পদক্ষেপ: ভোটারদের মতদানে রাজনৈতিক অভিমুখ নির্বাচন করলেন বাংলাদেশের নাগরিকরা, ১২ ফেব্রুয়ারি। রয়টার্স।
আধঘণ্টা আগেই এখানে ভোট দিয়ে গিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির, শফিকুর রহমান। ছিলা টানটান উত্তেজনার মধ্যে ভোটদাতাদের দীর্ঘ লাইন এগোচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বোরখা আবৃত মহিলা এবং পুরুষের স্বতন্ত্র দু’টি লাইন। এটি মিরপুর ১৩, সরকারি ইউনানি আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ-এর ভোটকেন্দ্র, যেখানে পৌঁছেছি গুলশনের অভিজাত ও ধনীতন্ত্রের ভোট উৎসব দেখে। তবে গুলশন বা বারিধারার মতো মধুর হল না অভিজ্ঞতা। লাইনে দাঁড়ানো প্রায় কেউই কথা বলতে চাইলেন না। পুরুষদের লাইন থেকে পরিচয় জানার পর এক জন অত্যন্ত রুক্ষ ভাবে বললেন, “আপনাদের সংবাদপত্র আমরা বয়কট করেছি, আপনাদের দেশের সঙ্গে কোনও কথা নাই।”
অবশ্যই কোনও তর্কের মধ্যে যাওয়া বা উত্তেজনা বাড়ানো ওই পরিস্থিতিতে অবিবেচকের কাজ। সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মীও উঁচু গলায় কথা শুনে সতর্ক। পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসছি যখন, ওই ভোটকেন্দ্র থেকে তখনও বাংলাদেশে ভোটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। স্বাধীনতার পর থেকে তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনে নিজেদের পালে এত হাওয়া জামায়াতে ইসলামী কখনও পায়নি। এত দীর্ঘমেয়াদি উগ্র ভারতবিরোধিতার বয়ান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তাও হিসাবযোগ্য। মোট কথা, জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তখনও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না এবং তার পর দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ভারতের নিয়তি কোন পথে চলবে, তাও অনির্ণেয়।
এর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চিত্র স্পষ্ট হল। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোট হল না ঠিকই, কিন্তু নয়াদিল্লি মনে করছে, যা হয়েছে তা মন্দের ভাল। দশকের পর দশক ধরে সমস্ত ডিম একটি ঝোলায় রাখার পক্ষে ভারতের অনেক যুক্তি থাকতেই পারে। এবং আওয়ামী লীগের প্রতি অগাধ ভরসা করার প্রশ্নে ভারতের যুক্তিগুলি আদৌ ফেলে দেওয়ার নয়। কিন্তু গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার ঝুলি, বাংলাদেশ নীতি সম্পর্কে নির্মোহ এবং আবেগহীন হতে শিখিয়েছে সাউথ ব্লককে। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী ‘সোনালি অধ্যায়’ বলে কিছু হয় না, পরিবর্তিত ভূকৌশলগত বিশ্বে নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার চরিতার্থতায় উপর নীচে সম্পর্কের নাগরদোলার ওঠাপড়া চলতেই থাকে, অন্য যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের মতোই। অনেক মূল্য চুকিয়ে আজ তা অনুধাবন করেছে নয়াদিল্লি। আর তাই কোনও তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি ইঞ্চি মেপে সতর্কতার সঙ্গে জানলা-দরজাগুলি খোলার কথা ভাবা হচ্ছে, গত দেড় বছরে যা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
ঠিকই, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে বলে রাতারাতি বাংলাদেশের ভারত-বিরোধী বয়ান বন্ধ হয়ে যাবে, অথবা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে দিন-রাতের ফারাক হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আস্থার ব্যবধান বেড়েছে। এ কথা স্পষ্ট করে বলাই ভাল, খুব স্বস্তিজনক অবস্থায় কিন্তু সাউথ ব্লক এখন নেই আঞ্চলিক রাজনীতিতে। চিন-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্প্রতি তৈরি হওয়া অক্ষ, আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের সুসমীকরণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব— এই সব কিছুই অঞ্চলের উপর ছায়া ফেলেছে। বাংলাদেশের গত দেড় বছরের পরিস্থিতিতে জল আরও ঘোলা হয়েছে। বিএনপি-র নতুন সরকারের কাছে চিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ শরিক। বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে চিনের সঙ্গে ভারতের অদৃশ্য লড়াই বিএনপি আমলে শুধু বহাল থাকবেই না, তা বাড়বে। শেখ হাসিনার মতো তারেক রহমানের ভারতের প্রতি কোনও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নেই। বরং তার উল্টোটাই রয়েছে।
পাশাপাশি চিনের থেকেও বড় আশঙ্কার বিষয় রয়েছে। তা হল, পশ্চিম এশিয়া-সহ এই মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং আফ্রিকায় যে ভাবে দক্ষিণপন্থী ইসলামি মৌলবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে, তার প্রবল ধাক্কা বাংলাদেশের নতুন জমানায় এসে লাগলে তা নয়াদিল্লির জন্য খুশির খবর হবে না। আপাতত এই চরমপন্থার ছোঁয়াচ থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কী ভাবে দূরে রাখা যায়, তা মোদী সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি বিষয় মনে রাখতে হচ্ছে, বিএনপি-কে ভোট-জয়ের পর ভারত স্বাগত জানালেও খুব সহজেই তার ইতিহাস মুছে ফেলতে পারবে না। ভারত রানে ভরপুর পাটা উইকেটে ব্যাট করতে নামছে না ঢাকার বাইশ গজে। জামায়াতে জোটের পাওয়া ৭৭টি রেকর্ড সংখ্যক আসন, অদূর ভবিষ্যতে অহরহ চাপে ফেলতে পারে ভারতের নিরাপত্তাকে। একটু পিছনে গেলে দেখা যায় ত্রয়োদশ শতকে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক ভাবে প্রবর্তনের সময় থেকে বাংলার পূর্ব অংশ বরাবরই তার গড় হয়ে থেকেছে। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান আরও সরেছে ইসলামের দিকে। পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ উভয়েই কাজী নজরুল ইসলামকে নিজের বলে আত্মস্থ করতে চাইলেও, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবধান বেড়েছে উভয়ের মধ্যে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর, ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু ওঠাপড়ায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। একমাত্র শেখ হাসিনার জমানাতেই মৌলবাদী ইসলামপন্থীদের দূরে রাখা হয়েছিল, তিনি তখতচ্যুত হওয়ার পর, পরিস্থিতি যে কে সেই। মৌলবাদের যে উত্থান আমরা গত দেড় বছরে দেখেছি বিএনপি-র অতীত রেকর্ড ঘেঁটে, এমন আশ্বাস সাউথ ব্লক পাচ্ছে না যে তা নিমেষে অন্তর্হিত হয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে তাই সাবধানে যে পদক্ষেপগুলি করা অতি আবশ্যক তা হল, অতিরিক্ত আবেগে না ভেসে নিজেদের দরজা সাবধানে খুলে রাখা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে বাণিজ্যকে ফের স্বাভাবিক করা যার প্রথম ধাপ হতে পারে। নির্বাচনের পর সীমান্তের বাজার এখনও পুরোপুরি খোলেনি, কিন্তু বাণিজ্য আগের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে দ্রুত। ভারতকে সীমান্তের প্রশ্নে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে এখন থেকে। সীমান্তে ভারত যখনই বাণিজ্যে গতি শ্লথ করবে আখেরে লাভবান হবে জামায়াতে বা উগ্র মৌলবাদীরা, তারা ভারত-বিরোধী আন্দোলনের অজুহাত পেয়ে যাবে।
পাশাপাশি ভারতীয় ভিসা নিয়ে যে কড়াকড়ি ২০২৪ সালের অগস্ট মাস থেকে চাপানো হয়েছে, তা যত দ্রুত সম্ভব তুলে নিলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভ এক লপ্তে অনেকটাই বার করে নেওয়া যাবে। চিকিৎসার কারণে কলকাতায় আসার জন্য সে দেশের বহু মানুষ সকাল বিকাল অপেক্ষা করে রয়েছেন। এই একটি ব্যাপারে নয়াদিল্লি উদারতা দেখালে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মন জয় করা সম্ভব।
আরও একটি বিষয় হল বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয় ভারতের আদানি পাওয়ারের। চুক্তি অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পরবর্তী ২৫ বছর ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঢাকাকে সরবরাহ করার কথা ছিল আদানির সংস্থার। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পরে পরিস্থিতি বদলায়। আদানি গোষ্ঠীর দাবি, চুক্তি মেনে এ পর্যন্ত বকেয়া টাকাও মেটায়নি বাংলাদেশ। এই জট ছাড়ানো আশু প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজনে সরকার এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ। চলতি পরিস্থিতিতে মুজিব-কন্যাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারে না ভারত যেখানে তাঁর প্রাণের সংশয় রয়েছে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে তিনি অন্য কোনও রাষ্ট্রে (ব্রিটেনের মতো) আশ্রয় নিতে পারেন কি না, সে জন্য সক্রিয় কূটনৈতিক দৌত্যের কথা ভাবতেই পারে সেবা তীর্থ (সাউথ ব্লক)। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সংঘাতবিন্দু সে ক্ষেত্রে অনেকটাই লঘু করে দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে