আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার কথা ঘোষণা করল পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ইসলামবাদের তরফে আফগানিস্তানের কাবুল, কন্দহর, পাকটিকায় আকাশপথে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কাবুল।
পাল্টা হানায় পাকিস্তানের ৫৫ জন সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার। যদিও এই পরিসংখ্যান মানতে রাজি নয় ইসলামাবাদ। তাদের পাল্টা দাবি, দুই পাক সেনার মৃত্যু হয়েছে। উল্টো দিকে মারা গিয়েছেন ৩৬ জন আফগান সেনা।
পাকিস্তানের একটি টিভি চ্যানেলে দাবি করা হয়েছে যে, পাক সেনার হামলার পর আফগান সেনা তাদের পোস্টগুলিতে সাদা পতাকা উড়িয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে এই সংঘাত পরিস্থিতিতে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে আফগানিস্তানের এক সংবাদমাধ্যম। পাক হামলার পর আফগানিস্তানের নঙ্গারহারের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা ‘বখতার নিউজ় এজেন্সি’ একটি ছবি পোস্ট করে।
সেই ছবিতে সেনার পোশাকে বেশ কয়েক জন আফগান যুবাকে দেখা গিয়েছে। তাঁদের সকলের হাতে অস্ত্র। চোখ বাদে মুখের বাকি অংশ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। আক্রমণের ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন তাঁরা। সংবাদসংস্থার দাবি, ওই বাহিনী আফগানিস্তানের ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ বা আত্মঘাতী হামলাকারীদের একটি ব্যাটালিয়ন।
আফগান নিরাপত্তা সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলাকারীরা বিস্ফোরকে ভরা পোশাক (ভেস্ট) এবং বোমাসজ্জিত গাড়ি নিয়ে বড় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য এবং শত্রুদের ছিন্নভিন্ন করতে প্রস্তুত।
সংবাদসংস্থাটির প্রতিবেদনে এ-ও উঠে এসেছে, তালিবানের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরত ঘোষণা করেছেন যে পাকটিয়া, পাকটিকা এবং খোস্ত প্রদেশে ডুরান্ড লাইনের কাছে সীমান্ত এলাকায় পাক সেনার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হচ্ছে তালিবদের তরফে।
ইতিমধ্যেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ঘাজ়াব লিল হক’ নামের সামরিক অভিযান শুরুর কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে লিখেছেন, “যে কোনও আগ্রাসী বাসনাকে ধ্বংস করতে সক্ষম আমাদের সামরিক বাহিনী।” ইসলামাবাদের দাবি, পাক-আফগান সীমান্ত বরাবর আফগানিস্তানের আগ্রাসী আচরণের মোকাবিলা করতেই তাদের এই পদক্ষেপ।
যদিও এই সংঘাতের জন্য পাকিস্তানকেই দায়ী করেছে আফগানিস্তান। তালিবান সরকারের মুখপাত্র জ়বিউল্লাহ মুজাহিদ সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে লিখেছেন, “ভীরু পাক সেনা কাবুল, কন্দহর, পাকটিকার কিছু এলাকায় বিমানহানা চালিয়েছে। ভাগ্যক্রমে কোনও মৃত্যুর খবর নেই।”
কাবুলের দাবি, পাকিস্তানই প্রথমে আফগান সীমান্ত পেরিয়ে হামলা শুরু করে। শুক্রবার ভোরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। ডুরান্ড লাইন (পাক-আফগান আন্তর্জাতিক সীমান্ত) বরাবর ইসলামাবাদ হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তালিবানের।
উভয় পক্ষই সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান দিয়েছে। পাক সেনা জানিয়েছে, তাদের হাতে এখনও পর্যন্ত ১৩৩ জন আফগান তালিবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ২০০ জনেরও বেশি। একই সঙ্গে তালিবদের ২৭টি সেনাছাউনি ধ্বংস করে ন’জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্য দিকে তালিবদের দাবি, আফগান সেনার হাতে নিহত হয়েছেন ৫৫ জন পাক সেনা জওয়ান। পাক সেনার ১৯টি ছাউনিও দখল করা হয়েছে। তবে নঙ্গারহারে আট জন আফগান যোদ্ধা নিহত, ১১ জন আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৩ জন সাধারণ নাগরিকও।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের পাল্টা দাবি, আফগান হানায় দুই পাক সেনার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন তিন জন। পাকিস্তানের হানায় ৩৬ জন তালিব যোদ্ধা মারা গিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘পিটিভি নিউজ়’ অনুযায়ী, তালিবান লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর পাকিস্তানের (পিএএফ) যুদ্ধবিমানগুলি আফগানিস্তানের কন্দহরের আকাশে টহল দিয়েছে বহু ক্ষণ। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যে কোনও আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে প্রস্তুত বলেও সেনার তরফে জানানো হয়েছে।
নতুন করে সংঘর্ষের পর ইসলামাবাদ আফগান তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। শুক্রবার পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ বলেছেন, ‘‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। এখন আমাদের এবং তোমাদের (আফগানিস্তানের) যুদ্ধ হবে।’’
ইসলামাবাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালানো জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে কাবুল। এই নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মতবিরোধ দীর্ঘ দিন ধরে চলছে। যদিও তালিবেরা বার বার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তালিবান সরকারের দাবি, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোনও গোলমাল তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।
এর পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানে বিমানহামলা শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে উচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আফগানিস্তানের দিকে আঙুল তুলে ইসলামাবাদ জানিয়েছে, পূর্ব আফগানিস্তানে তেহরিক-ই-তালিবান (টিটিপি) বা পাকিস্তানি তালিবান এবং ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের শিবির লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
প্রতিশোধ নিতে বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে তালিবান আক্রমণ শুরু করার পর সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হয় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে। উভয় পক্ষই সেই লড়াইয়ে সীমান্তে থাকা দু’দেশের সেনাছাউনি ধ্বংস করার দাবি তুলেছে।