কোথাও কিছু পচছে: সমাজে, সংস্কৃতিতে
Film Industries

‘বীভৎস’ মজার দিনকাল

কোয়েন্টিন টারান্টিনোর নামটা বার বার এসে যাচ্ছে, কারণ ভারতে এই মুহূর্তে ডার্ক এবং গোর ছবির কারিগরেরা প্রায় সকলেই তাঁকে ঘোষিত ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছেন। হলিউডের এই পরিচালকের একটি নিজস্ব শৈলী আছে।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:৫৪
Share:

ভারতীয় রসশাস্ত্রে বীভৎস অন্যতম রস। কিন্তু রৌদ্র রস (উগ্র ক্রোধ) বা বীর রসের সঙ্গে তাকে এক করে ফেলা হয়নি। অর্জুনের এক নাম তাই বীভৎসু— যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি কোনও বীভৎস কার্য করেন না। শাস্ত্র মতে বীভৎস রসের স্থায়ী ভাব হল জুগুপ্সা (ঘৃণা, নিন্দা, বীতরাগ)। অর্থাৎ বীভৎস রসের সঞ্চার দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের মনে জুগুপ্সার জন্ম দেবে, এটাই অভিপ্রেত। কিন্তু এই অমৃত কালে এসে দেখা যাচ্ছে, বীভৎসের আবাহন এখন অতি উপাদেয়। রৌদ্র রস এবং বীর রসের সঙ্গে তার সীমারেখাও ঝাপসা।

এ দেশের জনপ্রিয় ছবির একটা বড় অংশ ইদানীং বীভৎস রসের আবাহনে মাতোয়ারা। ইংরেজিতে যাকে ‘গোর’ বলা হয়, সেই গোত্রীয় উপাদানের বহুল ব্যবহার জনপ্রিয় ছবির আজ অন্যতম দিকচিহ্ন। শুধু তা-ই নয়, কে কতখানি ‘গোর’ প্রদর্শন করতে পারেন, তার যেন প্রতিযোগিতা চলছে। এবং এই পথের পথিকেরা প্রায়শই একে অন্যের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। অ্যানিমাল হিট করার পরে যেমন অনুরাগ কাশ্যপ দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে বসলেন সন্দীপ রেড্ডি ভাংগা-কে। সন্দীপও প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখলেন, পরের পর্বে নিজেকে ছাপিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ আরও গোর, আরও হিংস্রতার অঙ্গীকার। সেই অনুরাগ-রামগোপাল বর্মা-সন্দীপরা এখন ধুরন্ধর-এর পরিচালক আদিত্য ধরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পৌরুষের এমন শিরদাঁড়া সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না বলে আদিত্যকে উৎসাহ দিয়েছেন সন্দীপ। জবাবে আদিত্যও বলেছেন, সন্দীপের মতো পৌরুষময় ছবি বানাতে খুব কম লোককেই দেখেছেন। হিংসা-বীভৎসা-উগ্রতা একেবারে মিলেজুলে পৌরুষের জয়গান গাইতে নেমেছে। তারই সুবাদে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের বহুলাংশ ঘুরপাক খাচ্ছে অপরাধ-সন্ত্রাস-যুদ্ধ-প্রতিহিংসার বৃত্তে। কখনও তা ইতিহাসের মোড়কে, কখনও বর্তমানের আধারে। বক্স অফিস উজাড় করা দর্শকের আশীর্বাদ ভরসা দিচ্ছে যে, তাঁরা ঠিক পথেই যাচ্ছেন।

হিংস্রতা বা ভায়োলেন্সের প্রদর্শনী ছবিতে নতুন কিছু নয়। হিংস্রতা যদি জনজীবনের অংশ হয়, তার প্রতিফলন শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্রে পড়বে, ধরেই নেওয়া যায়। কিন্তু হিংস্রতাই যদি বিনোদনের প্রায় প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন সন্দেহ হয় যে, কোথাও কিছু পচছে। সমাজের দিক থেকেও পচছে, সংস্কৃতির দিক থেকেও। এবং উভয়েই উভয়ের পচনকে ঢাকঢোল বাজিয়ে উদ্‌যাপন করছে। পচনের যে গন্ধে সাধারণ ভাবে নাকে হাত চাপা দেওয়ার কথা, সেটাকেই মনোরম সুবাস বলে মনে হচ্ছে।

গন্ডগোলটা এইখানে। ছবিতে হিংস্রতা বা বীভৎসতার উপস্থিতি কেন থাকবে, প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্নটা এই যে— তার উপস্থাপনা কেমন হবে, কোন অভিপ্রায় থেকে হবে এবং কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সে জন্ম দিতে চাইবে। যেমন ধরা যাক গোবিন্দ নিহালনির অর্ধসত্য। সে ছবিতে পুলিশি অত্যাচারের কিছু ভয়াবহ দৃশ্য ছিল। ওম পুরী অভিনয় করছিলেন পুলিশের চরিত্রে। সেখানে হিংস্রতার গ্রাফিক ডিটেল যতখানি ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ওমের ক্লোজ় আপ। সাদাসিধে দেখতে একটা মানুষ কী ভাবে পৈশাচিক হয়ে উঠছে, সেই মুখচ্ছবির প্রতি জুগুপ্সা তৈরি করা ছিল তার উদ্দেশ্য। আর এখন পৈশাচিকতার বিবরণীই সবচেয়ে মুখরোচক। আগে দর্শক গান ভালবাসেন বলে ছবিতে গানের বাহুল্য থাকত। এখন দর্শক পছন্দ করবেন ধরে নিয়ে নৃশংসতার বস্তা উপুড় করে দেওয়া হচ্ছে। দর্শকও তালি দিয়ে বলছেন, বাহ্, মজা এসে গেল! হ্যাঁ, বাঙালিরও এখন আর মজা হয় না, মজা লাগে না— মজা একেবারে ঘরে ঢুকে আসে।

বাঙালি বাস্তবিক মজায় আছে। ‘গোর’স্থানে তাকে আর সাবধান হতে হচ্ছে না আজকাল। সে হিংস্রতার উৎসবে শামিল হতে পেরে কৃতার্থ। সুবর্ণরেখা ছবিতে ঋত্বিক যখন বীভৎস মজার কথা বলেছিলেন, সেটা ছিল মজার বিশেষণ। ঋত্বিক যখন শতবর্ষ স্পর্শ করছেন, তত দিনে বীভৎস নিজেই মজায় পরিণত। এ বছর বাঙালির প্রাণে তাই বড় আনন্দ— আহা! ‘গোর’ দেখার জন্য আর টারান্টিনো, বলিউড বা দক্ষিণী ছবির উপরে ভরসা করতে হবে না! বাইশে শ্রাবণ-দ্বিতীয় পুরুষ-ভিঞ্চিদা প্রভৃতি যে ধারাটি ধীরে ধীরে তৈরি করছিল, ষড়রিপু-শিবপুর-ভাগ্যলক্ষ্মী ইত্যাদি পেরিয়ে, হিংসা-নিমজ্জিত এক গাদা ওয়েব সিরিজ়ে চান করে সে এখন ‘অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর সামনে চা খাচ্ছে। দর্শকও সোৎসাহে বলছেন, ‘এমনটি যে বাংলায় দেখতে পাব, ভাবিনি। পথ চেয়ে আর কাল গুনে বসেছিলাম, কবে এই শহরে টারান্টিনোর আবির্ভাব হবে!’

কোয়েন্টিন টারান্টিনোর নামটা বার বার এসে যাচ্ছে, কারণ ভারতে এই মুহূর্তে ডার্ক এবং গোর ছবির কারিগরেরা প্রায় সকলেই তাঁকে ঘোষিত ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছেন। হলিউডের এই পরিচালকের একটি নিজস্ব শৈলী আছে। সারা পৃথিবী জুড়েই তাঁর ভক্তের সংখ্যা অগণিত। শুধু টারান্টিনোই বা কেন? তাকাশি মিকে, জন উ, কিম জি-উন, গ্যাসপার নো, জর্জ মিলার— অজস্র নাম করা যায়। নানা দেশে নানা ধরনের ছবি হবে, নানা বাস্তবতা থেকে নানা শৈলীর উদ্ভব হবে, নানা ধরনের দর্শক তাঁদের পছন্দের ছবি বেছে নেবেন— এটাই স্বাভাবিক, বাঞ্ছনীয়ও বটে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতা আর বাঞ্ছনীয়তাই অনেকখানি ক্ষু্ণ্ণ হয়, যখন দেখা যায় কিছু বিশেষ গোত্রের ছবি বা পরিচালককুলের আরাধনা একটি জাতির অভিজ্ঞান হয়ে উঠতে চলেছে। শিল্পের স্বাধীনতা, দর্শকের স্বাধীনতা ইত্যাদি লব্জ তখন কার্যত একটা আধিপত্যবাদের চেহারা নেয়। কারণ আখেরে দর্শকের নিজস্ব বাছাইয়ের সুযোগ কমে যায় এবং তাকে একটা নির্দিষ্ট ধরনের ছবির মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে যেতে হয়। এর আগেও হিন্দিতে রক্তচরিত্র, রামন রাঘব ২.০, অগ্নিপথ, এনএইচ ১০, গ্যাংস অব ওয়াসেপুর-এর মতো উগ্র হিংসাশ্রয়ী ছবি হয়েছে। কিন্তু সে সবই আরও পাঁচ রকম ছবির মধ্যে একটা রকম হয়ে থেকেছে। কিন্তু অ্যানিমাল-কিল-ছাওয়া-ধুরন্ধর’রা যে মহাসড়ক নির্মাণে ব্রতী, তার অভিঘাত অনেক ব্যাপ্ত, অনেক তীব্র। সেটা শুধু চশমার পাওয়ার নয়, চশমাটাকেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং সেই সূত্রেই বাক্‌স্বাধীনতা ও নৈতিকতার আন্তঃসম্পর্কের প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নৈতিকতার কথা হচ্ছে। নীতির কথা নয়। নীতি-পুলিশির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা একটি নৈতিক অবস্থান। সেই একই নৈতিক অবস্থান এ প্রশ্নও করে, কী দেখব আর কেন দেখব। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ইয়ানলুকা ডে মুটিসিয়ো-র একটি প্রবন্ধ আছে— ইমমরালিটি অব হরর ফিল্মস। সেখানে তিনি সওয়াল করেছিলেন, উদগ্র হিংস্রতার ছবি নাগাড়ে দেখলে তিন ধরনের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে— সংবেদনশীলতার সাড় কমে যায়, মানুষ নাশকতাকে উপভোগ করতে শেখে এবং অপরের যাতনায় যে সহমর্মিতার উদ্রেক হওয়ার কথা, সেটি ক্রমশ ভোঁতা হতে থাকে। মুটিসিয়ো-র পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকতে পারে, ঠিক যে রকম পর্নোগ্রাফির পক্ষে-বিপক্ষে থাকে। যৌনতা-হিংস্রতা উপস্থাপনার মাপকাঠি সময়ের সঙ্গে বদলানো স্বাভাবিক। হিন্দি ছবির নিরিখে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে শোলে ছিল পর্দায় হিংস্রতার এক নতুন বিস্ফোরণ। আজ হয়তো সেটা আর তত চোখে লাগে না। কারণ, চোখ সয়ে গিয়েছে।

এই সয়ে যাওয়াটা অবশ্য এ যুগের তুলাদণ্ডে বেশ বিপজ্জনক। কারণ গত এক দশকে নিউ নরমালের নিত্য নতুন ধাপে আমরা বড্ড দ্রুত অভ্যস্ত হয়েছি। ২০১৪-১৫ নাগাদ আইসিস জঙ্গিরা প্রায়ই বন্দিদের মুন্ডু কাটার ভিডিয়ো প্রকাশ করত। এ দেশেও লোকে গোগ্রাসে সে সব দেখত। তার পর লোকে নিজেরাই হত্যাকাণ্ডের ভিডিয়ো তুলতে শিখে গেল। কথায় কথায় দল পাকিয়ে মানুষ মেরে ফেলাটাও প্রায় রুটিন হয়ে দাঁড়াল। আইসিস কি হাতে ধরে শেখাল? না। আইসিস এমন এক দৃশ্যজগৎ খুলে দিল, যেখানে মুঠোফোনে মানুষ মরতে দেখার রিয়ালিটি শো চোখ সয়ে গেল। সেই সয়ে যাওয়া থেকে আমরা দ্রুত উপভোগের চৌকাঠে পা রাখলাম। হত্যা-নিগ্রহ-নির্যাতনের ‘আসলি’ ছবির ‘কদর’ ঊর্ধ্বমুখী হল। সয়ে যাওয়ার অভ্যাসও পোক্ততর। দশ বছর আগে দাদরিতে মহম্মদ আখলাককে যখন গোরক্ষকেরা খুন করে, সারা দেশ শিউরে উঠেছিল। দশ বছর পরে তত শিউরে ওঠে না আর। মনে করে, ও-রকম তো হয়! ঠিক যেমন আজ অ্যানিমাল-অ্যাকাডেমি-ধুরন্ধর’এ মজা ‘আসছে’, কাল এগুলো জলভাত মনে হবে। তখন আবার আরও ভয়ানক কী দেখানো যায়, ভাবতে বসতে হবে। কারণ, যে বিনোদনের মেধাসম্পদ হিংস্রতার রকমফের প্রদর্শনে নিয়োজিত আর যে দর্শক সেই বিনোদনের চাতক— তারা দু’জনেই এক ধর্ষকামী বিশ্বের নাগরিক। বীভৎসতার খাদ্যমূল্য সেখানে খুব চড়া। শুধুই আরও-র চাহিদা। কত কম দেখিয়ে কত বেশি অভিঘাত তৈরি করা যায়, সাধনার সেই মার্গে এর গতায়াত নেই। ‘গোর’স্থানে বরং অপশব্দ শুনেই মানুষ হাসে। নৃশংসতা দেখে আনন্দ পায়। নিষ্ঠুরতা দেখলে উৎফুল্ল হয়। হিংস্রতা তাকে শিহরিত করে না, বিবমিষা জাগায় না। সে শুধু পরবর্তী দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করে, আরও বেশি করে উত্তেজিত হবে বলে। আরও অসাড় হবে বলে।

কুরুক্ষেত্রে তীক্ষ্ণ অসি দিয়ে দুঃশাসনের বক্ষ বিদীর্ণ করে রক্ত পান করেছিলেন ভীম। শিরশ্ছেদ করে রক্ত চেখে বলেছিলেন, “মাতার স্তনদুগ্ধ, মধু, ঘৃত, উত্তম মাধ্বীক মদ্য, দিব্য জল এবং মথিত দুগ্ধ ও দধি প্রভৃতি অমৃততুল্য যত পানীয় আছে, সে সমস্তের চেয়ে এই শত্রুরক্ত অধিক সুস্বাদু মনে হচ্ছে।” (রাজশেখর বসু) তাঁর সেই রূপ দেখে সৈন্যদের হাত থেকে অস্ত্র খসে গিয়েছিল। অস্ফুট আর্তনাদে ‘এ মানুষ নয়, রাক্ষস’ বলে তারা পলায়ন করেছিল। বিকশিত-প্রায় ভারতে সেটি হওয়ার জো নেই। আমরা ভীমসেনের ফেসবুক লাইভ দেখব, রণাঙ্গনের ভিডিয়ো তুলে রাখব। পর্দায় এলে হাজার কোটির ব্যবসা দেব। তমসো মা জ্যোতির্গময়ের প্রার্থনা নয়, তিমিরই অধুনা তীর্থ।

‘বিনোদন’: হিংসা প্রদর্শনের ধরন পাল্টাচ্ছে, শোলে চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন