দেশের রাজনীতি এখন বছরভর ভোটকৌশল-কেন্দ্রিক
Politics

ক্ষমতাশালী ভোটকুশলী

কয়লা চুরির মামলা দায়েরের ছয় বছর পরে কেন এখন ইডি আইপ্যাকের দফতরে হানা দিল, তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে জানাবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ইডি-র অভিযানে হস্তক্ষেপ নিয়েও আদালত ফয়সালা করবে। তবে রেবন্ত রেড্ডি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৫
Share:

যুদ্ধ: আইপ্যাক প্রধান প্রতীক জৈন-এর বাড়িতে ইডি-র তল্লাশি, কলকাতা, ১০ জানুয়ারি

তিন বছর আগের ঘটনা। ডিসেম্বর, ২০২২। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলছে। তেলঙ্গানার বর্তমান কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডি তখন লোকসভার সাংসদ, প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি। আচমকাই এক দিন রেবন্ত-সহ তেলঙ্গানার কংগ্রেস সাংসদরা লোকসভায় হইচই লাগালেন। অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের নির্দেশে পুলিশ নাকি কংগ্রেসের সাংগঠনিক তথ্য চুরি করার চেষ্টা করছে!

কী ব্যাপার? জানা গেল, হায়দরাবাদে পুলিশ তেলঙ্গানা কংগ্রেসের ভোটকুশলী বা ‘পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে কর্মরত সুনীল কানুগোলুর সংস্থা ‘ইনক্লুসিভ মাইন্ডস’-এর দফতরে হানা দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে আপত্তিজনক মন্তব্য করার জন্য তিন জনকে আটক করতে গিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু কংগ্রেসের দাবি ছিল, পুলিশ আসলে কংগ্রেসের ‘ওয়র রুম’-এ বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি, দলীয় সমীক্ষা, সম্ভাব্য প্রার্থী-তালিকা, রণকৌশল সংক্রান্ত তথ্য চুরি করেছে। প্রতিবাদে তেলঙ্গানা জুড়ে কংগ্রেস বিক্ষোভে নেমেছিল। কংগ্রেসের বহু নেতাকে ঘরবন্দি করেছিল পুলিশ। তার পরেও বিক্ষোভ থামেনি।

জাতীয় রাজনীতিতে এই ঘটনা নিয়ে বিশেষ হইচই হননি। কারণ রেবন্ত তখন মুখ্যমন্ত্রী নন। তিনি পুলিশি অভিযানে বাধা দিতে সুনীলের ইনক্লুসিভ মাইন্ডস-এর দফতরে চলে যাননি। তবে গোটা কংগ্রেসকে প্রতিবাদে সড়কে নামিয়েছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের তিন মাস আগে ইডি তৃণমূলের ভোটকুশলী আইপ্যাক-এর দফতরে হানা দিয়েছে। সে দিনের রেবন্তের মতো আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছেন, বিজেপি ইডি-কে পাঠিয়ে তৃণমূলের ভোটের প্রস্তুতির তথ্য চুরি করছে। প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গোটা তৃণমূল রাস্তায় নেমে পড়েছে।

কয়লা চুরির মামলা দায়েরের ছয় বছর পরে কেন এখন ইডি আইপ্যাকের দফতরে হানা দিল, তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে জানাবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ইডি-র অভিযানে হস্তক্ষেপ নিয়েও আদালত ফয়সালা করবে। তবে রেবন্ত রেড্ডি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। তা হল, ভোটকুশলীরা এখন রাজনৈতিক দলগুলির কাছে চূড়ান্ত অপরিহার্য। ভোটকুশলীদের দফতরই এখন রাজনৈতিক দলের ‘ওয়র রুম’। পার্টির সদর দফতর নয়, ভোটকুশলী সংস্থার দফতর থেকেই এখন দলের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয়। আর তাই সেখানে বিপক্ষ দলের পুলিশ বাহিনী হানা দিলে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’-র অভিযোগ উঠবে। আজকের ‘সৌজন্যহীন’ রাজনীতির যুদ্ধে ভোটকুশলীরাও আর অবধ্য নন।

মহারাষ্ট্র হাতেগরম প্রমাণ। পুণের পুর-নির্বাচনে অজিত পওয়ারের এনসিপি এ বার বিজেপির বদলে শরদ পওয়ারের এনসিপি ও উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার সঙ্গে জোট করেছে। অজিত মহারাষ্ট্রের বিজেপির জোট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী। তা সত্ত্বেও মহারাষ্ট্র পুলিশ অজিতের ভোটকুশলী নরেশ অরোরার ডিজ়াইন-বক্সড সংস্থায় হানা দিয়েছে।

দেশের রাজনীতি কবে থেকে এতখানি ভোটকুশলী-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ল! একটা সময় পর্যন্ত ভোটকুশলীরা শুধু নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতা বা দলের জন্য কাজ করতেন। আজ ভোটকুশলীরা সারা বছর ধরে দল বা সরকারের হয়ে কাজ করছেন। কোন সরকারি প্রকল্পে মানুষ কতটা খুশি, কোন নেতা সম্পর্কে মানুষের কী ধারণা, তা নিয়ে এখন ভোটকুশলী সংস্থাগুলি নিয়মিত সমীক্ষা চালায়। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে দল, সরকার নীতি বদলায়। প্রচারের নকশা, সমাজমাধ্যমের জন্য ‘কনটেন্ট’ তৈরি, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ, ভোটারদের শ্রেণিবিভাজন— এ সব এখন দলের নেতা-কর্মী নয়, এমবিএ বা ইঞ্জিনিয়ার ভোটকুশলীরা করে থাকেন। প্রশাসনেও ভোটকুশলী সংস্থার কর্মীদের লাগানো হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ পরিকল্পিত ভাবে তৃণমূলের ভোটারদের বাদ দেওয়া হবে ভেবে আইপ্যাক-কে নামানো হয়েছিল। সেই কারণেই ইডি আইপ্যাক-এ হানা দিয়েছে বলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারণা।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়। ভোটকুশলীরা এখন বিভিন্ন রাজ্যে শাসক দলের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। এক সময় প্রশান্ত কিশোর বিহারে নীতীশ কুমার, পঞ্জাবে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। প্রায় সব দলের হয়েই তাঁর আইপ্যাক কাজ করেছে। কিশোর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পরেও আইপ্যাক পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। আবার পঞ্জাবে কংগ্রেসের হয়ে ২০২৭-এর বিধানসভা ভোটের রণকৌশল সাজাচ্ছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ‘ব্র্যান্ড নরেন্দ্র মোদী’ তৈরিতে প্রশান্ত কিশোর ও সুনীল এক সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সুনীল এখন ‘ইনক্লুসিভ মাইন্ডস’ সংস্থা তৈরি করে কংগ্রেসের হয়ে কাজ করেন। রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র গোটা রূপরেখা তিনিই তৈরি করেছিলেন। কর্নাটকে কংগ্রেসের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া সুনীলকে তাঁর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমান মর্যাদা তাঁর। বিজেপিতে সংগঠনের মধ্যেই ‘অ্যাসোসিয়েশন অব বিলিয়ন মাইন্ডস’, ‘নেশন উইথ নমো’-র মতো ভোটকুশলী বিভাগ তৈরি হয়েছে। প্রশান্ত কিশোর, সুনীল, প্রতীক জৈনদের পথে হেঁটে এখন রবিন শর্মা, নরেশ অরোরা, সুহেলপ্রতাপ সিংহ, অঙ্কিত লালের মতো বহু ভোটকুশলী দেশের রাজনীতিতে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন।

নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেই তাঁর ভোটকুশলী হিসেবে প্রশান্ত কিশোর প্রচারের আলোয় আসেন। কিশোর অবশ্য প্রথম নন। ভোটকুশলী হিসেবে প্রথম সাড়া ফেলেছিলেন পল্লব পান্ডে। তিনি ছিলেন ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর পরামর্শেই ২০০৯-এর লোকসভা ও ওড়িশার বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্গে জোট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নবীন। কংগ্রেসে অবশ্য আশির দশকেই ভোটকুশলীদের আবির্ভাব ঘটেছিল। রাজীব গান্ধীকে অরুণ নেহরু কম্পিউটারে তথ্য-পরিসংখ্যান ঘেঁটে রণকৌশল তৈরিতে সাহায্য করতেন। সে-ও আসলে ভোটকুশলীর কাজই ছিল।

ভোটকুশলীদের প্রভাব কতখানি, তা বোঝা যায় এনসিপি-র অজিত পওয়ারকে দেখলে। গত ত্রিশ বছরে তাঁকে কেউ হাসতে দেখেনি। এখন তাঁর ঠোঁটে সব সময় হাসি ঝুলে থাকে। সৌজন্যে তাঁর ভোটকুশলী নরেশ অরোরার পরামর্শ। নির্বাচন জেতায় ভোটকুশলীদের কতখানি কৃতিত্ব?

আইপ্যাক-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ঋষি রাজ সিংহ সম্প্রতি বলেছেন, ভোটকুশলীরা নির্বাচনে জয়ের একমাত্র কারণ নন। তবে ভোটকুশলীদের ছাড়া এখন আর নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়। দক্ষিণ ভারতের একটি নামী ভোটকুশলী সংস্থা যেমন সম্প্রতি বিজ্ঞাপন দিয়েছে, ‘আপনি কি বিধায়ক হতে চান? আপনি কি বিধায়ক হিসেবে নিজের কেন্দ্র সামলাতে পারছেন না? তা হলে যোগাযোগ করুন।’ অতীতে ভোটকুশলীরা কিছুটা গোপনীয়তা রেখে কাজ করেছেন। এখন রাখঢাক নেই। শুধু দল হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত স্তরেও অনেক নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ-বিধায়ক নিজেদের ভোটকুশলী নিয়োগ করছেন। কেন্দ্রে বা রাজ্যের মন্ত্রীরা এখন সরকারি প্রচারযন্ত্রের ভরসায় না থেকে নিজের ঢাক পেটাতে বেসরকারি প্রচার সংস্থাকে ভাড়া করছেন। ১৯৫১-৫২’তে দেশের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে রাজনীতিকরা নিজেদের প্রচারে গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি করিয়েছিলেন। স্বল্প দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছিল। এখন ইনস্টাগ্রামের যুগে মোবাইলের জন্য কনটেন্ট তৈরি করে দিচ্ছেন ভোটকুশলীরা। আগে সাংবাদিকরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কে ‘অগ্নিকন্যা’, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’-এর মতো বিশেষণ লিখতেন। সে সবই রাজনীতিকদের প্রচারের হাতিয়ার হয় উঠত। এখন রাজনীতিকদের ‘বিকাশপুরুষ’ বলা হবে না কি ‘বিশ্বগুরু’, তা ভোটকুশলীরা ঠিক করে দিচ্ছেন।

বণিকসভা অ্যাসোচ্যাম-এর ২০১৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সে সময় দেশে ১৫০টি ভোটকুশলী সংস্থা কাজ করছিল। বড় শহরের সঙ্গে ছোট শহরেও। মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা। দশ-বারো বছর পরে এখন এই ব্যবসার অঙ্ক কোথায় পৌঁছেছে, তা আঁচ করা যায়। শুধু ভোটের মরসুমে নয়, এখন ভোটকুশলী সংস্থা সারা বছর কাজ করছে। বিজ্ঞাপন তৈরি, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ, গবেষণা, রিপোর্ট তৈরির কাজে দক্ষ পেশাদারদের নিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনার বদলে ভোটকুশলীদের পরামর্শের ভিত্তিতেই দলের শীর্ষনেতারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

নিট ফল? ভারতে নির্বাচনের খরচ আকাশ ছুঁয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণের কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। ভোটকুশলীদের দফতর পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন