গাজ়ায়, ইরানে মানবতার বিরুদ্ধে, মানবাধিকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
War Against Humanity

যেন কফিনের আলপনা

গোটা বিশ্ব সাম্প্রতিক কালে যে যুদ্ধের সাক্ষী থাকছে, তা কার্যত নজিরবিহীন ভাবে মানবতাবিরোধী, মানবাধিকার-ভঙ্গকারী। একের পর এক হাসপাতাল বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তাপস সিংহ

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১০
Share:

‘সেবা’কেন্দ্র: ধ্বংসস্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে আল-শিফা হাসপাতাল, গাজ়া, ৩১ মার্চ। ছবি: রয়টার্স।

একের পর এক বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গোটা চত্বর ধ্বংসস্তূপ, চার দিকে বিধ্বস্ত কাঠামো। তারই মধ্যে গাজ়ার আল-শিফা হাসপাতাল চত্বর সেজে উঠেছে কাগজের ফুলের তোরণে, না হলে বধ্যভূমিতে অত তাজা ফুল কোথা থেকেই বা আসবে?

বাঁধা হয়েছে মঞ্চ। দু’শো ছাত্রছাত্রী তাঁদের মেডিক্যাল কোর্স সাঙ্গ করে সমাবর্তনের সারিতে হাসিমুখে শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে। ডিগ্রি দেওয়া হবে তাঁদের। যাঁরা দাঁড়িয়ে, তাঁরা অধিকাংশই স্বজনহারা। আকাশ ও স্থলপথে লাগাতার আক্রমণে তাঁদের কেউ হারিয়েছেন বাবা-মাকে, কেউ ভাই-বোন বা অন্যান্য আত্মীয়-বন্ধুকে। এক জীবনে থেকে অন্য জীবন বাঁচিয়ে রাখতে মাধুকরী করে ফিরছে গাজ়া।

গোটা বিশ্ব সাম্প্রতিক কালে যে যুদ্ধের সাক্ষী থাকছে, তা কার্যত নজিরবিহীন ভাবে মানবতাবিরোধী, মানবাধিকার-ভঙ্গকারী। একের পর এক হাসপাতাল বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ঘায়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে স্কুলবাড়িতে শ’য়ে শ’য়ে শিশুর দেহ, যাদের সঙ্গে যুদ্ধের কী সম্পর্ক, তা ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুরা বুঝিয়ে বলেননি। গাজ়া ভূখণ্ডে ইজ়রায়েল যা করেছে তা হামাসের বিরুদ্ধে নিছক পাল্টা সামরিক অভিযান নয়। বরং সুপরিকল্পিত ভাবে একের পর এক হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিয়ে, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী ও ত্রাণকর্মীদের উপরে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে, ত্রাণসামগ্রী সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিয়ে নেতানিয়াহুরা নিশ্চিত করে ফেলেছেন যে, প্যালেস্টাইনে আগামী বেশ কয়েকটি প্রজন্ম আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত সংগঠন ‘হিউম্যানিটারিয়ান আউটকামস’ তাদের ‘এড ওয়ার্কার সিকিয়োরিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এ জানিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে ত্রাণকর্মীদের উপরে হামলা ও তাঁদের হেনস্থার ঘটনা বেড়ে চলেছে। ২০২৪-এ রেকর্ড সংখ্যক ত্রাণকর্মী প্রাণ হারান, ৩৮৩ জন। ওই বছরে ৩০৮ জন গুরুতর জখম হন, ১২৫ জনকে অপহরণ এবং অন্তত ৪৫ জনকে গ্রেফতার অথবা আটক করা হয়। ২০২৫-এর প্রথমার্ধেও এই সংখ্যা বেড়েছে‌— গাজ়ায় সবচেয়ে বেশি। তার পরেই সুদান, লেবানন, ইথিয়োপিয়া এবং সিরিয়া। ইউক্রেনও আছে এই তালিকায়। ২০২৪-এ ত্রাণকর্মীদের উপরে মোট ৫৬৮টি ভয়াল হামলা ঘটেছে, যা ২০২৩-এর তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

এরই পাশাপাশি আরও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট উল্লেখ করা যাক। ‘দ্য সেফগার্ডিং হেলথ ইন কনফ্লিক্ট কোয়ালিশন’ (এসএইচসিসি) ৪০টি মানবাধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মিলিত সংস্থা। তারা বিশ্বের যুদ্ধ কবলিত বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপরে বিভিন্ন হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করে, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার প্রশ্নেও তারা নানা পরামর্শ দেয়। তারা জানাচ্ছে, ২০২৪-এ বিশ্বের ৩৬টি দেশে স্বাস্থ্যপরিষেবায় ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপরে হামলা বা বাধাদানের মোট ৩৬২৩টি ঘটনা ঘটেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে গাজ়া, ঘটনার সংখ্যা ১৩৬১— ২০২৩-এর থেকে যা ২২ শতাংশ বেশি।

এত সবের মধ্যে যেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল বিভিন্ন আগ্রাসী রাষ্ট্রের বদলে যাওয়া মানসিকতা। অতীতে কিন্তু দেখা গিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীনও মানবতার স্বার্থে ত্রাণকর্মীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে, অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিন্তু এখন ও-সব অলীক— ত্রাণ আটকে দিয়ে, ত্রাণকর্মীদের উপরে হামলা চালানোকে আর যুদ্ধাপরাধ বলে শক্তিধরেরা মনে করছেন না। তাঁরা আর ভাবছেন না যে, রণাঙ্গনেও মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখতে নানা আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। তাঁদের যেন বোঝার কোনও দরকার নেই, ত্রাণকর্মীরা আদপে মানবাধিকার কর্মী।

২০২৫-এর জানুয়ারিতে ট্রাম্প সরকার প্রশাসনিক আদেশবলে বিশ্বে ত্রাণসাহায্য প্রথমে তিন মাসের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরে এই খাতে অনুদানের পরিমাণ অত্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়। অথচ, আমেরিকা আগে এই ক্ষেত্রে বিশ্বে সব থেকে বড় দাতা ছিল। বিশ্বে মানবতারক্ষা ও আর্তদের জন্য মোট ত্রাণের পরিমাণের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই আসত আমেরিকার কাছ থেকে।

শুধু কি ত্রাণ? হাসপাতাল ও স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপরে একের পর এক ভয়াবহ আক্রমণের পিছনে ইজ়রায়েলের যুক্তি পরিষ্কার। এগুলিকেই হামাস তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে, তাই এ ছাড়া পথ নেই। এ বার ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের প্রথম দিনেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব-এ একটি স্কুলের উপরে আছড়ে পড়ল ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান জানায়, এই ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৬৫ থেকে ১৭০ জনের। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন খুদে পড়ুয়ার সঙ্গেই প্রাণহানি হয়েছে ২৬ জন শিক্ষকের। ছেলেমেয়েগুলোর বয়স বারোও পেরোয়নি! আহতের সংখ্যা একশোরও বেশি। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের অলাভজনক নিরপেক্ষ তদন্তকারী ও গবেষণা সংস্থা ‘বেলিংক্যাট’ ও অন্য কয়েকটি সংগঠন দাবি করে, ওই স্কুলের পাশে যে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছিল, সেটি ‘টমাহক’। ইরানি সরকারি মিডিয়া পরে ঘটনাস্থল থেকে টমাহকের অংশবিশেষ দেখিয়ে দাবি করে, এটা আমেরিকারই কাজ। কারণ, তারা ছাড়া এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আর কোনও দেশের হাতে টমাহক নেই।

পাকিস্তানও পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। অতি সম্প্রতি আফগানিস্তানে হাসপাতালের উপরে পাকিস্তান বোমা ফেলায় প্রায় চারশো মানুষের প্রাণ গিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

অথচ, রণাঙ্গনে অসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পরিকল্পিত চেষ্টা কি আমেরিকাতে হয়নি? জো বাইডেনের আমলেই সে কাজ শুরু হয়। কোনও অভিযানে বা যুদ্ধের সময়ে অসামরিক ব্যক্তি, হাসপাতাল, স্কুল বা সম্পত্তির ক্ষতি কমাতে সে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একটি প্রকল্প চালুও করে। আমরিকার বিমান বাহিনীর একদা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও কমব্যাট অপারেশনের বিশেষজ্ঞ ওয়েস জে ব্রায়ান্ট ছিলেন সেই প্রকল্পের সিনিয়র পরামর্শদাতা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পরে সে প্রকল্প কার্যত শিকেয় উঠেছে। ব্রায়ান্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ট্রাম্প জমানায় বর্তমান প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অনেক বেশি আগ্রাসী। ট্রাম্প ও তাঁর পরামর্শদাতাদের আক্রমণের তালিকা এখন আরও প্রসারিত।

অসামরিক ব্যক্তিদের রক্ষা করাটা কতটা জরুরি? এই প্রসঙ্গে আমরা মনে করতে পারি আফগানিস্তানে আমেরিকা ও নেটো বাহিনীর তৎকালীন প্রধান, জেনারেল স্ট্যানলে ম্যাকক্রিস্টালের কথা, যিনি আফগানিস্তানে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন তাঁর মানবিক মুখের কারণে। তিনি মনে করতেন, প্রতিটি নিরীহ মানুষের মৃত্যু অন্তত দশ জন শত্রু তৈরি করে!

দক্ষিণ ইরানের মিনাবের সেই ছবিটা মনে পড়ে— সারি সারি কফিন আর কবরের আলপনা যেন। গোটা পৃথিবীতেই এখন এই আলপনা আঁকা হয়ে চলেছে— অনবরত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন