জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক অনীক দত্তের রহস্যমৃত্যু। বুধবার, ২৭ মে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাট সংলগ্ন হিন্দুস্তান পার্কের বহুতল থেকে পড়ে যান তিনি। সঙ্কটজনক অবস্থায় ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় তাঁকে। কী ভাবে অনীক ছ’তলা বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গেলেন, তা নিয়ে অবশ্য যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
বছর ৬৬-র অনীক চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার আগে টানা দু’দশক বিজ্ঞাপনজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময়সীমার মধ্যে বহু বিজ্ঞাপনী ছবি তৈরি করেন তিনি। ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে খবর, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ অবসাদে ভুগছিলেন অনীক। তাঁর তৈরি সিনেমা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মাত্র পাঁচ দিন আগেই (পড়ুন ২২ মে) ছিল এই বাঙালি পরিচালকের জন্মদিন। সে দিন সমাজমাধ্যমে পুরনো স্মৃতি ভাগও করে নিয়েছিলেন অনীক। ২০১২ সালে মুক্তি পায় তাঁর তৈরি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, যার বক্সঅফিস সাফল্য ছিল নজরকাড়া। ফলে রাতারাতি খবরের শিরোনামে চলে আসেন প্রয়াত পরিচালক।
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর ঠিক পরের বছর (পড়ুন ২০১৩ সাল) মুক্তি পায় অনীক দত্ত পরিচালিত ‘আশ্চর্য প্রদীপ’। এই সিনেমাটিও দর্শকের বেশ মন টেনেছিল। ২০১৪ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর চিত্রনাট্যে হিন্দি ভাষায় তৈরি হয় ‘গ্যাং অফ গোস্ট’, যার পরিচালক আবার ছিলেন সতীশ কৌশিক।
অনীক দত্ত পরিচালিত তৃতীয় সিনেমা হল ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’, যা মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। পুরোপুরি রহস্যে মোড়া এই সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক হলেন দেবজ্যোতি মিশ্র। আরও দু’বছর পর (২০১৯ সাল) প্রেক্ষাগৃহে আসে এই বাঙালি পরিচালকের তৈরি ‘ভবিষ্যতের ভূত’। সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রটিকে কেন্দ্র করে তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক।
ওই সময় অভিযোগ ওঠে কলকাতা-সহ বিভিন্ন সিনেমাহলে বন্ধ রাখা হচ্ছে ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর প্রদর্শন। এই নিয়ে হলমালিকদের একাংশকে আইনি নোটিস পাঠান অনীক ও ছবির প্রযোজক কল্যাণময় চট্টোপাধ্যায়। বাঙালি পরিচালকের বক্তব্য ছিল, ‘‘সরকার বা পুলিশের কাছ থেকে আমরা ছবি না দেখানোর বিষয়ে কোনও লিখিত নির্দেশ পাইনি। ফলে নোটিস দেওয়া হয়েছে হলমালিকদের।’’
‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর প্রদর্শন বন্ধকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নিশানা করেন অনীক। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘কার নির্দেশে এই ছবির প্রদর্শনী বন্ধ রাখা হয়েছে তার উত্তর দিন মুখ্যমন্ত্রী।’’ রাজ্য প্রশাসন অবশ্য জানিয়ে দেয় ছবি বন্ধ রাখার কোনও সরকারি নির্দেশ হলমালিকদের দেওয়া হয়নি।
অনীকের তৈরি পঞ্চম সিনেমা হল ‘বরুণবাবুর বন্ধু’। সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর গল্প অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য তৈরি করেন তিনি। এতে অনীকের পরিচালনায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং কৌশিক সেন। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় ‘বরুণবাবুর বন্ধু’।
এ ছাড়া সত্যজিৎ রায়ের জীবনী অবলম্বনে ‘অপরাজিত’ নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন অনীক। সেখানে অস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য চিত্রপরিচালক তথা সাহিত্যিকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে জীতু কমলকে। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটিকে নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়েন অনীক।
আদ্যোপান্ত বামপন্থী ভাবনার মানুষ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। গত বছর মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’। সেখানে মুখ্য ভূমিকায় দেখা গিয়েছে আবীর চট্টোপাধ্যায়কে। এই চলচ্চিত্রটিকে নিয়েও সিনেপ্রেমীদের আলোচনা করতে দেখা গিয়েছে।
বুধবার, ২৭ মে হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার প্রাক্তন স্ত্রীর বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে যান অনীক দত্ত। পরিচালক থাকতেন ডোভারলেন এলাকার বাড়িতে। প্রশাসন সূত্রে খবর, এসএসকেএমে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর দেহ। সেখানেই হবে ময়নাতদন্ত।
পুলিশ সূত্রে খবর, অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর পেয়ে অকুস্থলে পৌঁছোয় তদন্তকারী দল। নিছক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না কি নেপথ্যে রয়েছে কোনও গভীর ষড়যন্ত্র, সবটাই খতিয়ে দেখছে তারা। সূত্রের খবর, পরিচালকের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি ‘সুইসাইড নোট’ এবং একটি চটি। যেখানে লেখা আছে ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’। যদিও এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি লালবাজার।
অনীকের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে খবর, দীর্ঘ দিন ধরেই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন পরিচালক। তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী সন্ধি দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, একটি ঘটনা ঘটেছে। এই বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করবেন না। পরে কথা বলবেন।
সূত্রের খবর, গত কয়েক মাস ধরে বাড়িতে একাই থাকছিলেন অনীক। তাঁর কন্যা থাকেন মুম্বইয়ে। পরিচালকের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ভিড় করেন টলিউড এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশ। প্রযোজক ফিরদসুল হাসান বলেন, “বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না। অনীকের মেয়ের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।’’
অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছোন সিপিএম নেতা-নেত্রীরা। সেই তালিকায় নাম রয়েছে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের। এ ছাড়াও হাসপাতালে গিয়েছেন দীপ্সিতা ধর, শতরূপ ঘোষ, সৃজন ভট্টাচার্য। দীপ্সিতা আনন্দবাজার ডট কম-কে জানান, তিনি এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না যে অনীক দত্ত আর নেই।
এ ছাড়াও প্রায় ধ্বস্ত অবস্থায় অনীককে দেখতে হাসপাতালে আসেন পরিচালক মানসী সিংহ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম শীলেরা। অনীকের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মুমতাজ় সরকার। এই খবর শুনে দিদি মানেকাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছোন মুমতাজ়।
অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতালে ঢোকেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-সহ পরিচালকের একাধিক সিনেমায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। এ ছাড়া শোকবিধ্বস্ত মুখে হাসপাতালে আসেন সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র।