে দেখা গেল, প্রতি ইউরো বিনিয়োগ করে বৃহত্তর সমাজ ফেরত পেয়েছে ১.৩৯ ইউরো। মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী জেনি ড্যাগ একে বললেন শিল্পী ও সমাজ উভয়ের পক্ষেই জয়সূচক। দেখা গেল, মৌলিক আয় প্রকল্পের আওতায় থাকা শিল্পীদের শিল্প-সম্পর্কিত আয় বেড়েছে গড়ে মাসে প্রায় ৫০০ ইউরো করে, এবং শিল্প-সম্পর্কিত ব্যয় বেড়েছে ৩৩৩ ইউরো। অন্যান্য সামাজিক সহায়তার উপরে তাঁদের নির্ভরতা কমেছে। গুরুত্বপূর্ণ হল, শিল্পীদের উদ্বেগ বা হতাশার সম্ভাবনা কমেছে ২০%। এবং মহিলা-শিল্পীদের উন্নতি হয়েছে তুলনায় বেশি। সব মিলিয়ে শিল্পীদের জীবনে ঘটেছে রূপান্তর। তাঁরা এখন শিল্পচর্চায় এবং তাঁদের দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম আরও ভাল ভাবে।
আয়ারল্যান্ডের ‘বিআইএ’-এর লক্ষ্য স্পষ্ট— কর্মরত শিল্পী এবং সৃজনশীল শিল্প-পেশাদারদের শৈল্পিক সাধনায় মনোনিবেশে শর্তহীন সহায়তা প্রদান। এই ধারণাটি, এবং তার প্রয়োগ ও ফল, আকৃষ্ট করেছে আইরিশ জনতাকেও। সম্প্রতি সাধারণ মানুষের ৯৭% এবং শিল্পমহল একমত হয়েছে যে, প্রকল্পটি স্থায়ী করা উচিত। এবং সে পথ বেয়েই আয়ারল্যান্ড সৃষ্টি করেছে ইতিহাস, এবং বাকি দুনিয়ার জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। আইরিশ উদাহরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্কটিশ সরকারও নাকি একই ধরনের মৌলিক আয় প্রকল্প সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করছে শিল্পীদের জন্য।
আজকের দুনিয়ায় মহৎ শিল্পীর বিকশিত হওয়ার সহজ উপায় বলেছিলেন ডেভিড গ্রেবার— “একদল শ্রমিক শ্রেণির বাচ্চাকে নিয়ে তাদের এক সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার এবং খেলার জন্য টাকা দাও পর্যাপ্ত পরিমাণে, তুমি বিটলস-কে পাবে।” এ ভাবে এক জন জন লেনন তৈরি করা সম্ভব কি না, সে নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। তবু, পথ দেখিয়েছে আয়ারল্যান্ড।
সরস্বতীর ভান্ডারের ম্যাজিকে পৃথিবী হয়তো হয়ে উঠবে অন্তত আরও খানিকটা শৈল্পিক!
রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে