এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারদের ভুললে চলবে না
Special Intensive Revision

ওঁদের অন্তর্ভুক্তি জরুরি

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এক সঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করে ২০২৫-এর ৪ নভেম্বর। প্রথমে এই প্রক্রিয়া ২০২৬-এর জানুয়ারি মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রসেনজিৎ বসু

শেষ আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ ০৪:৩২
Share:

অধিকারহীন: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে বাদ পড়া ভোটারদের শুনানির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নদিয়া, ৭ ফেব্রুয়ারি। ছবি: পিটিআই।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাসের কিছু বেশি সময় কেটেছে। এর মধ্যে থ্রিলার সিরিজ়ের মতো সব রোমহর্ষক ঘটনা— নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণের আগেই তাঁর আপ্তসহায়কের হত্যাকাণ্ড, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের নতুন মুখ্যসচিব হিসেবে নিয়োগ, বুলডোজ়ার দিয়ে হকার উচ্ছেদ, ভূতপূর্ব শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের গ্রেফতারি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় ও সংসদীয় দলে ভাঙন।

উত্তপ্ত এই রাজনৈতিক পরিবেশে হারিয়ে যেতে বসেছে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা তা হল, নির্বাচনের আগে ছয় মাস ধরে চলা এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে এই রাজ্যের কয়েক লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাতিল।

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এক সঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করে ২০২৫-এর ৪ নভেম্বর। প্রথমে এই প্রক্রিয়া ২০২৬-এর জানুয়ারি মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার পর নির্বাচন কমিশন আরও প্রায় ১.৫ কোটি ভোটারকে যুক্তিগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’র নামে শুনানির নোটিস পাঠায়। অন্য কোনও রাজ্যে এত বড় সংখ্যায় ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হয়নি।

এর ফলে প্রথমে দীর্ঘ শুনানি প্রক্রিয়া, সুপ্রিম কোর্টে মামলা, বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপ এবং অবশেষে আপিল ট্রাইবুনাল গঠনের এক বিস্তৃত প্রক্রিয়া চার মাস ধরে চালিয়েও পশ্চিমবঙ্গে এ কাজ বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ করা যায়নি। যে ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বিচারাধীন ছিল, নির্বাচনের ঠিক আগে তার মধ্যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে। ট্রাইবুনালে মাত্র ১৬০৭ জন ভোটারের নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সংবাদে প্রকাশ, মে মাসে এসআইআর ট্রাইবুনালে প্রায় ২৫ লক্ষ ভোটার পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। ১৪ মে পর্যন্ত ৬৫৮১ আপিলের নিষ্পত্তি হয়, যার মধ্যে ৪০৪৩ আপিল মঞ্জুর হওয়ায় ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম যুক্তিগত অসঙ্গতির কারণে বিচারাধীন অবস্থায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। পরে ট্রাইবুনাল তাঁদের নাম পুনর্বহাল করলেও, বিধানসভা নির্বাচনের সময় তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই বৈধ ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।

এ বারের ভোটে এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রভাব নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠতে পারে না। গণহারে ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার জনতাত্ত্বিক চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে নির্বাচনের ফলাফলে। এসআইআর-এর প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ গণনাপর্বে যে ৫৮ লক্ষ ভোটার বাদ যান তার মধ্যে ৩২ লক্ষ ছিল স্থায়ী ভাবে স্থানান্তরিত বা অনুপস্থিত ভোটার, যাঁদের গণনা-ফর্ম সংগ্রহ বা আপলোড করা হয়নি। বাকিরা মৃত অথবা ডুপ্লিকেট এন্ট্রি।

খসড়া তালিকা থেকে অপসারিত এই অনুপস্থিত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, এর মধ্যে মুসলিম ছিল ৭.৩৪ লক্ষ। পরের ধাপে ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’র কারণে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে মুসলিম ছিল ১৭.৬৫ লক্ষ। দাবি আপত্তির পর্বে বাদ পড়া ৫.৪৬ লক্ষের মধ্যে মুসলিম ছিল ১৩ হাজারের মতো।

ফলে মৃত এবং নকল ভোটারের সংখ্যা বাদ দিয়ে, সারা রাজ্যে এসআইআর-জনিত বাদ পড়া মোট ৬৪.৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২৫ লক্ষেরও বেশি ছিল মুসলিম— অর্থাৎ মোট বাদ পড়া ভোটারের ৩৯ শতাংশ। অথচ ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের অনেক বেশি হারে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে তাদের বাদ দেওয়াটাই এই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

দেখা যাচ্ছে, তালিকায় সংশোধন ও পরিবর্তনের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল সেই সব জেলায় যেখানে মুসলিম ভোটারদের সংখ্যা এবং ঘনত্ব বেশি— উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, মালদহ, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, উত্তর দিনাজপুর এবং বীরভূম। রাজ্যের মোট মুসলিম ভোটারের প্রায় ৮৪ শতাংশ এই ১২টি জেলার অন্তর্গত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে ভোটার তালিকাভুক্ত। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিয়োজন ও সংযোজনের ৮০ শতাংশ ঘটেছে এই ১২টি জেলার অন্তর্গত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতেই।

কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্যে বাংলাদেশ থেকে বেআইনি ‘অনুপ্রবেশকারী’দের চিহ্নিত করাটাই এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূমের মতো সীমান্তবর্তী নয় এমন জেলাতেও লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ল কেন? স্পষ্টতই অনুপ্রবেশের জিগির তুলে কেবল সীমান্তবর্তী নয়, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলার সামগ্রিক মুসলমান জনগোষ্ঠীকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে।

এ বার বিজেপি যে ২০৭ আসনে জয়ী হয়েছে, তার মধ্যে ৮২ আসনে জয়ের ব্যবধানের থেকে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিয়োজন ও সংযোজনের সম্মিলিত সংখ্যা বেশি। এই ৮২ আসনের মধ্যে ৭০ আসন ১২টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলার অন্তর্গত।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, ২০২১-এর নির্বাচনে বিজেপি এই ৮২ আসনের মধ্যে মাত্র ৯টি জিততে পেরেছিল। এসআইআর-এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলার বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটের ভাগ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসআইআর-এর মাধ্যমে এই জনতাত্ত্বিক পুনর্বিন্যাস না ঘটলে বিধানসভায় বিজেপির জয় সম্ভব হত কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।

এই বিশ্লেষণ এটা বলে না যে বিজেপি শুধু এসআইআর হওয়ার কারণেই জয়ী। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গে ভোটারসংখ্যা ৭.৩৪ কোটি থেকে ২০২৬-এর নির্বাচনের সময় কমে দাঁড়ায় ৬.৮৩ কোটি, অথচ মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ৬.০৩ কোটি থেকে বেড়ে পৌঁছয় ৬.৩৯ কোটিতে। ২০২১-এর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২.৮৯ কোটি ভোট। ২০২৬ সালে তাদের ভোট কমে দাঁড়ায় ২.৬০ কোটি। অর্থাৎ মোট ভোট কমে যায় ২৯.৫ লক্ষ। অন্য দিকে, বিজেপির ভোট ২০২১ সালের ২.২৯ কোটি থেকে ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২.৯২ কোটি— অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোট। ২০২৬-এর নির্বাচনে সিপিআইএম-এর প্রাপ্ত ২৮.৩ লক্ষ ভোট এবং জাতীয় কংগ্রেসের প্রাপ্ত ১৮.৯ লক্ষ ভোট ২০২১-এর নির্বাচনের তুলনায় একই জায়গায়।

তৃণমূল কংগ্রেসের মোট প্রাপ্ত ভোট ২৯.৫ লক্ষ কমে যাওয়ার অনেকটাই এসআইআর-এর প্রত্যক্ষ ফল বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু এসআইআর-এর মাধ্যমে নামের অপসারণ বা নতুন সংযোজন— কোনওটিই ব্যাখ্যা করতে পারে না, কেন ২০২৬-এর ভোটার তালিকায় ২০২১-এর তুলনায় ৫২ লক্ষ ভোটার কমা সত্ত্বেও বৈধ ভোটের সংখ্যা আগের থেকে ৩৬ লক্ষ বেড়ে গেল। কী ভাবে বিজেপির ভোট ২০২১-এর তুলনায় ৬৩ লক্ষ বৃদ্ধি পেল।

এর থেকে স্পষ্ট যে, শুধু এসআইআর নয়, বিগত সরকারের অপশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কারণে নতুন ভোটারদের একটা বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। ২০২১ এবং ২০২৪-এর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের একটা অংশও ২০২৬-এ বিজেপির দিকে সরে গেছে। সুতরাং কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতিকে তৃণমূল কংগ্রেসের হারের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করাটা বিভ্রান্তিকর।

তবে এই সব তথ্য পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও বৈধতা নিয়ে অনেকগুলি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, যেখানে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা গ্রহণ জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে এখনও পর্যন্ত অকার্যকর আপিল ট্রাইবুনাল ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যাতে অস্বচ্ছ, বৈষম্যমূলক এবং স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়ায় ভুলবশত বা অন্যায্য ভাবে বাদ পড়া সকল ভোটার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়বিচার পান। কেবল যুক্তিগত অসঙ্গতির জন্য বাদ পড়া ভোটারদের জন্য আপিল ট্রাইবুনালে আবেদন করার সুযোগ সীমিত না রেখে এসআইআর প্রক্রিয়ার গণনা পর্যায়ে বা দাবি আপত্তির পর্যায়ে বাদ পড়া ভোটারদেরও আবেদন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। এবং আর কোনও রকম ভোট হওয়ার আগে আবেদনের নিষ্পত্তি দরকার।

রাজ্যের নতুন সরকার এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারদের নাম লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তবেই অন্নপূর্ণা যোজনার তালিকা চূড়ান্ত করতে চায়। সম্প্রতি রেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য হয়েছে। অথচ অন্যায় ভাবে বাদ পড়া কয়েক লক্ষ বৈধ ভোটারকে যথাশীঘ্র ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। নতুবা রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটাধিকারহারা হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবেন, যা সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী।

পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের এসআইআর কমিটির চেয়ারপার্সন

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন