FIFA World Cup 2026

বল গড়ায়নি, জল গড়াচ্ছে

অবশ্য ডান দিকে নুয়ে থাকা পৃথিবী— অন্তত আমেরিকা তো বটেই— বলবে: এসেছ ফুটবল খেলতে, খেলো। ধর্ম যার যার, ফুটবল সবার।

শিশির রায়

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ০৭:৫৮
Share:

ইরানের বিশ্বকাপ ফুটবল দল মেক্সিকোতে নামতে দেখা গেল, খেলোয়াড়দের ব্লেজ়ারে সাঁটা ছোট্ট পিন, তাতে লেখা #১৬৮। ইরানের ইস্কুলে আমেরিকার হামলায় ১৬৮ জন শিশু-পড়ুয়া অতর্কিতে মরে গেল এই সে দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, তাদের স্মরণে। মার্চে দুই প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আগেও তাঁরা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন শোকস্মারক: স্কুলব্যাগ; মৃত শিশু ও সাধারণ মানুষের ছবি। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চ আলাদা ঠাঁই। ফিফা-র নিয়মেও বিস্তর কড়াকড়ি, মাঠে এমন কোনও বার্তা বা বস্তু তুলে ধরা যাবে না যা সরাসরি বা ঘুরপথেও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চরিত্রের। সামনেই আসছে আশুরা বা মহরম, আজ থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ৪৮টা দেশের অন্তত ১৪টা মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তাদের খেলোয়াড়রা সে দিন খেলার মাঠেও নামবেন এক আবহমান ধর্মীয় শোক-ঐতিহ্য সঙ্গী করে— কোনও চিহ্ন থাকবে না কি তার? ইরান ফিফা-র কাছে অনুরোধ করেছে ২৭ জুন মিশরের বিরুদ্ধে গ্রুপ ম্যাচে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামার, গ্রাহ্য হবে কি তা? এমনকি মিশরও যদি চায় একই জিনিস?

অবশ্য ডান দিকে নুয়ে থাকা পৃথিবী— অন্তত আমেরিকা তো বটেই— বলবে: এসেছ ফুটবল খেলতে, খেলো। ধর্ম যার যার, ফুটবল সবার। তাই? ধর্ম, নাগরিকতা, গায়ের রং— এর আগে আর কোনও ফুটবল বিশ্বকাপে এত গুরুত্ব পায়নি, আমেরিকার আয়োজনে ২০২৬ বিশ্বকাপে যেমন দেখা যাচ্ছে। ও হ্যাঁ, কানাডা আর মেক্সিকোও এ বারের সহ-আয়োজক বটে, কিন্তু আমেরিকার গা-জোয়ারির পাশে নিতান্ত ‘কাব্যে উপেক্ষিত’ তারা, ১০৪ খানা ম্যাচের ৭৮টাই হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে। দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে; তাদের এক জন বিশ্বকাপের আয়োজক আর অন্য জন অংশগ্রহণকারী, এমন ঘটনা ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম। ও দিকে তুমুল যুদ্ধু করছি, এ দিকে আকুল ‘এসো আমার ঘরে’ গাইছি, তা কি হয়? ইরানের বেস ক্যাম্প হয়েছে মেক্সিকো, শুধু ম্যাচের আগের দিন তারা আমেরিকা ঢুকতে পারবে, ‘থ্যাঙ্কস টু দ্য জেনেরোসিটি অব দ্য প্রেসিডেন্ট’, জানিয়েছে হোমল্যান্ড সিকিয়োরিটি। অতিথিদেবো ভব!

ও দিকে গত ৭২ ঘণ্টায় আর কী কী হয়েছে? আমেরিকায় ঢোকার পর ইরাক ফুটবল দলের এক খেলোয়াড়কে সাত ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে। এমনকি দলের চিত্রগ্রাহককেও, দশ ঘণ্টা। গত বছর ‘আফ্রিকা মহাদেশের সেরা’ পুরস্কার পাওয়া সোমালি রেফারিকে আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি, বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে— এমনকি কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও। ফিফা বলেছে, কী করব বলো, ভিসা-ইমিগ্রেশন ও-সবে আমাদের হাত নেই, ফিরে যাও। আমেরিকার মাটিতে প্লেন নামার পর টারম্যাকেই সেনেগালের ফুটবলারদের জুতো খুলিয়ে, কড়া দেহতল্লাশি চলছে, ভিডিয়ো ভাইরাল। অনুশীলন করতে স্টেডিয়ামে আসার পর উজ়বেকিস্তানের জাতীয় দলকে এসে শুঁকছে স্নিফার ডগ— বারুদ, মাদক আছে কি না! সুইৎজ়ারল্যান্ডের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের ভিসা ‘বিবেচনাধীন’ পড়ে ছিল, ছাড়পত্র পাওয়া গেছে বাকি দলের অনেক পরে। আজ রাতে মেক্সিকোর সঙ্গে প্রথম ম্যাচই যাদের, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দল এসে পৌঁছেছে ঢের দেরিতে, কারণ সেই এক— ভিসা সমস্যা।

আফ্রিকার রেকর্ড সংখ্যক দেশ এ বারের বিশ্বকাপে মূলপর্বে। এবং কোনও না কোনও কারণে আমেরিকার চক্ষুশূল, এমন দেশও সম্ভবত রেকর্ড সংখ্যক! ইরান, সেনেগাল ছাড়াও হাইতি, আইভরি কোস্টের উপর ট্রাম্পের দেশ অংশত বা পূর্ণ ‘ট্র্যাভল ব্যান’ বসিয়েছে। ঘানা, মিশর, মরক্কো, জর্ডন, উজ়বেকিস্তান ভুক্তভোগী ভিসা-প্রসেসিং’এর জটিলতা, নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কড়াকড়ির। সবচেয়ে বড় কথা, ২০১৭-য় বিশ্বকাপের জন্য যখন একত্রে ঝাঁপিয়েছিল আমেরিকা, কানাডা আর মেক্সিকো, সেই সময়ের সঙ্গে আজকের আকাশপাতাল ফারাক— আমেরিকার সঙ্গে বাকি দু’জনের এখন প্রায় মুখ দেখাদেখি বন্ধ! ডোনাল্ড ট্রাম্প তো প্রায়ই বলে থাকেন, কানাডা করছেটা কী, আমেরিকার ৫১তম প্রদেশ হয়ে যাক ওরা। পরিস্থিতি এমনই, মেক্সিকো আর কানাডা নিজেদের যথাসাধ্য প্রচার করছে ফুটবলবান্ধব, নিরাপত্তাবান্ধব, অভিবাসীবান্ধব, বর্ণবাদবিরোধী বলে— আমেরিকা ওই জায়গাগুলোয় এমন সব গেরো করে রেখেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার আসরে মাঠে বল না গড়াতেই যদি এই হয়, কাল ইস্তক আরও কত কী দেখতে হবে! টিভিতে দেখা যাবে না তা। এক-একটা দেশের জন্য গ্যালারিতে গলা ফাটাবেন, পতাকা দোলাবেন, কাঁদবেন-হাসবেন যাঁরা, তাঁদের বাইরেও রয়ে যাবেন নানা দেশের লক্ষ ফুটবলভক্ত: আজীবন ফুটবল ভালবেসেও, আজীবন বিশ্বকাপ দেখতে আসার জন্য পয়সা জমিয়েও যাঁরা আসবেন না স্রেফ ভয়ে, উদ্বেগে। এত কাঠখড় পুড়িয়ে এসে একটা দেশের বিমানবন্দরেই যদি প্রতি পদে মরমে মরে যেতে হয় নিজের গায়ের রং, নাগরিকত্ব, তোমার দেশের রাজার সঙ্গে আমার দেশের রাজার এই মুহূর্তে গলাগলি না দলাদলি সেই নিয়ে ভেবে— তবে আর ফুটবল কী পারল! যদি আয়োজক-দেশ গোড়াতেই জানিয়ে রাখে স্টেডিয়ামে রীতিমতো থাকবে ‘আইসিই’-উপস্থিতি, কালো-বাদামি-বিধর্মীগুলো সব খেলা দেখার পরে যাতে এ-দেশেই থেকে না যায় তা নজর রাখতে— সেই বিশ্বাসহীনতার পাশে কি ফুটবল সাজে?

এ-সব কিছুই হবে না। সব ঠিক হবে, ভাল হবে— আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন