Industrial Land

যেখানে ছিল, সেখানেই

সম্প্রতি তৃণমূল সরকার যে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলি নিয়েছে, সেখানে সাফল্যের হার খুব কম। ডেউচা পাঁচামিতে জমির পরিমাণ তিন হাজার একরেরও বেশি।

শুভময় মৈত্র

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৩
Share:

ভবিষ্যৎ: মহম্মদবাজারের ডেউচা পাঁচামি প্রস্তাবিত কয়লা খনি প্রকল্পের চাঁদা মৌজায়। জুন ২০২৫। পাপাই বাগদি।

বঙ্গশাসনে তৃণমূল কংগ্রেসের তৃতীয় ইনিংসেও জমি সংক্রান্ত বিষয়ে সাফল্য সে-ভাবে কিছু নেই। শিল্পের বিষয়টিতে বামফ্রন্ট সরকার যে মোটের উপরে ব্যর্থ ছিল, তা প্রশ্নাতীত। শাসনের শেষ পর্যায়ে তারা কৃষিকে ভিত্তি করে শিল্পায়িত ভবিষ্যতের কথা বলেছিল— কিন্তু, সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়নের দায় তাদের নিতে হয়নি; ধ্বংসের স্লোগান তুলে তৃণমূল ক্ষমতায় এল। অর্থাৎ যে জমি আন্দোলনের পথ ধরে তৃণমূল ক্ষমতায়, সেই শিক্ষা থেকে জোর করে জমি আদায়ের মতো পদক্ষেপ সরকারি ভাবে তাদের না-করাই স্বাভাবিক। তার পরও অবশ্য প্রশ্ন থাকে— গত পনেরো বছরে ঠিক কী হল?

সম্প্রতি তৃণমূল সরকার যে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলি নিয়েছে, সেখানে সাফল্যের হার খুব কম। ডেউচা পাঁচামিতে জমির পরিমাণ তিন হাজার একরেরও বেশি। প্রযুক্তিগত তথ্য বলছে যে, এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লা ব্লক, এবং এর অধিকাংশ জমি সরকারি আর পাথুরে অঞ্চলে। অর্থাৎ সিঙ্গুরের মতো ‘সুজলাং সুফলাং’ নয়। মুখ্যমন্ত্রী নিজে একাধিক বার বলেছেন, এই প্রকল্পে জোর করে জমি অধিগ্রহণ হবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্যাকেজ দেওয়া হবে। সেই নিয়মে তো জমির জ্যামিতিতে বিশেষ বিশেষ বিন্দু খুঁজে নিয়ে অল্প কয়েকজন অনিচ্ছুক পেয়ে গেলেই কাজ বন্ধ। এত বড় ঘোষণা করার আগে সে সমীক্ষা হয়েছিল কি? পুনর্বাসনের কথাও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ভাবে আলোচিত না-হলে উচ্ছেদের কথা আসবে কী করে?

স্থানীয় আদিবাসী ও বনবাসী মানুষদের একাংশ অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের জমি ও বনভূমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি এখনও স্পষ্ট নয় এবং বনাধিকার আইন অনুযায়ী গ্রামসভাগুলির সম্মতি যথাযথ ভাবে নেওয়া হয়নি। এই নিয়ে একাধিক বার এলাকায় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের খবর এসেছে। গত বসন্তে সেখানে ব্যাসল্ট খুঁড়ে কয়লা খোঁজার শুরুতেই ভূমিপুত্রদের জোরদার আন্দোলনে বিঘ্নিত হয়েছে কাজ। অর্থাৎ, সে-ভাবে বিরোধী দলগুলির বিক্ষোভ না-হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি জমি জটে আটকেছে।

পরের উদাহরণ উত্তরপাড়ার হিন্দুস্থান মোটরস কারখানার জমি। এই জমি শহরের কাছে, এবং তিনশো একরেরও বেশি— অর্থাৎ, জমির দাম চড়া। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা এই শিল্পাঞ্চলে অব্যবহৃত জমি রাজ্য সরকার অধিগ্রহণ করে নতুন শিল্পের জন্য বরাদ্দ করেছে। সরকারের যুক্তি, বহু বছর ধরে অব্যবহৃত জমিকে নতুন শিল্প সন্ধানে ব্যবহার করা দরকার— এতে কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, জমি পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, আগের কর্মীদের দাবি কী ভাবে মেটানো হবে, এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত আদৌ গুরুত্ব পাচ্ছে কি না। হিন্দুস্থান মোটরসও রাজ্যের সিদ্ধান্ত মানেনি, আদালতে গিয়েছে গত বছর— যদিও সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারের পক্ষেই রায় দেয়, যে কথা বলেছিল কলকাতা হাই কোর্টও। যদিও আদৌ সেই জমিতে এখনও কাজের কাজ কিছু হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

ভারতের আইনের নিরিখে, জমির মালিক আদতে রাষ্ট্র— নাগরিকরা সবাই রায়ত। জমির উপরে নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার সম্পূর্ণ নয়, রাষ্ট্র চাইলে সে জমি নিয়ে নিতেই পারে। কিন্তু, রাষ্ট্র যদি কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার জন্য জমি দখল করতে চায়, তখন কী হবে? বিষয়গুলি যথেষ্ট ধোঁয়াটে, এবং সাধারণ ভাবে রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাজারহাটে শিয়াল চরবে, না কি বহুতল হবে— সেই দিগ্‌নির্দেশ আদতে করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, রাষ্ট্র যেখানে বন্ধু। আমাদের রাজ্যে সেই ভাবনায় প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তা হলে বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে অশোকনগর, কল্যাণী কিংবা বিধাননগর নিয়ে কোনও প্রতিবাদ হয়নি কেন? রাজারহাটের ক্ষেত্রেও সে রকম কোনও বড় বিক্ষোভের খবর নেই। অর্থাৎ নগরায়ণে খুব বাধা পড়েনি এই রাজ্যে— হয়তো বা পরিকল্পনাগুলি সরকারের উদ্যোগে এগিয়েছিল বলে। পরে স্বাভাবিক নিয়মেই সেই জমিতে এসেছে ব্যক্তিগত মালিকানা কিংবা বেসরকারি উদ্যোগ।

কিন্তু সরাসরি শিল্পায়নের খবর পশ্চিমবঙ্গে কখনওই সুবিধার নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পোদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ যথেষ্ট এগিয়ে ছিল। তার পর মাসুল সমীকরণ নীতি, বাম প্রতিবাদী ভাবনা এবং বাঙালির বাণিজ্যে স্থিতিজাড্যের কারণে অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হয়েছে। বামফ্রন্টের দীর্ঘ রাজত্বে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস একটা উদাহরণ বটে, কিন্তু সেটাও ব্যতিক্রম, এবং বন্দর এলাকায় হওয়ায় জমির চরিত্র বদল নিয়ে আন্দোলন সে ভাবে দানা বাঁধার প্রশ্ন ছিল না। অতিরিক্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শিল্পায়ন মুখ থুবড়ে পড়ল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে জমির চরিত্রবদল তখনই সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জনগণের গোচরে আসে, যখন কোনও বড় শিল্পের জন্যে জমি নেওয়া হচ্ছে। সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের সময় সেটা জানা গিয়েছিল, এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সেই বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনে পথে নেমেছিল। বুদ্ধদেববাবু কঠোর হলে হয়তো শিল্প সম্ভাবনা বাড়ত। কিন্তু একই সঙ্গে তদানীন্তন রাজ্য সরকারের পরিকল্পনার অভাব এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির কথাও অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। গাড়ি কারখানার জায়গাটি সিঙ্গুর না-হয়ে অন্য কোথাও যে হতে পারত না, বা পুরো জমিটার কিছু অংশ নিয়ে যে কারখানা একেবারেই বানানো যেত না, এমনটা নয়।

অন্য দিকে, ‘কৃষকের দুঃখ’-এ সিঙ্গুরের কারখানা আটকে দেওয়া যে তৃণমূলের মতাদর্শগত রাজনীতির অংশ নয় তা আজকের দিনে পরিষ্কার— তা হলে তাদের শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতারা রমরমিয়ে জমি-ব্যবসায় নেমে পড়তেন না। সিঙ্গুরে আবাদের অযোগ্য জমি হেলায় পড়ে আছে গোটা তৃণমূল রাজত্বের সময়রেখায়। সেই আন্দোলনে তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মী আজ হয় হতাশ, নয়তো দল বদলেছেন। সম্প্রতি সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর সভার আগে রাজ্যে একটা হইচই শুরু হয়েছিল যে, তিনি হয়তো মঞ্চ থেকে কোনও একটা সদর্থক বার্তা দেবেন। মঞ্চে উপবিষ্ট অন্য বিজেপি নেতারা অনেক কথা বললেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট কোনও প্রতিশ্রুতি শুনতে পাওয়া যায়নি।

সার্বিক হতাশার বিষয় এটাই যে, সামনের বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের শিল্পবার্তাই প্রত্যয়ে ভরপুর নয়। পিতৃপুরুষের জমির প্রতি মানুষের যে আত্মিক টান, তা কৌশলগত ভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিল বামফ্রন্ট-বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। অবশ্যই দীর্ঘ বাম রাজত্ব অবসানের আরও অনেক কারণ ছিল, কিন্তু এই বিষয়টি গোটা পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজত্বের পরবর্তী সময়েও শিল্প সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। এখান থেকে আপাতত বেরোনোর পথ শক্ত।

আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে খুব তাড়াতাড়ি পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের কারণে জমির প্রয়োজন নেই বললেই চলে। শাসক তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখাই একমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি— সেখানে ভাতাবাদ কাজে আসবে। সদ্যঘোষিত যুব-সাথী তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিরোধী বিজেপির রাজনীতিতে ধর্ম বা রাষ্ট্রবাদের মতো চলরাশিগুলি শিল্পভিত্তিক উন্নয়নের তুলনায় অনেক বেশি তীক্ষ্ণতা নিয়ে সামনের বিধানসভা নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করার সম্ভাবনাই বেশি। তাই কোনও ভাবেই শিল্প সম্ভাবনায় জমি রাজনীতি এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে না। তৃতীয় কোনও পক্ষ ক্ষমতায় আসবে, এমন সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। তাই সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম মাঝে মাঝে আলগা আলোচনায় উঠে এলেও জমি রাজনীতি ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন