নব-অধ্যায়: পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি।
এপ্রিল মাস। ১৯৮৪ সাল। প্রধানমন্ত্রীর গদিতে ইন্দিরা গান্ধী। মাঝে-মাঝেই তিনি রাজনৈতিক চমক দিতে ভালবাসতেন। কিন্তু সেই চমকের পিছনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও থাকত, যা পরে টের পাওয়া যেত। সেই রকমই এক চমকে দেওয়া সিদ্ধান্তে ইন্দিরা গান্ধী হঠাৎ দিল্লির উপরাজ্যপালের পদ থেকে জগমোহনকে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল বি কে নেহরুকে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল গুজরাতে।
মাত্র তিন মাস। জুলাই মাসেই জগমোহন জম্মু ও কাশ্মীরের মসনদ থেকে ফারুখ আবদুল্লার সরকারকে বরখাস্ত করেছিলেন। রাজ্যপাল বদলের পিছনে ইন্দিরার পরিকল্পনা তখন টের পাওয়া গিয়েছিল।
প্রায় একই ভাবে বিধানসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী সরকার আচমকা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা আর এন রবিকে বদলি করল। তাও আবার আর এক ভোটমুখী রাজ্য তামিলনাড়ু থেকে। উদ্দেশ্য? হয়তো পরে টের পাওয়া যাবে। তবে রাখঢাক না-রেখে রাজু বিস্তা-র মতো বিজেপি সাংসদরা এখন থেকেই বলছেন, একমাত্র রাষ্ট্রপতি শাসনেই পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।
শুধু রাজ্যপাল পদে আচমকা রদবদল নয়। গত এক সপ্তাহে দেশের সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিদের নিয়ে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার সাক্ষী হল গোটা ভারত। তার মধ্যে কিছু ঘটনা কার্যত অভূতপূর্ব। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথা অনুযায়ী সম্মান না জানানো, অনুষ্ঠানে বাধা তৈরি করার মতো অভিযোগ তুলেছেন। তৃণমূল শিবির রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে রাজনীতি করার অভিযোগ তুলেছে। রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ব্যক্তিকেও বিজেপি ভোটের ময়দানে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। রাষ্ট্রপতি পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার ঠিক আগে নতুন রাজ্যপাল নিয়োগ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজ্যপাল হিসেবে আর এন রবির শপথের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘বিজেপির ক্যাডার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। লোকসভায় স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছেন, তিনি মোদী সরকারের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করছেন। নিজের পদের অপব্যবহার করছেন। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করছেন। একই অভিযোগে বছর দুয়েক আগে রাজ্যসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধেও বিরোধীরা অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিলেন। এ বার লোকসভার স্পিকার। সংসদের ইতিহাসে এর আগে এত কম সময়ের মধ্যে একই সঙ্গে লোকসভা, রাজ্যসভার অধ্যক্ষদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আসেনি। এরই মধ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অপসারণ প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে বিরোধী শিবির। তাঁর বিরুদ্ধেও বিরোধীদের নালিশ, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে বসে তিনি এসআইআর-এর মাধ্যমে বিজেপির হয়ে বিরোধীদের ভোট কাটতে নেমেছেন।
একের পর এক এই ঘটনা একটি সূত্রে বাঁধা— সাংবিধানিক পদের রাজনৈতিকীকরণের অভিযোগ। সহজ ভাষায়, সাংবিধানিক পদকে রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগানোর নালিশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, লোকসভার স্পিকার, রাজ্যপাল, এমনকি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতিও তালিকার বাইরে নন।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর দিল্লির বাসভবনে বসে আনন্দবাজার পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সে সময় তদানীন্তন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে রাজ্য সরকারের প্রবল বিবাদ চলছে। অমিত শাহকে এ নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, রাজ্যপাল কি সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করেছেন? জগদীপ ধনখড়ের প্রতি এই ‘আস্থা’ তাঁর উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে পদোন্নতিতেই প্রতিফলিত হয়েছিল। যদিও ধনখড়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালে পদে তাঁর উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের মতোই আচমকা বিদায় নিতে হয়েছিল।
তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে আর এন রবির সঙ্গে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে সরকারের বিবাদ জগদীপ ধনখড় বা সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিবাদকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। ডিএমকে সরকারের তৈরি রাজ্যপালের বক্তৃতা তাঁর মনোমত না হওয়ায় আর এন রবি বিধানসভা থেকে সেই বক্তৃতা পাঠ না করে বেরিয়ে গিয়েছেন। তামিলনাড়ুর বিধানসভায় পাশ হওয়া ১০টি বিল তিনি আটকে দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপাল হিসেবে রবির এই ভূমিকাকে কার্যত ভর্ৎসনা করেছিল। সে সময় উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের পদে বসে সুপ্রিম কোর্টকে পাল্টা তোপ দেগেছিলেন জগদীপ ধনখড়। সুপ্রিম কোর্টকে ‘সুপার পার্লামেন্ট’ হিসেবে আক্রমণ করতেও ছাড়েননি।
দেশের রাজনীতি বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এখন এটাই নিয়ম। সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া। তা সে রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল, লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হোন বা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে অভিযোগ তুলেছেন, তাঁর উত্তরবঙ্গের অনুষ্ঠানে বাধা তৈরি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রথা মেনে মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানাতে যাননি। ধরে নেওয়া যাক, রাজ্য সরকারের দিক থেকে গাফিলতি ছিল। ‘প্রোটোকল’ মানা হয়নি। রাষ্ট্রপতির ‘প্রোটোকল’ লঙ্ঘন নিয়ে আগেও বিভিন্ন রাজ্যে বিবাদ হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে আর কোনও রাষ্ট্রপতি নিজেই এ ভাবে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। আর কোনও রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে রাজনীতি করারও অভিযোগ ওঠেনি। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে বিজেপির শীর্ষনেতৃত্ব তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতিকে অপমান করার অভিযোগ তুলেছেন। দুর্ভাগ্যজনক হল, এই রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির জনজাতি পরিচিতিকেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন জগদীপ ধনখড় নিয়মিত ভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিরোধী শিবিরের নেতানেত্রীদের সমালোচনা করতেন। বিরোধীরা তাঁর সমালোচনা করলে পাল্টা জবাবও দিতেন। লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যানরা চিরকালই সংসদে হাঙ্গামা করে অধিবেশন অচল করে দেওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেন। ধনখড় সেখানেই থামতেন না। এ বার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা সংসদে বসে অভিযোগ তুলেছেন, কংগ্রেসের মহিলা সাংসদরা লোকসভার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে শারীরিক ভাবে আঘাত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিরোধীরা অনাস্থা প্রস্তাব এনে অভিযোগ তুলেছেন, স্পিকার কেন্দ্রীয় সরকারের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরুর পর থেকেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা সরব। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের নালিশ নতুন নয়। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার যা করেছেন, তা বোধ হয় আর কেউ করেননি। বিহারে এসআইআর-এর বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধী যে দিন ভোটার অধিকার যাত্রা শুরু করেছিলেন, ঠিক সেই দিনই তিনি দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছিলেন। ভোট চুরির অভিযোগের প্রমাণ দেখাতে না পারলে লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে দেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেছিলেন। ‘সাংবিধানিক পদে থেকে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া’ এর থেকে ভাল উদাহরণ হয় না।
প্রথমে রাজ্যপাল, তার পরে উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, জগদীপ ধনখড় দু’টি সাংবিধানিক পদের রাজনৈতিকীকরণের উদাহরণ রেখে গিয়েছিলেন। বিরোধীরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে ধনখড়ের আচরণ পরবর্তী কালে অন্য বিরোধী শাসিত রাজ্যে মোদী সরকারের নিযুক্ত রাজ্যপালদের অনুপ্রাণিত করেছে। কেরলের রাজ্যপাল হিসেবে আরিফ মহম্মদ খান, পঞ্জাবের রাজ্যপাল হিসেবে গুলাব চাঁদ কাটারিয়া, কর্নাটকের রাজ্যপাল হিসেবে থাওয়ার চাঁদ গহলৌত এবং তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে আর এন রবি আসলে ধনখড়কেই অনুকরণ করেছেন। এখন আর এন রবি রাজ্যপাল হিসেবে শপথের আগেই রাজু বিস্তা-র মতো বিজেপি সাংসদরা খোলাখুলি বলছেন, একমাত্র রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেই পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যপালের পদকে কেন্দ্রীয় সরকার বিধানসভা নির্বাচনের সময় বা তার পরে কী ভাবে ব্যবহার করতে চাইছে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হোন বা রাজ্যপাল, সাংবিধানিক পদে বসার পরে তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য থাকেন না। তাই তাঁদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিরা যদি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তা হলে গণতন্ত্রের বিপদ। দেশের রাজনীতির জন্যও তা সুখবর নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে