Adolation Period

যান্ত্রিক সময়ে মানবিক সম্পর্ক

বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে আজকের কিশোর-কিশোরীরা শামিল হয়ে পড়ছে, যেখানে থেমে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার সময়ও তারা পায় না।

শ্রীতা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:৫৯
Share:

মানব জীবন নাকি ‘রোবোটিক’, যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে সমানেই। তা হোক না কেন, একটা কথা ঠিক— মানবজীবনে সম্পর্কের ভূমিকা বড়ই কেন্দ্রীয়। কৃত্রিম মেধা ইত্যাদির প্রবল হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও ব্যক্তির নিভৃত, ব্যক্তিগত জীবন অনেকাংশেই পরিচালিত হয় তার অপর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বা সম্পর্কহীনতার উপর ভিত্তি করে। আর সেখানেই ঘেঁটে গিয়েছে প্রযুক্তি-অধ্যুষিত সময়ের হিসাব। আজকের নবীন প্রজন্মের কাছে সম্পর্ককে ব্যালান্স করে নিয়ে চলা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ কথা সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত।

জীবনের পথে চলতে বিশেষ কোনও মানুষ হঠাৎ চলে গেলে সব সময়ই তা মনকে কষ্ট দিয়ে যায়। যাবেও। তবে সেই কষ্টে নিমজ্জিত হওয়ার কোনও কারণ দেখি না। মানুষ, সম্পর্ক সবই তো অভ্যাসের ব্যাপার। এবং ‘অভ্যাস’ শব্দটাই অনেকটা সাময়িকের পর্যায়ে পড়ছে। সময়বিশেষে বদল ঘটে যাচ্ছে তাতে। অনেকটা সময় সেই অভ্যাসের মধ্যে থাকার পরে হঠাৎ সেটা থেকে বেরিয়ে এলে মনে হয় বুকের মধ্যেটা খালি হয়ে গেল। মনে হয় চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে জলে। কেঁপে যাচ্ছে গলা। কিন্তু এটা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ামাত্র। সময়ের সঙ্গে আমরা পুরনো অভ্যাস, মুহূর্তগুলো ভুলে যেতে থাকব। তার পর একটা সময় আসবে, যখন সেগুলো শুধুই আবছা স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে। ঠিক তখনই অবসাদ, মনখারাপ কাটিয়ে উঠে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসব আমরা। এই কাটিয়ে ওঠার পর্বটা পার হতে কারও কয়েক সপ্তাহ লাগে, কারও কয়েক মাস।

মানুষ আলাদা। তাদের পরিবেশগত অভিজ্ঞতা আলাদা। দৃষ্টিকোণও আলাদা হতে বাধ্য। সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় সেখানেই। অনেকেই এই সম্পর্কে ‘থাকা’ বা তার থেকে ‘বেরোনো’-র ব্যাপারে মন তৈরি করতে পারে না। মানে এই প্রবেশ-নিষ্ক্রমণ-পুনঃপ্রবেশ— এর মধ্যে দিয়ে অনবরত যাতায়াত তাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা বড় করে দেয়। হয়তো এক বার ‘না’ হয়ে গেলে, তাকে ‘না’ ধরে নিয়ে এগোনোই ভাল। তাতে কষ্টটা কম দিনের হয়। আর ‘হ্যাঁ’ মানে, ঝড়-ঝাপ্টা সামলানোর শক্তি নিয়ে চলা।

নবীন প্রজন্মের কাছে সম্পর্ক গোলকধাঁধার মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে মূলত তাদের জীবনাচরণ ও জীবনশৈলীর পার্থক্যগত কারণে। মুহূর্তে সব পাওয়া এবং পেয়ে হারানোর যে মুহূর্তগুলির মধ্যে তাদের আশৈশব চলে-ফিরে বেড়ানো, তা যে কখন বস্তু থেকে ব্যক্তিকে ফোকাস করে বসে, ব্যক্তি-বস্তুর ধারণা মিলেমিশে তালগোল পাকিয়ে যায়, মানুষ নিজেও জানে না। বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে আজকের কিশোর-কিশোরীরা শামিল হয়ে পড়ছে, যেখানে থেমে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার সময়ও তারা পায় না। তাই ব্যক্তিগত জীবনে বস্তুবদলের মতো সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা সম্পর্ককেও দেখে। ব্যক্তি ও বস্তুতে তফাত করার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলার ফলেই হয়তো আজকের আলফা-বিটা-গামারা মন ভেঙে বসে পড়ে মাঝপথে। অনেক সময় হৃদয়ভঙ্গের যন্ত্রণাকে ভুলতে ভুলবশতই অপরাধমূলক কর্মের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। ‘সেলফ লাভ’, ‘মি টাইম’ ইত্যাদি শিক্ষাকে মন্ত্রপাঠের মতো পড়িয়ে আজকের আধুনিক সমাজ শিশুদের শেখায় আত্মপর হতে, সুযোগসন্ধানী হতে, অর্থ ও আত্মস্বার্থের বলে বলীয়ান হতে। অন্য দিকে, তারাই সমাজের প্রতি, সমাজব্যবস্থার প্রতি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিলে সমালোচনায় বিদ্ধ করে তোলা হয় তাদের।

এ বার এই ক্ষতবিক্ষত সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে নতুন পাঠ পড়ানোর সময় এসেছে। জীবিকার সাফল্যের পাশাপাশি তাকে দিতে হবে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা। প্রাথমিক ভাবে ঘরেরই চার দেওয়ালের মধ্যে অভিভাবককে শিশু-কিশোরের মধ্যেকার মানবিক সংবেদনাকে লালন করতে হবে। তাঁদের নিতে হবে পেরেন্টিং-এর নতুন পাঠ। ব্যক্তিগত জীবনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্তহীনতার মাঝের বিন্দুতে অবস্থানকারী কিশোর বা যুবকটি কী করবে, এ পথনির্দেশ পৃথিবীর কোনও কৃত্রিম মেধা দিতে পারবে না। হৃদয় ও মস্তিষ্কের কোষে দ্রুত রক্ত সঞ্চালনকে কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে আবেগকে, পৃথিবীর কোনও পাঠশালায় সে পাঠ শেখানো হয় না। আর তাই সেই সব স্পর্শকাতর বিন্দুগুলিতেই মারাত্মক ভুল করে বসার সম্ভাবনা পুরোমাত্রায় থেকে যায়। সেই ভুলের বোঝা সমাজ মাথা নিচু করে বহন করে চলছে। চলবেও। কিন্তু সিস্টেমে কোথাও তো একটা বদল দরকার।

শৈশবকাল থেকেই শিশু যদি পায় আপনজনের সান্নিধ্য, স্নেহ-মমতার ‘ওম’— সে সুরক্ষিত অথচ আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। বহির্জগৎকে শুধু ‘লড়াই’ দেওয়া নয়, সমাজকে, সম্পর্ককে সুরক্ষার বর্মে ঢেকে রাখার মতো করে নিজেকে যাতে উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারে, ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-র চেতনায় যেন বিশ্বাস রাখতে পারে, বাজার ও চাহিদামুখী শিক্ষায় উচ্চতর নম্বর প্রাপ্তির পরেও যাতে সাংগঠনিক চেতনায় ঋদ্ধ হয়, প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও যাতে মূল্য দিতে পারে মানবিক সম্পর্ককে, সে ভাবেই নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তবেই এক দিন পৃথিবীটা হয়ে উঠবে মানুষের বাসযোগ্য।

বাংলা বিভাগ, জ়াকির হুসেন দিল্লি কলেজ (সান্ধ্য)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন