বড় সামাজিক অন্যায়ের চেয়েও ব্যক্তিগত ক্ষতিতে বেশি উদ্বেগ

ভারতের জেন-জ়ি মুহূর্ত?

শুভময় মৈত্র

শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ০৮:৩৬
Share:

নতুন: ককরোচ জনতা পার্টির সমাবেশে উপস্থিত দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সোনম ওয়াংচুক প্রমুখ। ৬ জুন, নয়াদিল্লি। ছবি: পিটিআই।

শেষ পর্যন্ত আরশোলা— হাতি-ঘোড়া তলিয়ে যাওয়ার পরে? দিল্লীশ্বরদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ গভীরতর হচ্ছে, আন্দাজ করা যায়। এমনিতে, ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি নিয়ে প্রথম দফার উন্মাদনা খুব বেশি দিন স্থায়ী হওয়ার কথা ছিল না। একটি সমাজমাধ্যম-নির্ভর উদ্যোগ, যার জন্ম একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যার প্রতীক একটি আরশোলা, এবং যার অধিকাংশ সমর্থক প্রথম দিকে উপস্থিত ছিলেন ইন্টারনেটে— ভারতীয় গণতন্ত্রের অতিবিস্তৃত ও জটিল পরিসরে এমন বিক্ষোভের সাধারণত হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার কথা। কয়েক দিনের মধ্যে জনপ্রিয়তা, এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিস্মৃতি— সমাজমাধ্যমের ইতিহাসে এই ছক নতুন নয়।

এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। অন্তত পুরোপুরি হয়নি। গণতন্ত্র, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্যবাদ— এ সব প্রশ্ন নিয়ে গত এক দশকে বহু আলোচনা হয়েছে। বিরোধী রাজনীতির নানা অংশ বার বার এই বিষয়গুলি তুলেছে। সিজেপিও প্রথম দিকে সেই পথেই হাঁটছিল। কিন্তু সেখান থেকে খুব বেশি দূর এগোনোর সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ— কিন্তু, রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে সব সময় সমান কার্যকর নয়। মানুষের সব উদ্বেগ সমান রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয় না।

সিজেপির কৃতিত্ব, তারা খুব দ্রুত বুঝে ফেলেছে যে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে ধরতে গেলে কোন প্রশ্নকে কতখানি গুরুত্ব দিতে হয়। এই আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র বা কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা যতটা আলোচনায় ছিল, অল্প দিনের মধ্যেই তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করল নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, সিবিএসই-র মূল্যায়ন পদ্ধতি, অন-স্ক্রিন মার্কিং, ফল প্রকাশের অসঙ্গতি এবং পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। সিজেপির আন্দোলনও নতুন মাত্রা পেল— কারণ, বিষয়টি ‘রাজনীতি’তে আটকে রইল না, তা হয়ে উঠল সন্তানের ভবিষ্যৎ, প্রতিযোগিতা, নম্বর এবং সামাজিক উত্তরণের প্রশ্ন।

সিজেপির আন্দোলন সম্বন্ধে তো বটেই, এই আদর্শ-উত্তর সময়ের সার্বিক রাজনীতি সম্বন্ধেই এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ— কোন প্রশ্ন মানুষকে কতখানি নাড়ায়। মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, গণতন্ত্রের ক্ষয়— বহু প্রশ্ন নিয়েই ভারতের মধ্যবিত্ত ক্ষুব্ধ হতে পারে। কিন্তু এই সমস্ত প্রশ্নের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক সময় পরোক্ষ। ব্যক্তিগত জীবনে তার আঁচ অধিকাংশ সময়েই সরাসরি লাগে না; বা লাগলেও, তা সহ্যসীমা অতিক্রম করে না। কিন্তু, পরীক্ষার প্রশ্নে জড়িয়ে থাকে নিজের সন্তান, নিজের পরিবারের বহু বছরের আর্থিক বিনিয়োগ, সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বপ্ন। সরাসরি নিজের গায়ে আঁচ লাগলে তবেই মানুষ রাস্তায় নামে।রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নৈতিকতার সরল রেখা ধরে কাজ করে না; তা কাজ করে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

এই কারণেই রেলস্টেশন থেকে হকার উচ্ছেদে যিনি বিশেষ বিচলিত হন না, তিনিই পরীক্ষার ফল নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারেন— এমনকি, এ বছর তাঁর নিজের সন্তান বা প্রিয়জন পরীক্ষার্থী না হলেও। কারণ হকারের জীবিকা তাঁর নিজের জীবনের অংশ নয়। কিন্তু সন্তানের নম্বর তাঁর জীবনের অংশ। সামাজিক ন্যায়বিচারের বহু প্রশ্ন তাঁর কাছে দূরের সমস্যা হতে পারে; শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নয়। সেখানেই আঘাত লাগলে রাজনৈতিক অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে যায়।সিজেপি মধ্যবিত্তের এই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বটিকে ধরতে পেরেছে।

এই জায়গা থেকে দেখলে সিজেপি আর নিছক একটি সমাজমাধ্যম-নির্ভর স্যাটায়ার-প্রকল্প নয়— এটি মধ্যবিত্ত রাজনীতির একটি কেস স্টাডি। এমন উদাহরণ অবশ্য নতুন নয়। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির উত্থানও এক অর্থে মধ্যবিত্তের নির্দিষ্ট উদ্বেগকে রাজনৈতিক ভাষা দেওয়ার গল্প ছিল। মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ সে আন্দোলনকে ‘রাজনীতি’র বাইরে রাখতে চেয়েছিল। ঠিক যেমন, পশ্চিমবঙ্গেও আর জি কর-পরবর্তী আন্দোলনের সময়ে অনেকেই চেয়েছিলেন, কোনও রাজনৈতিক দল যেন আন্দোলনের মালিকানা না নেয়। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বার বার দেখিয়েছে যে, সামাজিক আন্দোলন এবং তার রাজনৈতিক পরিণতি এক জিনিস নয়। কোনও আন্দোলন এক ধরনের নৈতিক শক্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক ফসল শেষ পর্যন্ত অন্য কেউ ঘরে তুলতে পারে।

এই কারণেই সিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। তারা রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে কি না, নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কি না, আগামী বছরগুলিতে টিকে থাকবে কি না— কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর নেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সমাজমাধ্যম-নির্ভর অধিকাংশ আন্দোলনের আয়ু সীমিত। নতুন প্রশ্ন আসে, পুরনো উত্তেজনা ম্লান হয়ে যায়। তা ছাড়া বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি, নির্বাচনী দক্ষতা এবং বিস্তৃত সমর্থনভিত্তি এমন নয় যে,একটি নাগরিক আন্দোলন সহজে তাকে বিপদে ফেলতে পারবে।

কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্ব সব সময় নির্বাচনী সাফল্যে মাপা যায় না। ভারতের রাজনীতিতে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যা ভোটের অঙ্কে বড় পরিবর্তন আনেনি, কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনার ভাষা বদলে দিয়েছে। সিজেপির ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা এমন একটি ফাটলরেখা চিহ্নিত করেছে, যা দীর্ঘ দিন ধরে ছিল, কিন্তু স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান ছিল না।

আসলে মধ্যবিত্তের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি। বহু পরিবার তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যয় করে সন্তানের শিক্ষার জন্য। তারা বিশ্বাস করে যে, কঠোর পরিশ্রম, ভাল ফল এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সামাজিক উত্তরণ সম্ভব। এই বিশ্বাসই ভারতীয় মধ্যবিত্তের অন্যতম ভিত্তি। ফলে যখন পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে মনে হয় না। মনে হয়, সামাজিক চুক্তির ভিতেই চিড় ধরেছে। এই কারণেই সিজেপির আন্দোলনের আজকের চেহারাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখিয়েছে যে, শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়; তা রাজনৈতিক প্রশ্নও। নিট বা সিবিএসই নিয়ে ক্ষোভ কেবল পরীক্ষা সংক্রান্ত ক্ষোভ নয়; তা রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে নাগরিকের বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত।

ভবিষ্যতের কোনও নাগরিক আন্দোলনই সমাজমাধ্যমকে অস্বীকার করে এগোবে না। বাংলাদেশ থেকে নেপাল, ইথিয়োপিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা— সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে যে, অনলাইন পরিসর এবং রাজপথ ক্রমশ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠছে। আন্দোলন এক দিকে সংগঠিত হচ্ছে অনলাইনে, অন্য দিকে তার বৈধতা তৈরি হচ্ছে বাস্তবের জমিতে। কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার সরল উত্তর নেই। কিন্তু এই দুই জগতের সম্পর্ক বোঝা ছাড়া সমকালীন রাজনীতিও বোঝা কঠিন।

সিজেপির ক্ষেত্রেও তাই। লক্ষ লক্ষ অনুসারী থাকা মানেই রাজনৈতিক শক্তি নয়। আবার ছোট মিছিল মানেই প্রভাবহীনতাও নয়। রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় নির্ভর করে প্রশ্ন নির্বাচনের উপরে। কোন প্রশ্নটি জনমনে দাগ কাটছে, সেটাই আসল। এই প্রসঙ্গে সদ্যপ্রয়াত ইরানি লেখক মারজেন সাত্রাপির পার্সিপোলিস-এর একটি দৃশ্য মনে পড়ে। ছোট ছোট মেয়ের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ওড়না। রাষ্ট্র তার একটি নির্দিষ্ট অর্থ স্থির করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু শিশুরা সেই একই বস্তু নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য ব্যবহার খুঁজে নেয়। কেউ খেলছে, কেউ হাসছে, কেউ সেটিকে অন্য কিছুর প্রতীকে পরিণত করছে। অর্থাৎ বস্তুটি একই থাকছে, কিন্তু তার অর্থ বদলে যাচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতায়।

আরশোলার প্রতীকটিও হয়তো তেমনই। সেটি কোনও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দর্শন নয়। কোনও সুসংহত মতাদর্শও নয়। কিন্তু কখনও কখনও একটি প্রতীক এমন একটি প্রশ্নকে দৃশ্যমান করে তোলে, যা আগে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল— সিজেপি আপাতত সেটাই করেছে।

গণতন্ত্র, মূল্যবৃদ্ধি বা কর্মসংস্থানের প্রশ্নে নয়, তারা আলো ফেলেছে এমন একটি জায়গায়, যেখানে ভারতীয় মধ্যবিত্তের উদ্বেগ সবচেয়ে গভীর। আন্দোলনটি টিকবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু তারা ইতিমধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক আনুগত্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আরশোলাদের চোখ আপাতত সেখানেই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন