New Labour Law

বন্দির শ্রমের অমর্যাদার মাসুল

সারা ভারতে শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন কাজের আইনি ন্যূনতম মজুরি দিনে প্রায় ৭৮০ টাকা এবং রাজ্যভেদে ৩০০-৪০০ টাকা।

আদিত্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ০৮:২৯
Share:

জেলবন্দিদের কাজের পরিধি তিন ভাগে বিভক্ত— দক্ষ (স্কিলড), আধাদক্ষ (সেমিস্কিলড), অদক্ষ (আনস্কিলড)। আইন অনুসারেই সশ্রম কারাদণ্ডে জেলের ভিতরে শ্রম করতে হয়, এই কাজ করে তাঁরা উপার্জন করতে পারেন। অন্য দিকে, বিচারাধীন এবং কিছু সাজাপ্রাপ্ত বন্দি আবেদনের ভিত্তিতে জেলে কাজ করে উপার্জন করতে পারেন। তবে সেটা ঐচ্ছিক বিষয় এবং সব সময় আবেদন গ্রহণও হয় না। কিন্তু বন্দিদের প্রতি দিনের কাজের মূল্য একদম তলানিতে। কোনও দিনই তাঁদের দৈনন্দিন শ্রমমূল্য সমাজের বাকিদের মতো ছিল না। ক্রমবর্ধমান বাজারে যে ভাবে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে তার সঙ্গে তাঁদের উপার্জিত অর্থের কোনও সামঞ্জস্য থাকছে না। শুধু তা-ই নয়, বাকি শ্রমজীবী মানুষের যে ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র ঠিক করে দিয়েছে, সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা।

সারা ভারতে শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন কাজের আইনি ন্যূনতম মজুরি দিনে প্রায় ৭৮০ টাকা এবং রাজ্যভেদে ৩০০-৪০০ টাকা। ভারতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ন্যূনতম মজুরি আইন, ১৯৪৮ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, যা বর্তমানে ধাপে ধাপে মজুরি সংক্রান্ত ওয়েজ কোড ২০১৯-এর আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু এই আইনের আওতায় নেই বন্দিরা। কয়েক বছর আগে বন্দি কার্তিকচন্দ্র পাল হাই কোর্টে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে মামলা করেছিলেন। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার পুরনো মূল্য তালিকা পরিবর্তন করে নতুন মূল্য তালিকা প্রকাশ করেছে। নতুন মূল্য অনুসারে এক জন দক্ষ বন্দি দৈনন্দিন পাবেন ১৩৫ টাকা। আধাদক্ষ বন্দি পাবেন ১২০ টাকা এবং অদক্ষ বন্দি পাবেন ১০৫ টাকা। ২০২৪-এর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে এই মূল্য ধার্য হয়েছে। আগে ২০১৭-য় দৈনন্দিন মূল্য ছিল যথাক্রমে ১০০, ৯০ এবং ৮০ টাকা। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সময় এই শ্রমের মূল্য ঠিক কতটা উপযুক্ত, সেই নিয়ে দীর্ঘদিন বিভিন্ন মঞ্চে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সরকারের তরফে যুক্তি, যে-হেতু বন্দির খাওয়া, থাকা এবং স্বাস্থ্যের খরচ সরকারের তাই এই শ্রমের মূল্য স্বাভাবিক ভাবেই কম। আইনি যুক্তিও আছে। বন্দিদের কাজকে ভারতীয় আইনি ব্যবস্থায় সাধারণ অর্থে শ্রম বা চাকরি হিসাবে দেখা হয় না। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই কাজ মূলত দণ্ডকে কার্যকর করা ও বন্দির সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ।

এই কারণেই ন্যূনতম মজুরি আইন, ১৯৪৮ বা বর্তমানের মজুরি সংক্রান্ত ওয়েজ কোড ২০১৯— যে আইনগুলো স্বেচ্ছাশ্রম, দরকষাকষির অধিকার ও শ্রমিকের মর্যাদাকে ভিত্তি করে তৈরি, সেগুলি বন্দিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বন্দিদের কাজ বাছার স্বাধীনতা, মজুরি নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। ফলে তাঁদের শ্রমকে শ্রম আইনের আওতায় না এনে পুনর্বাসনমূলক প্রশিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ফলস্বরূপ মজুরি অত্যন্ত সীমিত। সংশোধনাগার বন্দিকে মূলস্রোতে ফিরতে সাহায্য করে। সেই বন্দি যখন মুক্তি পাবেন, তখন তাঁর উপার্জনের সেই অর্থ দৈনন্দিন জীবনে কতটা সময়োপযোগী হবে? সাধারণত বন্দির আয়ের প্রায় ৫০% খরচের জন্য দেওয়া হয়, যাতে তিনি জেলের ভিতরে প্রয়োজনীয় দ্রব্য (খাবার, সাবান, কাগজ ইত্যাদি) কিনতে পারেন। বাকি ৫০% কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে জমা থাকে, বন্দির মুক্তির সময় একত্রে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা মূলত দু’টি কারণে। যাতে বন্দি জেলের ভিতরে ন্যূনতম ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে পারেন, এবং যাতে মুক্তির পরে হাতে কিছু টাকা থাকে, যা সমাজে পুনর্বাসনে সাহায্য করবে।

ভারতীয় আইন বন্দিদের কাজকে সাধারণ শ্রম বা চাকরি হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না। এই শ্রম শাস্তিমূলক বা সংশোধনমূলক শ্রম হিসাবে চিহ্নিত। নৈতিক দিক থেকে এটি বিতর্কিত। কারণ বন্দিরা সমাজে ফেরার জন্য দক্ষতা অর্জন ও অর্থোপার্জন করতে চেষ্টা করেন, অথচ তাঁদের শ্রমের মূল্য সীমিত রাখা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আইনি যুক্তি এবং মানবিক নৈতিকতার মধ্যে স্পষ্ট ফাঁক।

কেন বন্দিদের শ্রমের মূল্য মানবিক বা বাজারভিত্তিক বিচার অনুযায়ী নির্ধারিত নয়? বন্দিদের শ্রম আইনে স্বীকৃত না হলেও বাস্তবে সেই শ্রম সম্পূর্ণ ভাবে উৎপাদনশীল। কারাগারের ভিতরে তৈরি বিভিন্ন দ্রব্য বিক্রয়যোগ্য, বিক্রি হয়ও। একটি কাজের উৎপাদিত দ্রব্য প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মূল্যবান হলে সেই মানুষের শ্রম কেন মূল্যহীন হবে? নাগরিকরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন, বন্দির শ্রমের মূল্য কম বা বেশি হলে সমাজের কী? একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে সব দেশে বন্দিদের ঠিক মজুরি দেওয়া হয়, সেখানে মুক্তির পর ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার তুলনামূলক ভাবে কম। কারণ আর্থিক স্থিতি ও কাজের দক্ষতা বন্দিকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে সাহায্য করে। বন্দি যখন সমাজে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর শ্রমের মর্যাদা অস্বীকার করে আমরা কি সত্যিই সংশোধনের পথ তৈরি করছি, না কি পুনর্বাসনের দরজাটা সঙ্কীর্ণতর হচ্ছে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন