কয়েক বছর আগেও মার্ক্সের সেই লাইনটা একটুআধটু পাল্টে নিয়ে বলা যেত, ‘আ স্পেকটার ইজ় হন্টিং ওয়েস্ট বেঙ্গল: দ্য স্পেকটার অব কমিউনালিজ়ম’। এখন এও আর যথেষ্ট নয়। সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া বা ‘স্পেকটার’ আর কেবল পশ্চিমবঙ্গকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে না, তার ছায়াভূত পুরোদস্তুর প্রবিষ্ট ও প্রোথিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ভোটের আগে চার দিকে গমগমে ধর্ম-ধর্ম রব— পার্ক স্ট্রিটের রেস্তরাঁয়, ময়দানের চিকেন প্যাটিসে, বঙ্কিমচন্দ্রের গানে, দিঘার সমুদ্রতটে, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায়। ভোটার তালিকায় তো কথাই নেই, সব পথ এসে মিলেছে শেষে এক আদি-অকৃত্রিম ধর্মের বয়ানে।
‘ধর্ম’ শব্দটা বলছি বটে, কিন্তু ঠিক বলছি কি? ধর্ম আর সাম্প্রদায়িকতা তো এক নয়! লক্ষণীয়, উপরের ঘটনাগুলিতে ধর্ম-টর্ম কিছু নেই, আছে ধর্মের নামে নিকৃষ্ট রাজনীতি। দেখেশুনে ‘ধর্ম’ বস্তুটার জন্যই কষ্ট হয়। ধর্ম বলতে তো কিছু বিশ্বদর্শন, মানবকল্যাণ ইত্যাদিরও চল ছিল একদা। সে সব কি মুছেই গেল?
ঘটনা হল, এই সাম্প্রদায়িকতাকে যত ধর্ম-ধর্ম বলে নেতারা ও জনতা নাচবেন, ততই এই অসুখের মোকাবিলা করা দুরূহ, প্রায় অসম্ভব, হয়ে পড়বে। তাই প্রথমেই স্পষ্ট করা ভাল, এই দেশে, এই রাজ্যে এখন যা চলছে, তা ধর্ম নয়, অধর্মের রাজনীতি। সাম্প্রদায়িকতা কোনও ধর্ম হতে পারে না।
এই অধর্ম-রাজনীতির অমানিশা নতুন নয়। গত এক দশকে ২০১৬, ২০১৯, ২০২১, ২০২৪: প্রতি বড় ভোটের আগে এ রাজ্যে তা টের পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এ বারটা যেন আলাদা। আটাত্তর বছরের পশ্চিমবঙ্গ তার তুঙ্গ সাম্প্রদায়িক মুহূর্তে পৌঁছেছে।
ভোটের সঙ্গেই সরাসরি সংযোগ, ভোট দিয়েই এর চালচিত্র বোঝা ভাল। প্রশ্ন হল, যে রাজ্যে আনুমানিক ৩০ শতাংশ মুসলমান বাসিন্দার বাস, গত কয়েকটি ভোটে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়েও সেখানে মনোমত সাফল্য পায়নি বিজেপি, তবে আবার একই ঝোঁক কেন। হয়তো তাদের অতিসরল হিসাবটা হল, দেশভাগ-ট্রমায় বিধ্বস্ত এই রাজ্যে এই প্রচারটাকেই ধরে রাখলে কালেদিনে তাদের ২০২১-এর ৩৮ শতাংশ ভোট আরও বেশ খানিক বাড়বে। তা ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের ৩০ শতাংশ মুসলমানের ‘বিপদ’কে দেখিয়ে বাকি দেশের কাছে ‘হিন্দু খতরে মেঁ’ রাজনীতিটাকেও জোরদার করা যাবে। এই জন্যই ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন শুরু হওয়ামাত্র শোনা গেল পশ্চিমবঙ্গে ‘এক কোটি মুসলমান নাম উড়ে যাবে’। অতি সম্প্রতি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বিজেপি বিধায়কের মুখে শোনা গেল, মুসলমান মাত্রেই সন্ত্রাসবাদী। এই তীব্র ঘৃণাবিদ্বেষের কারবারকে ‘ধর্ম’ বললে ধর্মে সইবে কি?
অন্য দিকে, অ-ধর্মের রাজনীতি নিয়ে এই ভোটের আগে রাজ্যে শাসক দলও মাতোয়ারা। তিন দফার সরকার চালিয়ে, একের পর এক দুর্দান্ত দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়ার ফলেই নিশ্চয়, মুখ্যমন্ত্রী এখন নতুন উদ্যমে এই কাজে নেমেছেন। ‘নতুন উদ্যম’ শব্দটি দু’টি কারণে লক্ষণীয়। প্রথমত, দেড় দশক আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নিজস্ব জনরঞ্জনী (পপুলিস্ট) রাজনীতির সুবাদে তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সময়ে-অসময়ে অঞ্জলি দিয়ে এসেছেন। মনে করা যেতে পারে, কট্টর মুসলিম নেতাদের উপর তাঁর স্নেহবর্ষণ। তবে এখন এই অঞ্জলি পুরোদস্তুর জগঝম্প ‘কার্নিভ্যাল’-এ রূপায়িত। পাড়ায় পাড়ায় হনুমান মন্দির, সন্ধ্যারতি। প্রতিযোগিতামূলক রামনবমী মিছিল। জনগণের অর্থে দিঘার জগন্নাথ মন্দির, উত্তরবঙ্গের মহাকাল মন্দির। নিউ টাউনের দুর্গা অঙ্গন। এবং দ্বিতীয়ত, গত দশকেও তাঁর সাম্প্রদায়িক অঞ্জলি ছিল প্রধানত একদিকদর্শী, হয়তো তখন সেটাই দরকার ছিল বেশি— যে কারণে তাঁকে ঘিরে থাকে সংখ্যালঘু তোষণ অভিযোগের বলয়। এই কারণে, এ রাজ্যে স্পর্ধিত হেলমেটহীন বাইকচালক সংখ্যালঘু হলে শাস্তি মাফ, মুসলমান এলাকায় শব্দনিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক অনীহা। তবে, বছর-পনেরো পর, এখন তিনি সর্বদিকদর্শী, তোষণের আমি তোষণের তুমি, তাই দিয়ে যাতে চেনা না যায়, সেই ব্যবস্থায় ব্যস্ত। সবার ভান্ডার ভরে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, সংখ্যালঘুর সঙ্গে সংখ্যাগুরুরও। কে জানে, তার জেরেই হয়তো অলিপাবের উস্কানিদাতা হিন্দু ‘কাস্টমার’টির বদলে আতঙ্কিত মুসলমান ‘ওয়েটার’টিই গ্রেফতার হন, ওয়াকফ বিল-এ ‘পাশে থাকব’ বলেও শেষ মুহূর্তে ডিগবাজি খাওয়া যায়। কোন খেলা যে খেলব কখন, সেটা ঠিক করাই তো রাজনীতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে ভাল সে কথা কে জানেন।
তবে, হিন্দুতোষণে যখন প্রতিপক্ষ এত বেশি এগিয়ে, শেষ অবধি ‘নরম হিন্দুত্ব’-এ লাভ কতটা? এটা ঠিক, কেবল তৃণমূল কংগ্রেস নয়, আগে অন্যান্য ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলও ভোটবাজারে প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্বের পিচ্ছিল ঢালে হেঁটেছে। মমতা জাঁদরেল রাজনীতিক, তিনি নিশ্চয় ভাবছেন, এক দিকে জনমুখী প্রকল্পবন্যা বইয়ে, অন্য দিকে এসআইআর-আবহে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে হয়তো সংখ্যাগুরু সমাজেও তৃণমূলের কিছু নতুন রাস্তা খুলছে, তার উপর দু’-পোঁচ মন্দির-রাজনীতি চাপানো— ভালই তো!
এ রাজ্যে বিরোধী বলতে তো কেবল বিজেপি নয়। আছেন তো আরও ক’জনা। তাঁরা পশ্চিমবঙ্গকে এই অধর্ম-রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন কি? কী করছেন? দেখা যাচ্ছে, ধর্ম ভিন্ন অন্য যা যা বিষয় এখন প্রাসঙ্গিক, শিক্ষা স্বাস্থ্য চাকরি, সব নিয়েই এই ‘অন্য’ বিরোধীরা— বিশেষত সিপিআইএম— রীতিমতো নখদন্তহীন। এমনকি এসআইআর নিয়েও তাঁরা সর্বশক্তিতে মাঠে নামতে পারেন না, কে জানে তাতে যদি তৃণমূল এক ইঞ্চি মাইলেজ পেয়ে যায়। তৃণমূলকে তাঁরা মুসলমান তোষণকারী বলে গাল দেন। কিন্তু সংখ্যালঘুর উপর হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ ঘটলে তাঁদের সক্রিয়তা আটকে থাকে বিবৃতিতেই, এমনকি অন্য রাজ্যে বাঙালি মুসলমান শ্রমিকের উপর অন্যায় নির্যাতন ঘটলেও তাঁদের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই তৃণমূল সরকারই— কেন বাংলার শ্রমিককে আদৌ বাইরে যেতে হল। তৃণমূল কী ভাবে বিজেপি-কে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে, সেটা তাঁরা দেখান, সঙ্গত ভাবেই। কিন্তু বিজেপি-আরএসএস নিয়ে তাঁদের সমাজমাধ্যমের সমালোচনা-বিলাস আর রাস্তা-রাজনীতির নিষ্ক্রিয়তা কী ভাবে গত এক দশকে এই রাজ্যে বিরোধী পরিসরটাকে বিজেপির হাতে ‘ছেড়ে দিয়েছে’— তা বুঝতে তাঁরা অপারগ হন, আর নয়তো ‘উটপাখি সিনড্রোম’-এ ভোগেন। অথচ সংবাদ বলে, তাঁরাও সময়মতো নিজেদের পছন্দের মার্ক্সবাদের সঙ্গে নরম সাম্প্রদায়িকতার প্রায়োগিক মিশেল বানিয়েছেন, কখনও ফুরফুরা শরিফের হাত ধরতে ছুটেছেন, কখনও হুমায়ুন কবীরের মন বুঝেছেন। প্রয়োজনমতো ধর্মে থেকেছেন, অধর্মে থেকেছেন, জিরাফেও। কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলির রাজনীতির এই ঔদাসীন্য অন্যত্রও সাম্প্রদায়িক শনির উত্থানকে অদম্য করেছে— এমনকি কেরলেও।
চার দিক থেকে অধর্ম-রাজনীতি এমন পাকিয়ে উঠলে যা ঘটার, তাই ঘটছে। হিন্দু সমাজ আর হিন্দুত্বের সমাজ এক নয় বলেই আরএসএস-কে প্রচ্ছন্নে কাজ করে যেতে হয়, বিজেপি হুঙ্কার বর্ষণ করে সাধারণ হিন্দুর কান ভাঙাতে। এ যেন এক অন্য ‘কনভার্শন’ বা ধর্মান্তরণ— হিন্দুধর্ম থেকে হিন্দুত্ববাদের অধর্মে টেনে আনার প্রকল্প। কতটা ‘সাফল্য’ এল তাতে, ২০২৬-এর ভোট তার পরীক্ষা।
একই প্রক্রিয়া মুসলমান সংস্কৃতি আর কট্টর ইসলামি সমাজের টানাটানিতেও। বঙ্গীয় মুসলমানদের কট্টর করে তোলার কাজ সহজ নয়। ১২০ বছর আগে (১৯০৬) ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুসলমান রাজনীতির ভিন্ন ধারা তৈরির লক্ষ্যে, তার পর অনেক দশক ধরে চলেছে বাংলায় মুসলমান ও কট্টর মুসলমানের অবিরত টানাপড়েন। দেশভাগের পর এ পারে সেই সংঘর্ষ স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। গত কয়েক বছরে আবার তা কিয়দংশে জেগে উঠেছে— এক দিকে হিন্দুত্ব রাজনীতির নিরন্তর অভিঘাতে, অন্য দিকে সীমানাপারের মদতে। মুর্শিদাবাদ স্মরণীয়: গত বছর সেখানে ঘটে গিয়েছে ভয়ঙ্কর হিংসাকাণ্ড, ঘটেছে হুমায়ুন কবীরের উগ্র ‘বাবরি মসজিদ’ কার্যক্রম। এই কট্টর ইসলামের ডাকে বাঙালি মুসলমান এ বার সাড়া দেবে কি? ২০২৬ বলবে।
এখনও আশা, সাম্প্রদায়িকতার ধনুর্বাণে আপাদমস্তক সজ্জিত এই বাংলায়, অধর্ম-রাজনীতির নিশির ডাকে মানুষ তেমন সাড়া দেবেন না। লক্ষণীয়, মুর্শিদাবাদের আগুন, এসআইআর-এর নামে বিষ উদ্গিরণ, এ সব নানা প্ররোচনা সত্ত্বেও এই বাংলার হিন্দু বা মুসলমান যথাসম্ভব ধর্মেই থেকেছেন, অধর্মে নয়। রাজনীতি যত চেষ্টাই করুক, এখানে মানুষ মোটের উপর সংযত, খানিক যেন উদাসীন।
হয়তো এটাই স্বাভাবিক। দেশভাগ-ট্রমায় এ রাজ্য বিধ্বস্ত বলেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাজার এখানে ভাল হবে— বিজেপির এই ভাবনাতেই হয়তো গোড়ায় গলদ। হয়তো এই কারণেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাজার এখানে খারাপ! গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গ তো শুধু ক্রোধ-ক্ষোভ-হিংসাই দেখেনি, ক্ষমা-দয়া-সহমর্মিতা, স্বাভাবিক সহবাসও দেখেছে। কোন প্রবণতা জয়ী হবে, কোনটা পরাজিত, দেখাই যাক।
ফিরে যাই এই লেখার গোড়ায় তোলা প্রশ্নে। বার বার সাম্প্রদায়িতাকে ‘ধর্ম’ বলে ভুল করে আমরা কি তবে একটা চলমান বহমান সুস্থ ধর্মসমাজের পথেই বাধা তৈরি করছি? উত্তর দেবে ২০২৬ সালের ভোট। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে, অধর্ম-রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িকতার ছায়াভূতকে একটুও জায়গা না ছেড়ে, এই নির্বাচন-পর্ব পেরোতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য নতুন করে গৌরব বোধ করতে পারব আমরা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে