‘দল’ গঠন হয়েছে সপ্তাহখানেক হল। আর তার মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে সেই দলের ফলোয়ারের সংখ্যা পৌঁছে গেল এক কোটির কাছাকাছি। ছাপিয়ে গেল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সরকারি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলের ফলোয়ারের সংখ্যাকেও। যাবে না-ই বা কেন! দলের নাম যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’। অর্থাৎ, আরশোলা জনতা পার্টি।
কিছু দিন আগে শুরু হওয়া ভাইরাল ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া সিজেপি দলের বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা ৯০ লক্ষের বেশি। ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-সহ ভারতের বেশির ভাগ মূলধারার রাজনৈতিক দলের চেয়েও ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা বেশি তাদের।
সিজেপিকে নিয়ে হইচইও কম হচ্ছে না। দেশের অনেক নামীদামি ব্যক্তিত্ব, এমনকি রাজনৈতিক নেতারাও ইনস্টাগ্রামে ফলো করতে শুরু করেছেন ওই হ্যান্ডলটিকে। কিন্তু কী এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’? তৈরিই বা হল কেন?
সূত্রপাত বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশ ‘আরশোলা’র মতো আচরণ করেন বলে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করার পর। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মতে, ওই তরুণ-তরুণীরা কোনও পেশায় স্থান না পেয়ে সাংবাদিক, সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী বা তথ্যের অধিকার কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন ও সকলকে আক্রমণ করেন।
এক আইনজীবীর ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ তকমা নিয়ে মামলায় ওই মন্তব্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ তকমা পাওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এক আইনজীবী। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট তকমা আদালত দেয়। এই তকমাকে ধাওয়া করার প্রয়োজন নেই। গোটা দুনিয়ার সিনিয়র অ্যাডভোকেট হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও আপনার নেই। দিল্লি হাই কোর্ট আপনাকে ওই তকমা দিলেও আমরা আপনার আচরণ দেখে তা খারিজ করতে পারি।’’ সেই মামলার শুনানি চলাকালীনই ওই মন্তব্য করেন দেশের প্রধান বিচারপতি।
যদিও প্রধান বিচারপতি পরে স্পষ্ট করেন যে, তাঁর মন্তব্য ভুল ভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং বেকার যুবসমাজের সমালোচনা করার উদ্দেশে তিনি ওই মন্তব্য করেননি। প্রধান বিচারপকি সূর্য কান্ত জানান, তিনি বিশেষ ভাবে সেই সব মানুষদের কথা বলেছিলেন যাঁরা জাল বা ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে কোনও পেশায় প্রবেশ করেন। তিনি যুবকদের অবমাননা করেছেন বলে যে প্রতিবেদনগুলি প্রকাশিত হয়েছে তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।
অন্য দিকে বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশকে নিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ওই মন্তব্যের পরেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির জন্ম হয়। তারা একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে নেটমাধ্যমে। শুরু হয় নেটমাধ্যমে দলের সদস্য সংগ্রহের কাজও।
সিজেপির সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ‘যোগ্যতা’র মানদণ্ডও রয়েছে। বলা হয়েছে, বেকার, অলস, সারা ক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগত ক্ষেত্রে ক্ষোভপ্রকাশ করার ক্ষমতা থাকলে তবেই এই দলের সদস্য হওয়া যাবে। চালু হওয়ার প্রথম দু’দিনের মধ্যেই ৪০,০০০-এরও বেশি সদস্য সিজেপিতে নাম নথিভুক্ত করান। এর পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সিজেপির সদস্য এবং ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজ়াদ সিজেপির সদস্যপদ ‘গ্রহণ’ করেছেন। দলে ‘যোগ’ দিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, বলিউডের অনুরাগ কশ্যপ এবং কঙ্কনা সেনশর্মার মতো ব্যক্তিত্বরাও।
নিজস্ব ‘নির্বাচনী ইস্তাহার’ও রয়েছে সিজেপির। সেই ইস্তাহার অনুযায়ী দলটি নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস’ বলে বর্ণনা করেছে। বেশ কিছু দাবিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইস্তাহারে। যেমন— প্রধান বিচারপতিদের জন্য অবসর-পরবর্তী রাজ্যসভার আসনে নিষেধাজ্ঞা, সংসদের সদস্যসংখ্যা না বাড়িয়েই নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ এবং দলত্যাগী বিধায়ক এবং সাংসদদের জন্য ২০ বছরের নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা।
দলটি ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)’-কে পুনঃনিরীক্ষার ফি বাতিল করারও দাবি জানিয়েছে। বিষয়টিকে ‘প্রকাশ্য দুর্নীতি’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থনও জানানো হয়েছে।
দলটি একটি ভার্চুয়াল ‘জেন জ়ি’ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করার কথা ঘোষণা করেছে এবং এটি আয়োজনে সাহায্য করার জন্য তরুণ সমাজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন সিজেপির মুখ বা নেতা কে?
ব্যঙ্গাত্মক ওই রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রে রয়েছেন অভিজিৎ দীপকে নামের এক যুবক। তাঁর হাত ধরেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্ম। এক সপ্তাহ আগেও বস্টনে চাকরির জন্য আবেদন করছিলেন দিল্লির অরবিন্দ কেজরীওয়ালের দল আম আদমি পার্টির প্রাক্তন সমাজমাধ্যম কর্মী অভিজিৎ।
সপ্তাহখানেক আগে ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘আরশোলা’ মন্তব্যের পর যখন বিষয়টি নিয়ে অনলাইনে ক্ষোভের জন্ম হয়, তখন অভিজিৎ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ চালু করেন। তাঁর আন্দোলন সমাজমাধ্যম ঝড় তোলে।
কিন্তু এই অভিজিৎ কে? ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ কী? সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ এক জন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ, যাঁর কাজের মূল বিষয় হল রাজনৈতির আখ্যান তৈরি, জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রদান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি কী ভাবে রাজনৈতিক মতামতকে প্রভাবিত করে তা দেখা।
পুণে থেকে সাংবাদিকতা নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন অভিজিৎ। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা চলে যান। তিনি বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন।
২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যম দলে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবেও কাজ করেছেন অভিজিৎ। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আপ দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের সময়, তিনি দলের হয়ে মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রচার চালানোর কাজ করেন, যা সে সময় দিল্লির যুবসমাজকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে আমেরিকায় রয়েছেন অভিজিৎ। সেখান থেকেই চালাচ্ছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র মুখোমুখি হয়ে অভিজিৎ বলেন, ‘‘আমি এক সপ্তাহ আগে একটা চাকরির জন্য আবেদন করছিলাম, আর তার পরেই এই ঘটনাটি ঘটল। হ্যাঁ, আমিই সেই আরশোলা। ভারতের প্রধান বিচারপতি ঠিক আমার কথাই বলছিলেন।’’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল— ভারতের একাধিক প্রতিবেশী দেশে ‘জেন জ়ি’ আন্দোলন হতে দেখা গিয়েছে়। এর পর অনলাইনে মিম তৈরি হচ্ছিল এবং বলা হচ্ছিল, ‘ভারতের জেন জি কোথায়?’ তা হলে কি কোনও ভাবে ককরোচ জনতা পার্টিই হতে চলেছে ভারতের জ়েন জি আন্দোলনের মুখ? উত্তরে অভিজিৎ বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, ভারতের জেন জ়ি সব সময় এখানেই ছিল। কারণ, মাত্র কয়েক দিনে আমরা কী ধরনের সমর্থন পেয়েছি। লক্ষ লক্ষ সদস্য পেয়েছি। ইনস্টাগ্রামেও ফলোয়ারের সংখ্যা অনেক।’’
সিজেপি নিয়ে কী পরিকল্পনা অভিজিতের? এটা কি একটি ক্ষণস্থায়ী প্রতিবাদ হয়ে থেকে যাবে? সীমাবদ্ধ থাকবে সমাজমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড হিসাবে? উত্তরে ইন্ডিয়া টুডেকে অভিজিৎ বলেছেন, ‘‘হ্যাঁ, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ এবং আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যাঁরা নাম নথিভুক্ত করেছেন সদস্য হিসাবে তাঁদের সকলের কাছে পৌঁছোনো এবং তাঁদের কথা শোনা আমাদের লক্ষ্য। কারণ, আমি সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি পেয়ে আসছি তা হল, কেউ বেকারদের কথা শোনেন না, কেউ তাঁদের সঙ্গে কথা বলে না এবং তাঁদের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। আর এখন তাঁদের আরশোলা এবং পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থা যে ভাবে তাঁদের পুরোপুরি উপেক্ষা করছে, তাতে তাঁরা সত্যিই খুব হতাশ।’’
অভিজিৎ আরও বলেন, ‘‘আমরা ওদের জিজ্ঞাসা করব যে, আপনাদের মতে রাজনৈতিক আলোচনা কেমন হওয়া উচিত? আপনারা কোন বিষয়গুলোর উপর আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চান? কারণ এটাই আপনাদের মুহূর্ত। এই দেশের রাজনৈতিক আলোচনা কেমন হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আপনাদের হাতেই রয়েছে।’’
অভিজিতের দাবি, তরুণ সমাজের বহু বছরের হতাশার কারণেই এটা ঘটেছে। ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং সেই তরুণ জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই কর্মহীন। সিজেপি আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে, না কি তাদের আন্দোলন ডিজিটাল বিদ্রোহ হিসাবেই থেকে যাবে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই ব্যঙ্গাত্মক দলটি তরুণ ভারতীয়দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার অনুভূতিকে কাজে লাগিয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেছেন, এটিই হয়তো অবশেষে হতাশ ভারতীয় যুবসমাজকে রাজনীতিতে নিয়ে আসবে।