এই রবিবাসরীয় সকালে, যখন ভোটের আঁচের পাশে আসন্ন নববর্ষের তাপ-উত্তাপও ফিকে, নেতা আর পার্টির লোক ছকে নিচ্ছেন আজ ছুটির দিনে অন্তত নির্বাচনী জমায়েতগুলোয় লোক এনে ফেলতেই হবে যে করেই হোক; আর সাধারণ মানুষের কেউ হয়তো চোখ খোলামাত্র (যদি আদৌ রাতে দু’চোখের পাতা এক হয়ে থাকে তো) ভাবছেন ডিলিটেড-ট্রাইবুনাল-ডি-ভোটার মায় ডিটেনশন ক্যাম্প অবধি নানা দুঃশব্দ, তার চেয়ে এক ধাপ উপরে থাকা কেউ ভাবছেন ভোট তো এল কিন্তু সমস্যার শেষ নেই, গ্যাস সিলিন্ডারটা বুঝি আজও এল না— সেই বাজারে ঘুঁজিমুজি হাতের লেখার একখান ছবি বড় করে ছাপিয়ে সকাল সকাল কী পড়ানোর কল করছে খবরের কাগজ?
তলার সইটা চিনতে পারবেন অনেকে। সত্যজিৎ রায়। সইয়ের নীচে তারিখটাও স্পষ্ট: ২৫/১০/৯০। তার মানে, এ হয় একটা চিঠি, বা বিবৃতি কিছু। ছুটির দিনে আপনার মেলা কাজ, আর বেশি ক্লেশ না দিয়ে বয়ানটুকু এখানেই তুলে ধরা যাক—
“অন্ধ সংস্কার ও যুক্তিহীন ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সংঘাতের পথে মানুষের জীবন বিপন্ন করে চলেছে।
অপরকে আঘাত দিয়ে, অগ্রাহ্য করে, নিজের ধর্মমত জাহির করা এবং অশিক্ষিতদের স্থান ও নামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রচেষ্টাগুলি ধর্মের নামে অধর্মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতাকে ভুলে আমরা যেন আজ আবার সাম্প্রদায়িক হিংসা ও বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে না পড়ি, কারণ তার থেকে ধিক্কারজনক অন্যায় আর কিছু হতে পারে না।” সত্যজিৎ রায় ২৫/১০/৯০
এ বছর জানুয়ারিতে সন্দীপ রায়ের সম্পাদনায় বেরিয়েছে নতুন এক বই, আরো যত প্রবন্ধ (বিচিত্রপত্র গ্রন্থন বিভাগ)। ইতিউতি ছড়িয়ে-থাকা সত্যজিৎ রায়ের নানা লেখা— চলচ্চিত্র-ভাবনা, কৃতী-স্মরণ, অন্যদের বইয়ের জন্য লেখা ভূমিকা, শুভেচ্ছাবার্তা ইত্যাদির মধ্যে ‘আবিষ্কার’ করা গেল এ লেখাও, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে লেখা, কিছু ঘটনার বিরুদ্ধে’ প্রতিবাদপত্র। সত্যজিতের হস্তাক্ষরে মূল চিঠিটি ছাপা হয়েছে, সঙ্গে উৎসসূত্রও: ‘প্রসঙ্গ সত্যজিৎ, নন্দন, ১৯৯২’।
কী হচ্ছিল নব্বইয়ের অক্টোবরের কলকাতায়, যার প্রেক্ষিতে এমন লিখলেন তিনি? খুব বেশি দিনের কথা তো নয়। অযোধ্যায় পৌঁছনোর আগে দেশ জুড়ে লালকৃষ্ণ আডবাণীর রামরথচক্রের ঘর্ঘর তখন জাতীয় স্তরে সবচেয়ে বড় আবর্ত, আর তার ছোট কিন্তু বিপজ্জনক সব ঘূর্ণি উঠছে দেশ জুড়ে: উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গে। ২১ অক্টোবর কলকাতায় শহিদ মিনারে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভা থেকে আঙুল উঠছে ‘অযোধ্যায় রামমন্দির হবেই’, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ বলছেন ‘সরকারের চেয়ে দেশ বড়’, জোট সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বিজেপি। ২৪ অক্টোবর বিহারে আডবাণী গ্রেফতার হতে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে, আর পশ্চিমবঙ্গে উঠছে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বুড়বুড়ি, বাম-শাসিত কলকাতায় বড়বাজারে অযোধ্যা-যাত্রা তথা বাবরি মসজিদ ‘ধ্বংস’-এর জন্য করসেবকদের তোড়জোড়, উঠে আসছে রামকুমার-শরদকুমার কোঠারি ভাইদের নাম। এমন সময়েই, অক্টোবরের পঁচিশে উদ্বিগ্ন সত্যজিৎ লিখছেন এই শব্দগুলি— তাঁর প্রিয় শহর, শহরবাসী ও সমগ্র বঙ্গবাসীর প্রতি। দ্ব্যর্থহীন ভাবে, স্পষ্ট ভাষায় সমসময়ের চেহারাটা তুলে ধরে, সতর্ক করছেন বাঙালিকে।
ছত্রিশ বছর পর, আজ, কী কী পাল্টে গেছে তা বুঝিয়ে বলে দিতে হবে না। কী কী পাল্টায়নি, সেটা বরং বলা যায়। ‘অন্ধ সংস্কার’, ‘যুক্তিহীন ধর্মীয় ভাবাবেগ’, ‘কিছু সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি’, ‘সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সংঘাতের পথ’— এই মুহূর্তে ঘোরতর আরও। ‘অপরকে আঘাত’ দেওয়া, ‘অগ্রাহ্য’ করা হয়ে উঠেছে আচরণের অভিজ্ঞান। আর ‘নিজের ধর্মমতকে জাহির করা’, ‘স্থান ও নামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রচেষ্টা’? তার দগদগে রূপ দেখা যাচ্ছে খালিচোখেই— কেবল রাজনীতির বয়ানেই নয়, সমাজে, লোকব্যবহারেও— চার পাশের চেনা এবং প্রিয়জনদের মধ্যেও। ভোট তো কতই আসে-যায়, এক-একটি ভোটে শাসকের পদস্খলন, অসঙ্গতি, ‘অপরাধ’ হয়ে ওঠে প্রচারের মুখ্য বয়ান, কিন্তু ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের প্রধান ‘ন্যারেটিভ’টি অদৃষ্টপূর্ব। একটি রাজনৈতিক দল বা তার সমর্থকেরা সাম্প্রদায়িক হতে পারে, ইতিহাসে আগেও হয়েছে। কিন্তু এত কাল ভাবা হয়েছিল সাম্প্রদায়িক জোঁকের মুখে মোক্ষম নুন হল নাগরিক-সমাজ; রাজনীতি যখন ঘাড়ের রোঁয়া ফুলিয়ে এসে বলবে ‘ওই মানুষটা তোর জাত-ধর্মের নয় তাই তোর শত্রু, ওকে খতম কর’, তখন সমাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে কারণ তার মধ্যে আছে আবহমান কালের সম্প্রীতি আর ঔদার্যের জিন। রাষ্ট্র যখন সাম্প্রদায়িক হবে, সমাজ তখন তার অসাম্প্রদায়িকতা দিয়ে নিজেকে ও অন্যকেও রক্ষা করবে, এ-ই তো বাঙালির ইতিহাস— কাঁটাতারের দু’পারেই। কোন রাজনীতি সেই উত্তরাধিকার কেড়ে নিল? খেটে-খাওয়া মানুষটি থেকে শুরু করে তথাকথিত শিক্ষিত বিশিষ্টদের মুখের ভাষাতেও কেন এত ঘৃণা? অটো-মেট্রোয় সহযাত্রীর মুখে, ইস্কুল-কলেজের স্টাফ রুমে, অফিসের ক্যান্টিনে, বন্ধু-আড্ডায়, এমনকি নিজগৃহেও কেন কান পাতা যাচ্ছে না! এত বিদ্বেষ, ঘৃণা বঙ্গমনে জমে ছিল তবে!
এই আকালে, হায়, কে দিবে আর সান্ত্বনা— শিল্পী ছাড়া? উপনিষদে সত্যদ্রষ্টাকে বলা হয়েছে ‘কবি’; শেলি লিখেছিলেন, কবিরা হলেন জগতের ‘আনঅ্যাকনলেজড লেজিসলেটরস’। তাঁরা সেই সব নীতি ও নৈতিকতার প্রণেতা, জীবন জুড়ে আর বিশেষ করে সঙ্কটকালে যারা হয়ে ওঠে সাধারণের আশ্রয়। আজ, এই মুহূর্তে কী করণীয়, কোনটা পরিহার্য, তাঁরাই তো বলবেন। সত্যজিৎ যেমন তাঁর চিঠি-শেষে সতর্ক করেছেন ‘ইতিহাসের অভিজ্ঞতা’ ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে, সাম্প্রদায়িক হিংসা ও বিশৃঙ্খলার জেরে ঘটে-যাওয়া ‘ধিক্কারজনক অন্যায়’ নিয়ে। আজ তিনি নেই, দিশেহারা সময়ে দিগ্দর্শন মিলত এমন বাঙালি মনীষাদীপগুলি গত কয়েক বছরে একের পর এক নির্বাপিত। তবু যাঁরা এখনও আছেন, সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত চিত্রকলা নাট্য চলচ্চিত্র শিক্ষা-ক্ষেত্রে যাঁদের এখনও মান্যগণ্য করে সমাজ, তাঁরা কি এগিয়ে এসে এটুকু উচ্চারণ করতে পারছেন না সমস্বরে, “ইতিহাসের অভিজ্ঞতাকে ভুলে আমরা যেন আজ আবার সাম্প্রদায়িক হিংসা ও বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে না পড়ি, কারণ তার থেকে ধিক্কারজনক অন্যায় আর কিছু হতে পারে না”? কোন রাজনীতি-পরিচয়ের অস্বস্তি এতটুকু বলাও আটকায়?
নববর্ষ আসছে, নববর্ষ যাবে। ভোট আসছে, চলে যাবে সে-ও। কিন্তু বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার, তার চিরকালীন মুক্তবুদ্ধির যে পরীক্ষা এই নববৈশাখে রাজনৈতিক কষ্টিপাথরে ঘষে দেখা হতে চলেছে, তা নিশ্চিত ভাবেই অ-ভূতপূর্ব। কারণ বাঙালি নিজেই এ বার প্ররোচিত, বিভ্রান্ত, এবং বিদ্বিষ্ট। সমষ্টির অন্তর থেকে বিদ্বেষবিষ মুছতে ওই রকম এক পত্র ও পত্রলেখককুলের আজ বড় প্রয়োজন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে