James Scurry

হাতির পায়ে বেঁধে দেওয়া থেকে পশুদের সঙ্গে লড়াই! চোখে জল আনবে হায়দারের কারাগারে সৈন্যদের উপর অত্যাচারের উপাখ্যান

হায়দার আলির কাছে বন্দি হওয়া ১৫ জন ইংরেজের মধ্যে ছিল এক ১৪ বছর বয়সি কিশোর। জেমস স্কারি। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকে সে সমুদ্রপথে বারুদ বহনের কাজে নিযুক্ত হয়। পরিস্থিতি তাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করায়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ১১:৩৫
Share:
০১ ২০

সাল ১৭৮০। ভারতের বেশ কিছু জায়গায় সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দৌরাত্ম্য শুরু হয়ে গিয়েছে। আবার কিছু অংশে ইংরেজরা তখনও দাঁত ফোটাতে পারেননি।

০২ ২০

ভারতের মহীশূরে তখন ছিল হায়দার আলির রাজত্ব। সেই সময় তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি গঠন করেছিলেন। হায়দারের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ, যা চলে ১৭৮০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত।

Advertisement
০৩ ২০

সেই সময় ভারতে আসা ইংরেজ সৈন্যদের অনেকেই হায়দারের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের বন্দি করে রাখা হত। চলত নির্মম অত্যাচার। এমনকি হিংস্র পশুদের সঙ্গে অসম লড়াইয়েও অংশগ্রহণ করতে হত বন্দিদের। হায়দার-সহ অন্যরা দর্শকের আসনে বসে তা চাক্ষুষ করতেন। বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এটি।

০৪ ২০

সেই সময় যাতায়াতের মাধ্যম হিসাবে সমুদ্রপথকেই বেছে নেওয়া হত। ইংরেজরা সেই পথেই ভারতে প্রবেশ করতেন। তাই বঙ্গোপসাগরে কড়া নজর রাখা হত। সন্দেহভাজনদের তুলে এনে করা হত বন্দি।

০৫ ২০

সাল ১৭৮০। বঙ্গোপসাগরে ফরাসি অ্যাডমিরাল সাফ্রঁর হাতে ধরা পড়েন ১৫ জন ইংরেজ। তিনি তাঁদের সকলকে হায়দারের হাতে তুলে দেন। হায়দার তাঁদের বন্দি করে রাখেন।

০৬ ২০

সেই ১৫ জন ইংরেজের মধ্যে ছিল এক ১৪ বছর বয়সি কিশোর। জেমস স্কারি। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকে সে সমুদ্রপথে বারুদ বহনের কাজে নিযুক্ত হয়। পরিস্থিতি তাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করায়।

০৭ ২০

ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ারে জন্ম স্কারির। তার বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু স্কারি ছোট থাকাকালীনই তিনি মারা যান। রয়ে যান বিধবা স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ে। ছেলে হওয়ায় স্কারির কাঁধেই পড়ে পরিবারের দায়িত্ব। সে তাই ছোট বয়স থেকেই কাজে লেগে যায়।

০৮ ২০

হায়দারের কাছে বন্দি অবস্থায় কী ভাবে দিন কাটাতেন, সে কথা তিনি আত্মজীবনীতে লিখে গিয়েছেন। বইটির নাম ‘দ্য ক্যাপটিভিটি, সাফারিংস অ্যান্ড এস্কেপ অফ জেমস স্কারি’।

০৯ ২০

সেই বইয়ের লেখা অনুযায়ী, স্কারি-সহ ১৫ জনকে শ্রীরঙ্গপত্তনমে বন্দি করে রাখেন হায়দার। জোর করে তাদের সকলকে ধর্মান্তরিত করা হয়। স্কারির নাম বদলে রাখা হয় শামসের খান। তাদের জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগও করা হয়।

১০ ২০

স্কারিদের বন্দি করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পায়ে লোহার তৈরি মোটা শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়। শ্রীরঙ্গপত্তনমের জেলে বন্দি করে রাখা হয় তাদের। সেখানে তাদের উপর করা হত নির্মম অত্যাচার, তেমনটাই জানানো হয়েছে বইয়ে।

১১ ২০

আত্মজীবনীতে স্কারি সেই অত্যাচারের কথা বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১৫ জনের মধ্যে যাঁরা কোনও মতেই ধর্মান্তরিত হতে রাজি হননি, তাঁদের সকলকে হাতির পায়ে বেঁধে টেনে হত্যা করা হয়। সেই প্রক্রিয়ারও বর্ণনা করেছেন তিনি।

১২ ২০

প্রথমে তাঁদের হাত দু’টি পিছন দিকে ঘুরিয়ে কনুইয়ের কাছ থেকে বেঁধে দেওয়া হত। তার পর তাঁদের পায়ের নীচের অংশে বেঁধে দেওয়া হত দড়ি। সেই দড়ি দিয়েই তাঁদের হাতির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হত। হাতির দিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে থাকতেন তাঁরা। এ ভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হত কাউকে। তার পর অমসৃণ রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে তাঁদের নিয়ে যেত হাতিরা, আত্মজীবনীতে তেমনটাই জানিয়েছেন স্কারি।

১৩ ২০

জেলে তাঁদের প্রথম কিছু দিন ভাত খেতে দেওয়া হত। তার পর রাগির আটা দিয়ে তৈরি রুটি খেয়ে দিন কাটাতে হত। সর্বদা ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হত। কাজে কোনও ভুল হলেই প্রাণঘাতী শাস্তি অপেক্ষা করে থাকত।

১৪ ২০

১৭৮২ সালে হায়দারের মৃত্যুর পর টিপু সুলতান মহীশূরের সিংহাসনে বসেন। শুরু হয় তাঁর শাসনকাল। সেই সময়ও স্কারিরা জেলমুক্ত হননি। তাঁদের বন্দিদশাতেও আসেনি কোনও পরিবর্তন।

১৫ ২০

স্কারি আরও জানিয়েছেন, হাতির পায়ে বেঁধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছাড়া আরও নানা ভাবে শাস্তি দেওয়া হত তাঁদের। মাঝেমধ্যেই বাজারে নিয়ে গিয়ে তাঁদের দাঁড় করিয়ে মানুষের কেটে রাখা নাক-কান দেখিয়ে তাঁদের শাসানো হত। সেগুলি কাদের দেহের অবশিষ্টাংশ ছিল তা স্কারিরা জানতেন না। কিন্তু পান থেকে চুন খসলে যে তাঁদের সঙ্গেও এমনটা হতে পারে সেটা তাঁরা খুব ভাল ভাবেই জানতেন।

১৬ ২০

স্কারির আত্মজীবনী অনুযায়ী, পরবর্তী কালে শ্রীরঙ্গপত্তনম থেকে তাঁদের বেঙ্গালুরুর চিত্রদুর্গে স্থানান্তরিত করা হয়। জেল পরিবর্তিত হলেও অত্যাচারের পরিমাণ কমেনি। তিনি সেখান থেকে সঙ্গীদের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরই ধরা পড়ে যান।

১৭ ২০

১৭৯০ সাল। ১০ বছরের বন্দিদশা কাটিয়ে ওঠার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েন স্কারি। তিনি পুনরায় পালানোর চেষ্টা করেন। ধরা পড়া এড়ানোর জন্য স্কারি এবং তাঁর সঙ্গীরা এ বার জঙ্গলের পথ ধরেন। বহু মরাঠিও তাঁদের সাহায্য করেন। শেষে একটি ব্রিটিশ সেনাছাউনিতে এসে পৌঁছোন তাঁরা। বন্দিদশা থেকে চিরতরে মুক্ত হন স্কারি।

১৮ ২০

আত্মজীবনীতে স্কারি জানিয়েছেন, ১০ বছর বন্দি হিসাবে কাটানোর পর তিনি চেয়ারে বসতে ভুলে যান। ছুরি-চামচের ব্যবহারও তাঁকে নতুন করে শিখতে হয়। ইংরেজি বলাও তিনি প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন।

১৯ ২০

ইংল্যান্ডে পৌঁছোনোর পর স্কারি ব্যবসা শুরু করেন। যদিও তিনি ঘন ঘন পেশা পরিবর্তন করতে থাকেন। ব্যবসা ছেড়ে তিনি কয়লাখনির কাজে নিযুক্ত হন। তার পর জাহাজের স্টুয়ার্ড হিসাবেও কিছু দিন কাজ করেন।

২০ ২০

১৮০০ সালে স্কারি বিয়ে করেন। আট সন্তানের জনক হন তিনি। যদিও তাঁদের মধ্যে কেবল এক পুত্র এবং কন্যাই বেঁচে ছিলেন। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে স্কারি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু ভারতে কাটানো দিনগুলির গল্প এখনও স্কারির লেখা আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় অক্ষত রয়ে গিয়েছে।

সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement