অন্নপূর্ণা যোজনার পর এ বার আয়ুষ্মান ভারত। চলতি বছরের জুলাই থেকে পশ্চিমবাংলায় চালু হচ্ছে এই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমা। ২৩ মে, শনিবার সে কথা ঘোষণা করেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ক্ষমতায় এলে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কুর্সি পেয়েই তা পূরণ করতে চলেছে পদ্মশিবির।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ২১ মে দিল্লিসফর করেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজধানীতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নড্ডার সঙ্গে কথা হয় তাঁর। ওই বৈঠকের পর তিনি ঘোষণা করেন আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গকে ৯৭৬ কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার।
শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় থাকা প্রায় ছ’কোটি মানুষকে আয়ুষ্মান ভারতের আওতাভুক্ত করবে রাজ্য প্রশাসন। তার পর এতে যুক্ত হবেন অন্য উপভোক্তারা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পটি চালু করেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুভেন্দুর বক্তব্য, শুধুমাত্র রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দারাই নন, শিক্ষা বা কর্মসূত্রে ভিন্ রাজ্যে থাকা প্রায় এক কোটি মানুষ আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাবেন। পাঁচ লক্ষ টাকার চিকিৎসা বিমা সংক্রান্ত ওই প্রকল্পের কার্ড দেশের যে কোনও প্রান্তে গ্রাহ্য হবে। তাঁর এই ঘোষণার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রকাশ্যে এসেছে একটি প্রশ্ন।
তৃণমূল আমলে চালু হওয়া স্বাস্থ্যসাথীতে ছিল না কোনও শর্ত। অন্য দিকে, আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা সকলে পান না। ফলে পশ্চিমবঙ্গে কোন পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসাথীর সমস্ত উপভোক্তাকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পটির আওতাভুক্ত করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট করেনি রাজ্য প্রশাসন।
এ বছরের জুনে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরের একটি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। সেই সমঝোতা হয়ে গেলে কি পশ্চিমবঙ্গে উপভোক্তার পরিসর বৃদ্ধি করতে আয়ুষ্মান ভারতের বিধি বদল করবে মোদী প্রশাসন? সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না রাজনৈতিক মহল।
দিল্লিতে নড্ডা-অধিকারী বৈঠকের পর জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচএম) প্রকল্পে কেন্দ্রের থেকে প্রায় ২,১০৩ কোটি টাকার অনুদান নিশ্চিত করেছে রাজ্য। এর মধ্যে চলতি আর্থিক বছরে (২০২৬-’২৭) ইতিমধ্যেই শুভেন্দু প্রশাসনের হাতে ৫০০ কোটি টাকা তুলে দিয়েছে মোদী সরকার। বাকি টাকা কয়েকটি ধাপে মিলবে বলে জানা গিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিগত সরকার ২০২৩-’২৪ এবং ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের যে টাকা নেয়নি সেই অর্থ দিয়ে দিতে কেন্দ্রকে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ৩০ মে-র মধ্যে ২০২১-’২২ আর্থিক বছরে এনএইচএম প্রকল্পে খরচের শংসাপত্র (পড়ুন ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট) দিল্লি পাঠাতে বলেছে মোদী প্রশাসন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই বকেয়া অর্থ পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা।
আগামী ৩০ মে থেকে বিধাননগর মহকুমা হাসপাতালে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকাকরণ কর্মসূচি চালু করছে রাজ্য। ১৪-১৫ বছরের কিশোরীদের তা দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সংকল্পপত্রে এই টিকাকরণ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ক্ষমতা হাতে পেয়ে তা পূরণ করতে দেরি করলেন না মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকাকরণ কর্মসূচি চালু করে কেন্দ্র। রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, পশ্চিমবাংলায় সাত লক্ষের বেশি টিকা পাঠাতে সম্মত হয়েছে মোদী প্রশাসন। পাশাপাশি, পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের বরাদ্দের ব্যাপারেও কেন্দ্রীয় আশ্বাস মিলেছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকাকরণের পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, সদ্যোজাতের মৃত্যু ঠেকানো, রুবেলা, হাম, যক্ষ্মা-মুক্ত ভারত, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ও ফাইলেরিয়া-সহ বিভিন্ন রোগের মোকাবিলায় ভারত সরকারের অন্য প্রকল্পগুলি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে বাঁকুড়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, কলকাতা, পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া ও উত্তর দিনাজপুরের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। এই জেলাগুলিতে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবাংলায় নবজাতক এবং পাঁচ বছরের নীচের শিশুমৃত্যুর হার যথেষ্ট বেশি। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম ও মালদহ জেলার অবস্থা উদ্বেগজনক। আর তাই অবিলম্বে রাজ্যে তিনটি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। জেলাস্তরে বিএমওএইচ ও সিএমওএইচ এবং রাজ্য স্তরে আধিকারিকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেবে তারা।
৩০ মে কলকাতায় যক্ষ্মা-মুক্ত ভারতের কর্মসূচি করবে রাজ্য প্রশাসন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ প্রকল্প-সহ চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনুমোদিত পদের নিরিখে পশ্চিমবাংলায় নিয়োগ হয়েছে মাত্র ৫৩ শতাংশ। সেখানে জাতীয় গড় ৯৮ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির বদল আনতে ২৩ মে, শনিবার বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়, তিন মাসের মধ্যে নিয়োগ নীতিতে স্বচ্ছতা এনে শূন্যপদ পূরণ করবে রাজ্য প্রশাসন। এ ছাড়াও চারটি মেডিক্যাল কলেজ এবং একটি এমস-সহ স্বাস্থ্যের পরিকাঠামো খাতে বিপুল কেন্দ্রীয় বরাদ্দের আশ্বাস পেয়েছেন তিনি, খবর সূত্রের।
শুভেন্দু জানিয়েছেন, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং আসানসোলে একটি করে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির জন্য জমি-সহ বাকি প্রস্তাব কেন্দ্রকে পাঠাবে রাজ্য প্রশাসন। পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গে এমস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। সেই লক্ষ্যে স্থানীয় বিধায়ক এবং সাংসদদের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রকে পাঠানো হবে প্রস্তাব।
এ ছাড়া ব্লক, মহকুমা এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতাল এলাকায় ৪৬৯টি সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাব ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে শুভেন্দু প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগে কোনও পরিবারের জন্য মাসে যদি ২,০০০ টাকার ওষুধ লাগে, সেটা ২০০ টাকায় হয়ে যাবে।’’
পশ্চিমবাংলায় অমৃত প্রকল্পও চালু করবে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সেখানে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ ছাড়ে ওষুধ কিনতে পারবে রাজ্যবাসী। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিরোধিতা করার জন্য তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।
আয়ুষ্মান ভারত-সহ যাবতীয় কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ঘোষণার সময় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘এই সুবিধাগুলি না নেওয়ার জন্য পশ্চিমবাংলার কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছেন। ভারতের অন্য রাজ্যে এই নজির নেই।’’ তাঁর অভিযোগ, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যাও কেন্দ্রকে জানায়নি বিগত দিনের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।