সম্প্রতি মায়ানমার থেকে খবর, আউং সান সু চি-কে কারাগার থেকে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তর করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক দাবি উঠেছে, তিনি আদৌ জীবিত কি না ও তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন তার প্রমাণ দেখানো হোক। এমন দাবি উত্থাপন করতে হচ্ছে— এটাই আজকের মায়ানমারের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কিছু বছর আগেও সু চি ছিলেন গণতান্ত্রিক মায়ানমারের মুখ। আজ তিনি কার্যত অদৃশ্য, ২০২১-এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সেনা কারাগারে বন্দি। ইউক্রেন, গাজ়া, তাইওয়ান, ইরানের মতো সঙ্কটের ভিড়ে মায়ানমার এক বিস্মৃত যুদ্ধক্ষেত্র, সু চি এক বিস্মৃত বন্দি।
কিন্তু মায়ানমারের পতনের ইতিহাস বুঝতে হলে সু চি-র উত্থান, পতন ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি বোঝা জরুরি। দশকের পর দশক তিনি ছিলেন সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের প্রতীক। ১৯৮৮-র গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন ছিল জেনারেল নে উইনের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ। ছাত্র, শ্রমিক, সন্ন্যাসী, সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামেন, সেনার গুলিতে অগণিত মানুষ নিহত হন। এই পরিস্থিতি থেকেই উঠে আসেন সু চি এবং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। সু চি দ্রুত আন্দোলনের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। সামরিক জুন্টা তাঁকে গৃহবন্দি করে ভেবেছিল তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হল উল্টোটা, তিনি বিশ্বব্যাপী শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হন।
প্রায় পনেরো বছর বন্দি: স্বাভাবিক জীবনের অধিকার থেকেও বঞ্চিত। বন্দি অবস্থাতেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। পশ্চিমি বিশ্ব, রাষ্ট্রপুঞ্জ ও আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ তাঁকে গণতন্ত্রের এক সাধ্বীসদৃশ প্রতীকে পরিণত করে। শেষে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে সামরিক সরকার কিছুটা উদারীকরণে বাধ্য হয়। ২০১০-এ সু চি মুক্তি পান, মনে হতে থাকে যে মায়ানমার গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে। কিন্তু এই রূপান্তর শুরু থেকেই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সামরিক বাহিনীর তৈরি ২০০৮-এর সংবিধান নিশ্চিত করেছিল— প্রকৃত ক্ষমতা টাটমাডো-র হাতেই থাকবে। সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সেনার জন্য সংরক্ষিত ছিল; প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত মন্ত্রক সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে, এমনকি দুই ভাইস প্রেসিডেন্টের এক জনকে মনোনীত করত সেনাবাহিনী। সংবিধান সংশোধনের জন্য ৭৫ শতাংশের বেশি ভোট প্রয়োজন ছিল— অর্থাৎ সেনার কার্যত ভেটো ক্ষমতা ছিল।
সু চি নিজে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি, ২০১৫-য় এনএলডি-র ঐতিহাসিক জয়ের পর তিনি ‘স্টেট কাউন্সেলর’ নামে নতুন এক পদ সৃষ্টি করে দেশ চালান। এই ব্যবস্থা ছিল এক অদ্ভুত মিশ্রণ: না পূর্ণ গণতন্ত্র, না সরাসরি সামরিক শাসন। তবু নাগরিক সমাজ কিছুটা মুক্তি পায়, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিকাশ ঘটে, নতুন প্রজন্ম কিছুটা খোলা পরিবেশের স্বাদ পায়। এর পর আসে রোহিঙ্গা বিপর্যয়। ২০১৬-১৭’য় রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গণহত্যার অভিযোগ ওঠে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে যান। আন্তর্জাতিক মহল একে জাতিগত নিধন, গণহত্যা আখ্যা দেয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল সু চি-র নীরবতা। শুধু তা-ই নয়, ২০১৯-এ তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমারের পক্ষে সাফাই গাইলেন।
সু চি-র নীরবতা বুঝতে মায়ানমারের জটিল অত্যাচারের ইতিহাস বোঝা জরুরি। ব্রিটিশ আমলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বর্মায় যান, বিশেষত বাংলা ও মাদ্রাজ অঞ্চল থেকে। প্রশাসন, ব্যবসা, শ্রমক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি বাড়ে। অনেক বর্মাবাসীর মনে হয়েছিল, স্বদেশে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। রোহিঙ্গা প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে যায়। যদিও আরাকানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বহু শতাব্দী পুরনো, তবু পরবর্তী পূর্ববঙ্গীয় অভিবাসনের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় গুলিয়ে যায়। বর্মার বহু জাতীয়তাবাদীর চোখে সব বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানই ‘ঔপনিবেশিক অভিবাসী’ হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এই বিভাজন আরও গভীর করে। স্বাধীনতার সময় এই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি।
আধুনিক মায়ানমার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বিভক্ত রাজনৈতিক ভূগোল, জাতিগত সংঘাত, অমীমাংসিত জাতীয়তাবাদী সঙ্কট। টাটমাডো নিজেদের শুধু সেনাবাহিনী নয়, জাতীয় ঐক্যের রক্ষক বলেও দেখতে শুরু করে। এতে সু চি-র নৈতিক ব্যর্থতা মাফ হয় না, কিন্তু বোঝা যায়, কেন তিনি রোহিঙ্গা প্রশ্নে সরাসরি সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাননি। তিনি জানতেন, এতে বৌদ্ধ বর্মার সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন তিনি হারাতে পারেন, ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও ভেঙে পড়তে পারে। রাখাইনের ঘটনায় সু চি-কে কার্যত সামরিক অবস্থানের পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য করে টাটমাডো তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিই ধ্বংস করে দেয়— আন্তর্জাতিক নৈতিক মর্যাদা। সেই ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে গেলে তিনি রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।
২০২১-এর অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, যদিও নির্বাচনে এনএলডি বিপুল জয় পায়। তার পর থেকে মায়ানমার কার্যত পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত। শহর বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে, প্রতিরোধ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে, বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নতুন পিপল’স ডিফেন্স ফোর্স সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে। আজ সু চি আবারও বন্দি, তাঁর নামও বড় একটা উচ্চারিত নয়। তিনি মায়ানমারের ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক চরিত্র: ঔপনিবেশিক বিভাজন, গৃহযুদ্ধ, সামরিক জাতীয়তাবাদ ও তাঁর পিতার অসমাপ্ত জাতি-গঠনের উত্তরাধিকারের ভারে পীড়িত এক মানুষ।
কলেজ অব লিবারাল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস, অবার্ন ইউনিভার্সিটি অ্যাট মন্টগোমারি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে