কৃত্রিম মেধার রমরমার প্রকোপ খুব শীঘ্রই পড়তে চলেছে চাকরির বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ভয়ই চেপে বসেছে বিশ্ব জুড়ে। চারদিকে ‘চাকরি গেল, চাকরি গেল’ রব। অনেকেরই দাবি, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণেই বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। তেমন আশঙ্কার কথা বার বার উঠে আসছে বিশেষজ্ঞদের মুখেও।
আশঙ্কা ছড়িয়েছে, বিশ্ব জুড়ে অনেক চাকরি কেড়ে নেবে এআই। এর প্রভাব পড়বে কম-বেশি সব দেশেই। কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে বহু সংস্থা। ফলে চাকরির বাজারে হাহাকার দেখা যাবে। উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি পেতে দম বেরোবে তরুণ সমাজের।
বিগত কয়েক বছর যাবৎ চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। তবে এআই নিয়ে এ বার প্রকাশ্যে এল এক অন্য উদ্বেগের কথা। মানবজীবন তো বটেই, পরিবেশের উপরও রয়েছে এর কুপ্রভাব।
কখনও ভেবে দেখেছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কী ভাবে এত নির্বিঘ্নে কাজ করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিভিন্ন সংস্থার সার্ভারে ভরা বিশাল বিশাল ‘গুদামঘর’ বা ডেটা সেন্টারগুলিতে। এগুলি ঠিক থাকলেই নিশ্চিন্তে কাজ চালিয়ে যেতে পারে সংস্থাগুলি।
গুগ্লের পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ‘গুগ্ল ২০২৪ এনভায়রনমেন্টাল রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এক বছরে মার্কিন টেক জায়ান্টের ডেটা সেন্টারগুলিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৬১০ কোটি গ্যালন বিশুদ্ধ জল এবং এর মধ্যে অনেক জল ব্যবহৃত হয়েছে কৃত্রিম মেধার ‘তৃষ্ণা’ মেটাতে।
শুনে অবাক লাগলেও বিশাল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের এ ভাবে অপচয়ের কথা স্বীকার করেছে গুগ্ল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘২০২৩ সালে আমাদের ডেটা সেন্টারগুলি ৬১০ কোটি গ্যালন জল ব্যবহার করেছে যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই রকম বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে।’’
৬১০ কোটি গ্যালন বিশুদ্ধ জল ব্যবহারের সঙ্গে কিন্তু মোটেও ‘সমুদ্রের এক ঘটি জল’ নেওয়ার প্রবাদ যায় না। ওই পরিমাণ জলে দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার প্রায় ৪১টি গল্ফ কোর্সে এক বছর ধরে জলসেচ করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যেমন বুদ্ধিমান, তেমনই বিশাল তার ‘তৃষ্ণা’। ফলে এআই বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় জলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ডেটা সেন্টারের মেশিনগুলির ‘তৃষ্ণা নিবারণ’ করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
কিন্তু কেন এত ‘তৃষ্ণার্ত’ কৃত্রিম মেধা? বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, ব্যবহারকারীরা কোনও ছবি বা লেখা কৃত্রিম মেধাকে তৈরি করার প্রম্পট দিলে তা তৈরি করতে হাজার হাজার প্রসেসর একসঙ্গে কাজ করে। ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।
সেই তাপ গিয়ে পড়ে সার্ভার কক্ষের মেশিন এবং বড় বড় কম্পিউটারগুলিতে। লক্ষ লক্ষ টাকার সেই সব মেশিন গলে যাওয়া রোধ করতে, ডেটা সেন্টারগুলি কুলিং টাওয়ার ব্যবহার করে।
কুলিং টাওয়ার সিস্টেমগুলিকে ঠান্ডা করা হয় বাষ্পীভবনমূলক শীতলীকরণের মাধ্যমে। তাপ শোষণ করার জন্য গরম পৃষ্ঠের উপর জল দেওয়া হয়। ব্যবহৃত জলের প্রায় ৮০ শতাংশ আক্ষরিক অর্থেই বাষ্প হিসাবে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়।
যে হেতু সেই বাষ্প পুনর্ব্যবহার করা যায় না, ফলে ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহারের উপায়ও থাকে না। সে কারণেই ওই রকম একটি ডেটা সেন্টারে প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ গ্যালন জল ব্যবহৃত হলেও এর প্রায় কিছুই বাঁচানো যায় না পুনর্ব্যবহারের জন্য।
অনেকের মনে এ প্রশ্নও আসতে পারে যে, তথ্যকেন্দ্রের জন্য বিশুদ্ধ জলই কেন প্রয়োজনীয়? পানযোগ্য নয়, এমন জল দিয়েও তো সার্ভার রুমের মেশিন ঠান্ডা করা যেতে পারে। এর উত্তর মৌলিক রসায়নের মধ্যে নিহিত।
জলে প্রাকৃতিক ভাবে ক্যালশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ থাকে। শীতলীকরণ পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের ফলে খনিজগুলি আরও ঘনীভূত হয়। অবশেষে লাইমস্কেল নামে একটি শক্ত খনিজের আস্তরণ তৈরি হয়।
এই আস্তরণ একটি পুরু কম্বলের মতো কাজ করে যা তাপ আটকে রাখে। ফলে ঠান্ডা করার যন্ত্রগুলি নষ্ট হয় দ্রুত। পুনর্ব্যবহৃত বা অশুদ্ধ জলে ওই খনিজ পদার্থের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, যা এক বার ব্যবহার করলেই যন্ত্রাংশের বিপুল ক্ষতি করে। ফলে বিশুদ্ধ জল ব্যবহারের পথেই হাঁটে সংস্থাগুলি।
বর্তমানে আমেরিকায় এক শতাংশেরও কম জল পুনর্ব্যবহৃত হয় এবং বেশির ভাগ শহরে পুনর্ব্যবহৃত জল শিল্পাঞ্চলে সরবরাহের জন্য পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। ফলস্বরূপ, ডেটা সেন্টারগুলির জন্য স্থানীয় প্রশাসন থেকে জল নিয়ে নেওয়া অনেক সস্তা এবং সহজলভ্য।
ডেটা সেন্টারগুলিতে জলের এই বিপুল ব্যবহারকে একটি উদ্বেগের বিষয় হিসাবেই দেখছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। মর্গ্যান স্ট্যানলির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে এআই ডেটা সেন্টারগুলিতে জলের ব্যবহার ১১ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর মধ্যে বেশ কিছু নতুন এআই ডেটাসেন্টার আবার এমন সব এলাকায় তৈরি হচ্ছে, যেগুলি ইতিমধ্যেই জলসঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করছে। যদিও তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রায়শই জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে, তবে এই প্রকল্পগুলি খুব কমই স্থানীয় এলাকায় তৈরি হয়।
ফলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, কৃত্রিম মেধা বা এআই আমাদের জীবনে যত বেশি বাগিয়ে বসবে, ততই তীব্র চাপ পড়বে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের উপর।