মূলধনি খাতে খরচ করার মতো টাকা সরকারের হাতে আছে কি
West Bengal Government

সাধ ও সাধ্যের ফারাক

ফেব্রুয়ারির বাজেটের সঙ্গে জুনের বাজেটের সবচেয়ে বড় তফাত সরকারের আয়বৃদ্ধি। ফেব্রুয়ারির তুলনায় জুনের বাজেটে রাজস্ব খাতে প্রায় ৩৩,০০০ কোটি টাকার আয় বেড়েছে। এর মধ্যে কিছু বৃদ্ধি প্রত্যাশা-নির্ভর, বাকিটা অপেক্ষাকৃত ভাবে নিশ্চিত।

অভিরূপ সরকার

শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৫:৫৭
Share:

নতুন সরকার, নতুন বাজেট। স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের প্রশ্ন, নতুন বাজেটের মধ্যে দিয়ে নতুন সরকার কি রাজ্যের আর্থিক নীতিতে কোনও মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কোনও ইঙ্গিত? গত ফেব্রুয়ারি মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য একটা বাজেট পেশ করেছিল। পূর্ণাঙ্গ বাজেট নয়, ভোট-অন-অ্যাকাউন্টস। সেই ফেব্রুয়ারি মাসের বাজেটের সঙ্গে এই জুন মাসের বাজেটটা তুলনা করলে খানিকটা বোঝা যাবে যে, নতুন সরকারের চিন্তাভাবনা পুরনো সরকারের থেকে আলাদা খাতে বইছে কি না।

ফেব্রুয়ারির বাজেটের সঙ্গে জুনের বাজেটের সবচেয়ে বড় তফাত সরকারের আয়বৃদ্ধি। ফেব্রুয়ারির তুলনায় জুনের বাজেটে রাজস্ব খাতে প্রায় ৩৩,০০০ কোটি টাকার আয় বেড়েছে। এর মধ্যে কিছু বৃদ্ধি প্রত্যাশা-নির্ভর, বাকিটা অপেক্ষাকৃত ভাবে নিশ্চিত। তুলনায় মূলধনি খাতে অর্থপ্রাপ্তি সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত আছে। মূলধনি খাতে অর্থপ্রাপ্তির বেশির ভাগটাই জুড়ে থাকে নতুন ঋণ। তাই এই খাতে অর্থপ্রাপ্তি অপরিবর্তিত থাকার অন্যতম তাৎপর্য হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য যে পরিমাণ নতুন ঋণ নেবে বলে ভেবেছিল, বর্তমান সরকার ঠিক সেই পরিমাণ ঋণই নেবে বলে ধার্য করেছে। বাজার থেকে, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে এবং অন্যান্য জায়গা থেকে নেওয়া মোট নতুন ঋণের পরিমাণটা নেহাত কম নয়— ৯৫,০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ ঋণের বোঝা কমানোর কোনও উদ্যোগ অন্তত এই বাজেটে দেখা যাচ্ছে না।

সরকারের বর্ধিত আয় যদি ঋণ কমানোর কাজে না লাগে, তা হলে কোন কাজে লাগছে? তারও আগের প্রশ্ন, সরকারের বর্ধিত আয়টা আসছে কোথা থেকে? মোটামুটি দু’টি উৎস থেকে সরকারের আয়বৃদ্ধি ঘটছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস কেন্দ্রীয় অনুদান। অনেক দিন কেন্দ্রীয় সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গে চালাতে দিত না— সম্ভবত এই ভয়ে যে, প্রকল্পগুলো চালানোর মাধ্যমে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজ্যে কোনও রাজনৈতিক সুফল তুলে ফেলে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর বদলে রাজ্য সরকার নিজের প্রকল্প চালাত। এর ফলে যে টাকাটা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আসতে পারত, সেটা আসত না। এই ক্ষতিটা রাজ্যবাসীকেই বহন করতে হত। এখন কেন্দ্রের প্রকল্পগুলো সরাসরি রাজ্যে চলতে শুরু করেছে, ফলে কেন্দ্রের কাছ থেকে টাকা বেশি আসছে।

কিন্তু শুধু এই কারণেই কেন্দ্রের কাছ থেকে বেশি টাকা আসছে, এমন নয়। আগের আমলে অনেক টাকা কেন্দ্রীয় সরকার আটকে রেখেছিল— কেউ বলতেই পারেন যে, তৃণমূল সরকারের জন্য খানিক অসুবিধা তৈরি করতে। এখন সেই টাকা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও সম্ভবত কিছু নতুন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা আসছে, যেটা কেন্দ্রে এবং রাজ্যে এক রাজনৈতিক দল থাকলেই সম্ভব। কেন্দ্রের মোট বর্ধিত অনুদানের মধ্যে কতটা আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এখন আবার চালু হওয়া কেন্দ্রীয় প্রকল্পের খাতে, কতটা আটকে থাকা প্রকল্পের টাকা ছেড়ে দেওয়ার কারণে, আর কতটাই বা নতুন কেন্দ্রীয় প্রকল্প শুরু হওয়ার জন্য, সেটা বাজেট থেকে বোঝা সম্ভব নয়। শুধু এইটুকু স্পষ্ট যে, সরকারের মোট আয়বৃদ্ধির প্রায় ৭০% টাকা কেন্দ্রীয় অনুদান বৃদ্ধি থেকে আসছে।

বাকি ৩০% আয়বৃদ্ধি রাজ্য সরকারের বর্ধিত রাজস্ব থেকে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি বাজেটের তুলনায় জুন বাজেটে বাড়তি ১২,০০০ কোটি কর-বাবদ রাজস্ব ধরা হয়েছে; কর-বহির্ভূত রাজস্ব আরও ৪,৫০০ কোটি টাকা। এই বৃদ্ধি অনুমান-নির্ভর। আশা করা হচ্ছে, সরকার বাড়তি উদ্যোগ করলে রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু রাজস্ব আদায় সরকারি উদ্যোগের উপরে কিছুটা নির্ভর করলেও পুরোটা করে না। সরকারি রাজস্বের সিংহভাগ যে-হেতু বিক্রয়কর, আদায় অনেকটাই নির্ভর করে রাজ্যের মানুষ কতটা খরচ করছে তার উপরে। মানুষ খরচ বেশি করবে যদি তার আয় বাড়ে। আগামী মার্চ মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গবাসীর আয় হঠাৎ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাবে, এমন মনে করার কারণ আছে কি?

এ বার ব্যয় প্রসঙ্গে আসি। দেখা যাচ্ছে, আয়বৃদ্ধি সত্ত্বেও মূলধনি ব্যয় এক টাকাও বাড়েনি। বস্তুত, ফেব্রুয়ারির বাজেটের তুলনায় জুনের বাজেটে মোট মূলধনি ব্যয় বাড়া তো দূরের কথা, ২২৭ কোটি টাকা কমে গেছে। মূলধনি ব্যয় স্থায়ী সম্পদ তৈরি করে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। নতুন সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বা আর্থিক বৃদ্ধির কথা ভেবেও থাকে, সেই ভাবনার কোনও ছাপতাদের প্রথম বাজেটে নেই। বাজেট-বক্তৃতায় পরিকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছে বটে, কিন্তু সেটা শুধুই কথার কথা। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি।

সত্য এটাই যে, বর্ধিত আয়ের সিংহভাগ প্রাক্-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় খরচ হয়ে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির তুলনায় জুন মাসের বাজেটে সামাজিক প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ বেড়েছে দশ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। নির্বাচনের আগে এই প্রকল্পগুলোতে অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সন্দেহ নেই, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করতে হয়েছে। আর একটা প্রাক্-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত হারে মহার্ঘ ভাতা দেওয়া। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য বেতন খাতে জুনের বাজেটে ফেব্রুয়ারি বাজেটের থেকে আরও সাড়ে ছ’হাজার কোটি টাকা বেশি রাখা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মহার্ঘ ভাতায় চার শতাংশ বৃদ্ধি ঘোষণা করেছিল। নির্বাচনের পরে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ঘোষণা করল ২০% বৃদ্ধি। এক শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিতে প্রতি মাসে পঁয়ষট্টি কোটি টাকার মতো খরচ হয়। অতএব অক্টোবর থেকে মার্চ এই ছয় মাস ষোলো শতাংশ বাড়তি মহার্ঘ ভাতা দিতে লাগবে আরও ৬২৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেতন খাতে যে বাড়তি টাকাটা রাখা হয়েছে, তার প্রায় পুরোটাই বাড়তি ২০% মহার্ঘ ভাতা দিতে খরচ হয়ে যাবে। তার মানে, এই অর্থবর্ষে মহার্ঘ ভাতা যদি আরও বাড়াতে হয়, সরকারের আরও ঋণ নেওয়া ছাড়া গতি নেই। এ ছাড়াও কৃষকদের সহায়তার জন্য এবং শিল্পক্ষেত্রে উদ্যোগপতিদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য বাড়তি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রের বরাদ্দের পরিমাণ শিল্পায়নের জন্য যথেষ্ট নয়।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নতি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকা ৬০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি মাদ্রাসা শিক্ষার পরিসরকে সঙ্কুচিত করার উদ্দেশ্যে সরকার এই পদক্ষেপ করে থাকে, তা হলে এর পিছনে যুক্তি আছে। আমাদের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশে কেন সরকারি আনুকূল্যে অংশত ধর্মভিত্তিক একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকবে, সে প্রশ্ন অনেক আগেই ওঠা উচিত ছিল। বেসরকারি খরচে এই রকম শিক্ষা চালু থাকতেই পারে, যেমন খ্রিস্টান এবং হিন্দু মিশনারি স্কুলগুলোতে রয়েছে। কিন্তু যে শিক্ষা-কাঠামোর সঙ্গে ধর্মের সংযোগ আছে, সেটা সরকারি টাকায় চলাটা অভিপ্রেত নয়। একটু একটু করে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের কি মূলস্রোতের সরকারি স্কুলশিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যায় না?

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসে কেন্দ্র থেকে খানিকটা বাড়তি টাকা আনতে পেরেছে, কিন্তু প্রাক্-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে সেই টাকার সিংহভাগ অনুদান ও বেতনের পিছনে খরচ হয়ে যাচ্ছে— এটাই বাজেটের সারাংশ। মানতে হবে, এই সরকারের বয়স দু’মাসও পেরোয়নি। এর মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান তারা করে ফেলবে, এটা আশা করা অন্যায়। বরং আশা করব, ভবিষ্যতে সরকারি উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টি হবে, পরিকাঠামো তৈরি হবে, শিল্প-সহায়ক যে প্রকল্পগুলো এই বাজেটে ঘোষিত হয়েছে, সেগুলোর জন্য বাজেটে যথেষ্ট আর্থিক বরাদ্দ থাকবে। এ সব থেকে গতি পাবে শিল্পায়ন, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি। তবু না আঁচালে বিশ্বাস নেই। তা ছাড়া, সরকারি ক্ষেত্রে যে এক লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এই বাজেটে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে তার বিপুল ব্যয়ভার সামলে সরকার কী করে মূলধনি খরচ বাড়াবে, সেটাও দেখার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন