কৃত্রিম মেধার রমরমার প্রকোপ কি পড়ছে চাকরির বাজারে? সাম্প্রতিক সময়ে এই ভয় চেপে বসেছে বিশ্ব জুড়ে। আশঙ্কা ছড়িয়েছে, বিশ্ব জুড়ে অনেক চাকরি কেড়ে নেবে এআই। এর প্রভাব পড়বে কম-বেশি সব দেশেই। কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে বহু সংস্থাই কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে। ফলে চাকরির বাজারে হাহাকার দেখা যাবে। উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি পেতে দম বেরোবে তরুণ সমাজের।
অনেকেই দাবি করছেন, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণেই বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। বিশেষজ্ঞদের মুখেও তেমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে বার বার। ফলে চারদিকে ‘চাকরি গেল, চাকরি গেল’ রব উঠেছে।
বিগত কয়েক বছর যাবৎ চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। তবে এ বার এআই নিয়ে চাঞ্চল্যকর অন্য এক কথা শোনা গেল এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেইয়ের মুখে।
দারিয়ো দাবি করেছেন, খুব শীঘ্রই বিশ্বের বুকে আসতে চলেছে ‘এআই সুনামি’ এবং কৃত্রিম মেধা শীঘ্রই মানুষের ক্ষমতার স্তরে পৌঁছে যাবে। বিষয়টি এত দ্রুত হবে যে, মানুষ তা কল্পনা করতে পারবে না বলেও অ্যানথ্রোপিকের সিইও দাবি করেছেন।
আর্থিক সংস্থা ‘জেরোধা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিখিল কামাথের সঙ্গে একটি পডকাস্টে যোগ দিয়ে ওই মন্তব্য করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্তা দারিয়ো। এ-ও দাবি করেছেন, কৃত্রিম মেধা নিয়ে জনসচেতনতার অভাব এবং বৃহত্তর সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে পরবর্তী সময়ে কী ঘটবে তার জন্য প্রস্তুত নন সাধারণ মানুষ।
দারিয়োর কথায়, ‘‘এআই মডেলগুলি মানুষের বুদ্ধিমত্তার স্তরে পৌঁছোনোর খুব কাছাকাছি। তবুও কী ঘটতে চলেছে তা নিয়ে সমাজে কোনও হেলদোল নেই। মনে হচ্ছে যেন আমরা সুনামির অপেক্ষা করছি।’’
অ্যানথ্রোপিক সিইও আরও বলেন, ‘‘এটি এত কাছাকাছি এসে গিয়েছে যে আমরা দেখতেও পাচ্ছি। তবুও অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা নিয়ে আসছেন।’’ এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে কোনও জনসচেতনতা তৈরি হয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্তা।
কামাথের পডকাস্টে এসে তরুণ ভারতীয়দেরও এআই নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন দারিয়ো। তাঁর পরামর্শ তিনটি ভাগে বিভক্ত। এক, কৃত্রিম মেধার বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং এর উপর ভিত্তি করে কেরিয়ার গড়া। দুই, এআই এবং এআই সংক্রান্ত সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত ক্ষেত্রগুলি নিয়ে বিবেচনা করা। তিন, গঠনমূলক চিন্তাভাবনাকে তীক্ষ্ণ করে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। দারিয়ো এ-ও পরামর্শ দিয়েছেন, বিচক্ষণ হয়ে কৃত্রিম মেধার তরঙ্গের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলে কর্মক্ষেত্র নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
পাশাপাশি দারিয়ো যোগ করেছেন, এআইয়ের অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিশাল হতে চলেছে। এআইয়ের প্রভাবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিপদ দেখা দেবে এবং কোন ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হবে, তারও আভাস দিয়েছেন দারিয়ো।
অ্যানথ্রোপিক সিইও বলেন, ‘‘আমি মনে করি যে কাজগুলি বেশি চিন্তাভাবনার, অর্থাৎ যা মানবকেন্দ্রিক, যেমন কোডিং এবং সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ক্ষেত্র ক্রমশ কৃত্রিম মেধাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। গণিত এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই।’’
দারিয়ো আরও জানিয়েছেন, ক্রমশ কোডিং করার কাজে সিদ্ধহস্ত হচ্ছে এআই মডেলগুলি। কিন্তু সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বৃহত্তর কাজগুলিতে দড় হতে এআইয়ের আরও কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি এই সমস্ত কাজ শীঘ্রই এআইয়ের দখলে আসবে।’’
এআই নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের পটভূমিতে এই সব মন্তব্য করেছেন দারিয়ো। কৃত্রিম মেধা নিয়ে উদ্বেগ এই পর্যায়ে গিয়েছে যে, সামান্যতম ঝুঁকির মুখে থাকা সংস্থারও শেয়ার বিক্রি করার কথা ভাবছেন অংশীদারেরা।
বিনিয়োগকারীরাও আশঙ্কা করছেন, অ্যানথ্রোপিকের তৈরি করা এআই সরঞ্জামগুলি বাজারে প্রভাব ফেলবে। অন্য দিকে, অ্যানথ্রোপিকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বা এআই মডেল ‘ক্লড’ উন্নত যুক্তি, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্য প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য বিখ্যাত।
ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ওপেনএআই-এর এআই মডেল ‘চ্যাটজিপিটি’র মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উঠে এসেছে অ্যানথ্রোপিক। অ্যানথ্রোপিকের এই সব মডেল বাজারে আসতেই বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়েছে।
অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড কাউওয়ার্ক প্লাগইন’ এবং ‘ওপাস ৪.৬’, ‘সনেট ৪.৬’ মডেলগুলির বৈশিষ্ট্য বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন যে, স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টরা আইটি আউটসোর্সিং, আইনি প্রযুক্তি এবং আর্থিক ডেটা ব্যবসাগুলিকে দ্রুত ‘খেয়ে ফেলবে’। কারণ, তারা মানব-চালিত সরঞ্জামগুলির উপর নির্ভর না করেই জটিল কর্মপ্রবাহ পরিচালনা করতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরতে এবং সে দেশে সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার করেছিল মার্কিন সেনা। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্টে তেমনটাই দাবি করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ভেনেজ়ুয়েলায় এই সামরিক অভিযানের সাফল্যের নেপথ্যে বড় হাত রয়েছে এআই-এর। পেন্টাগন এই প্রথম বার কোনও সামরিক অভিযানে (ক্লাসিফায়েড মিশন) অ্যানথ্রোপিক সংস্থার এআই মডেল ‘ক্লড’-এর ব্যবহার করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে এআইয়ের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এর মধ্যেই কামাথের পডকাস্টে এসে এআই নিয়ে সাবধানবাণী দিলেন অ্যানথ্রোপিকের সিইও। বিশেষ়জ্ঞদের একাংশের মতে, দারিয়োর বৃহত্তর বার্তাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কৃত্রিম মেধার দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক কাঠামো পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও দারিয়ো স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি করেছেন। আগে ওপেনএআইয়ের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন তিনি।
কিন্তু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআই ছেড়ে যাওয়ার পর তিনি অ্যানথ্রোপিক তৈরি করেন। তার পর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি দারিয়োকে।