এ যেন চমকাতে গিয়ে নিজেই চমকে যাওয়া! শেষে বেগতিক বুঝে লেজ গুটিয়ে চম্পট! তাইওয়ান তথা সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপকে (পড়ুন রিপাবলিক অফ চায়না বা আরওসি) চক্রব্যূহে ঘেরার সময় চরম ‘বেইজ্জতির’ মুখে পড়ল গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না)। গোটা ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে বেজিঙের বিমানবাহিনীর শক্তি। পাশাপাশি, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রটিকে ড্রাগনের পক্ষে কব্জা করা যে একেবারেই সহজ নয়, মানছেন সাবেক সেনাকর্তা থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
সম্প্রতি, তাইওয়ান প্রণালীতে ‘আগ্রাসী’ মহড়া চালানো চিনা লড়াকু জেটের একটি ছবি প্রকাশ করে আরওসি প্রশাসন। এর পরই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, সংশ্লিষ্ট ছবিতে সাবেক ফরমোজ়ার বিমানবাহিনীকে বেজিঙের যুদ্ধবিমানকে ‘রেডার-লক’ করতে দেখা গিয়েছে। ওই সময় ইচ্ছা করলেই ড্রাগনের জেট ধ্বংস করতে পারত তারা। বিপদ আঁচ করে গতি বাড়িয়ে যুদ্ধবিমান নিয়ে সেখান থেকে পালান মান্দারিনভাষী ফাইটার পাইলট।
গত ২৯ ডিসেম্বর বিকেল পৌনে ৫টা নাগাদ এই ইস্যুতে বিবৃতি দেয় তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ওই সময়েই চিনা লড়াকু জেটের ‘রেডার-লকিং’ ছবি প্রকাশ করে তারা। সরকারি ভাবে বলা হয়, ‘‘আরওসির আকাশসীমার খুব কাছে চলে এসেছিল বেজিঙের জে-১৬ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ ভাইপার জেট নিয়ে তাদের মোকাবিলায় যান তাইপের ফাইটার পাইলটেরা। মাঝ-আকাশে পৌঁছে ড্রাগনের যুদ্ধবিমানগুলিকে নিশানা করেন তাঁরা। তবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগেই ময়দান ছাড়ে চিনা জেট।’’
এখন প্রশ্ন হল, কী এই ‘রেডার-লক’? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতিটি যুদ্ধবিমানের ককপিটে থাকে একাধিক সেন্সর এবং রেডার। এগুলির সাহায্যেই মাঝ-আকাশে লড়াই চালান পাইলট। ককপিটের রেডার শত্রুর জেটকে চিহ্নিত করতে এবং তার উপর নিশানা লাগাতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে মাঝ-আকাশে বিপক্ষের যুদ্ধবিমানের উপর নিশানা ঠিক করাকেই বলে ‘রেডার-লক’। এক বার তা হয়ে গেলে অনায়াসে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সংশ্লিষ্ট জেটকে উড়িয়ে দিতে পারেন ককপিটের যোদ্ধা-পাইলট।
বায়ুসেনার অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের কথায়, ‘রেডার-লক’ অবস্থা থেকে যুদ্ধবিমানকে রক্ষা করা বেশ কঠিন। কারণ, নিশানা ঠিক করা থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গোটা প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ফলে বেজিঙের যোদ্ধা-পাইলট কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাইওয়ানের ‘আকাশ থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র (পড়ুন এয়ার টু এয়ার মিসাইল) এসে ধাক্কা মারত তার জেটে। ‘ইজেকশন’-এর মাধ্যমে ককপিট থেকে তিনি বেরিয়ে যেতে পারলেও যুদ্ধবিমানের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ লড়াকু জেটে আছে ‘বিয়ন্ড ভিস্যুয়াল রেঞ্জ’ ক্ষেপণাস্ত্র। এর পোশাকি নাম এআইএম ১২০-অ্যামর্যাম। ফলে শত্রুর যুদ্ধবিমানকে চোখে দেখে হামলা চালানোর প্রয়োজন নেই তাইপের। ককপিটের রেডারে এক বার সেটা ধরা পড়লেই ওই ক্ষেপণাস্ত্র চালাতে পারবেন ফরমোজ়ার যোদ্ধা পাইলটেরা। সঙ্গে সঙ্গে নিখুঁত নিশানায় ছুটে গিয়ে শত্রুর যুদ্ধবিমান ধ্বংস করবে ওই হাতিয়ার। লড়াকু জেট থেকে নির্গত হওয়া তাপ চিনে নিয়ে তাড়া করে তার উপর হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে এই ক্ষেপণাস্ত্রের।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, তাঁদের এফ-১৬ ভাইপার যুদ্ধবিমানে রয়েছে এএন/এএকিউ-৩৩ স্নাইপার অ্যাডভান্সড টার্গেটিং পড। সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপের বিমানবাহিনী একে সাধারণ ভাবে ‘স্নাইপার পড’ বলে থাকে। এই সিস্টেমটির মাধ্যমে মাঝ-আকাশে শত্রুর রেডারকে ফাঁকি দিয়ে অনেকটা দূর থেকেই তাদের লড়াকু জেটকে নির্ভুল ভাবে চিহ্নিত এবং ট্র্যাক করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়েছে বলে স্পষ্ট করেছে তাইপে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জে-১৬ মাল্টিরোল জেটগুলিকে বাদ দিলে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ বিমানবাহিনীর শানসি কেজে-৫০০ নামের একটি রেডার যুক্ত নজরদারি বিমানকেও ‘রেডার-লক’ করেছিল তাইওয়ান বায়ুসেনা। সেটিকেও দ্রুত সংশ্লিষ্ট দ্বীপটির আকাশসীমার কাছ থেকে সরিয়ে নেয় বেজিং। ফলে কোনও বিপত্তি ঘটেনি। নিশানায় থাকা শানসি কেজে-৫০০র কোনও ছবি প্রকাশ করেনি সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপের সরকার।
গত বছরের ডিসেম্বরে পিএলএ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে জাপানি যুদ্ধবিমানকে ‘রেডার-লক’ করার অভিযোগ ওঠে। বেজিঙের এ-হেন ‘আগ্রাসন’ নিয়ে বিবৃতি দেন টোকিয়োর প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজ়ুমি। তিনি জানান, ওকিনাওয়া দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে লিয়াওনিং নামের একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রেখেছিল বেজিং। সেখান থেকে জে-১৫ লড়াকু জেট উড়ে এসে ‘সামুরাই’ বায়ুসেনার একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে রেডার-লক করে ফেলে। ফলে জেটটির উপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত কোনও বিপদ ঘটেনি।
জাপানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, গত ৬ ডিসেম্বর ওকিনাওয়া দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় রুটিন টহলদারি চালাচ্ছিল তাদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান। ওই সময় অন্তত দু’বার টোকিয়োর এফ-১৫ জেটকে ‘রেডার-লক’ করে চৈনিক নৌবাহিনীর জে-১৫। প্রথম ঘটনাটি ঘটে বিকেল ৪টে ৩২ থেকে ৪টে ৩৫ মিনিটের মধ্যে। আর দ্বিতীয় বার সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ থেকে ৭টা ৭ মিনিটের মধ্যে সামুরাই যুদ্ধবিমানের উপর পিএলএ পাইলট নিশানা লাগিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনার পর ৭ ডিসেম্বর টোকিয়োয় মোতায়েন চিনা রাষ্ট্রদূত উ জিয়াংহাওকে তলব করে জাপান সরকার। পরে এই বিষয়ে বিবৃতি দেয় বেজিং। সেখানে অবশ্য যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছে ড্রাগন। তাদের দাবি, ইচ্ছাকৃত ভাবে পিএলএ-র বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াচ্ছে জাপান। তাদের বিরুদ্ধে কোনও আগ্রাসন দেখানো হয়নি। উল্টে নিয়ম ভেঙে তাদের বিমানবাহী রণতরীর কাছেই নাকি এগিয়ে এসেছিল জাপানি জেট।
পাল্টা বিবৃতিতে বেজিঙের বিদেশ মন্ত্রক বলে, ‘‘লিয়াওনিং বিমানবাহী যুদ্ধপোত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন পিএলএ নৌবাহিনীর পাইলটেরা। তখন হঠাৎ করে সংশ্লিষ্ট রণতরীটির খুব কাছে চলে আসে জাপানি জেট। দেখে মনে হয়েছিল, আক্রমণ শানাতে চাইছে তারা। সেই কারণেই টোকিয়োর যুদ্ধবিমানকে ‘রেডার-লক’ করা হয়। তবে তাদের উপর কোনও রকমের হামলা চালানো হয়নি।’’ এই যুক্তিতে আগ্রাসনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে পাল্টা সুর চড়ায় ড্রাগন সরকার।
গত বছরের ৩ অক্টোবর তথ্যচিত্রভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে চিনের সরকারি গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন’। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ এবং এফ-৩৫ লড়াকু জেট নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ বিমানবাহিনীর এক পাইলট। তাঁর দাবি, ধারে ও ভারে অনেক কম ক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমানের ককপিটে বসে জোড়া মার্কিন জেটকে ‘লক’ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ফলে কোনও মতে পালিয়ে বাঁচে মার্কিন জেট।
‘গ্লোবাল টাইমস চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন’ জানিয়েছে, গত বছর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ঘটে ওই ঘটনা। তথ্যচিত্রভিত্তিক প্রতিবেদনটিতে অবশ্য সরাসরি কোনও মার্কিন লড়াকু জেটের নাম করা হয়নি। তবে যে দু’টি যুদ্ধবিমানের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে আমেরিকার বিখ্যাত প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘লকহিড মার্টিন’-এর তৈরি এফ-২২ র্যাফটর এবং এফ-৩৫ লাইটনিং টু-র হুবহু মিল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টটিতে পিএলএ বিমানবাহিনীর পাইলট লি চাওয়ের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করেছে বেজিঙের সরকারি গণমাধ্যম।
পর পর এই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকায় চিনের সামরিক শক্তিকে সমীহ করা শুরু করে ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকাও। গত বছরের ডিসেম্বরে ফাঁস হয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের এই সংক্রান্ত একটি গোপন রিপোর্ট। সেখানে মুখোমুখি সংঘর্ষে ড্রাগনের হাতে মার খাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেন ওয়াশিংটনের দুঁদে সেনা কমান্ডারেরা। তাইওয়ানকাণ্ডে বেজিঙের ভয় যে অনেকটাই কাটল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সকালে হঠাৎ করেই তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক মহড়া শুরু করে চিনা লালফৌজ। এতে স্থল-জল-বিমানবাহিনীকে একসঙ্গে নামিয়েছিল বেজিং। সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাভ্যাসের পোশাকি নাম ছিল ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’। এ ব্যাপারে বিবৃতি দিতে গিয়ে ড্রাগন সরকার জানিয়ে দেয় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বার্তা’ দিতে ওই মহড়া চালানো হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের নেতৃত্বে ৩০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যা চালায় পিএলএ।
তাইওয়ানের গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে যে, ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ চলার সময়ই চিনের লড়াকু জেটকে ‘রেডার-লক’ করতে সক্ষম হয় তাঁদের বায়ুসেনা। শুধু তা-ই নয়, চেং কুং শ্রেণির একটি যুদ্ধজাহাজ-সহ মোট তিনটি রণতরীকে চিহ্নিত করেছিল তাইপের নৌবাহিনী। জাহাজগুলিকে ধ্বংস করতে উপকূল ভাগে ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি রেখেছিল তারা।
তাইওয়ান প্রণালীতে সামরিক মহড়ার সময় লড়াকু জেটের ‘রেডার-লক’ হওয়ার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ভিত্তিক একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে চিন। সেখানে বিপুল সংখ্যায় ড্রোন এবং রোবট সৈন্যকে যুদ্ধকৌশল প্রদর্শন করতে দেখা গিয়েছে।
দীর্ঘ দিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে চিন। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটিকে স্বাধীন স্বতস্ত্র দেশ বলে মানতে নারাজ বেজিং। সাবেক ফরমোজ়ার পাশাপাশি জাপানের বেশ কয়েকটি দ্বীপ কব্জা করার পরিকল্পনা রয়েছে বিস্তারবাদী নীতিতে বিশ্বাসী ড্রাগনের। এর জেরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র হচ্ছে সংঘাত। এতে ওই এলাকায় লড়াইয়ের ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
এ-হেন পরিস্থিতিতে তাইওয়ানকে ১,১১০ কোটি ডলারের (প্রায় ১ লক্ষ ২৬৩ কোটি টাকা) অস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওয়াশিংটন-তাইপের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটিই বৃহত্তম সামরিক সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল বেজিং। তার মধ্যে লড়াকু জেটের ‘রেডার-লক’ ড্রাগনের রক্তচাপ বাড়ল বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।