কোনও অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিকাশ মূলত দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে— তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং তার প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো। ভৌগোলিক অবস্থান সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, আর প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে সেই সম্ভাবনা আদৌ সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হবে কি না। বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর কারণে কোনও অঞ্চল উন্নতি করতে পারেনি। আবার এর বিপরীত উদাহরণও কম নয়— যেখানে কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সুপরিকল্পিত নীতি ভৌগোলিক সুবিধাকে বহু গুণ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ইতিহাসও এই কথাটিরই সাক্ষী দেবে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মোহনায় অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ এক সময় ভারতের বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, বিস্তৃত নদীপথের জাল, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশপথ হিসাবে কৌশলগত অবস্থান এবং বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের নৈকট্য— সব মিলিয়ে বাণিজ্য, পরিবহণ ও শিল্পোন্নয়নের জন্য রাজ্যটি ছিল স্বাভাবিক ভাবেই উপযুক্ত। ফলে কলকাতা বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শিল্প, বাণিজ্য এবং শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র।
তবে অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে না। গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গ ধীরে ধীরে তার অর্থনৈতিক গতি হারিয়েছে। শিল্পোন্নয়নের গতি শ্লথ হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে এবং ব্যবসার পরিবেশ ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এমন নানা প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যা শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, রাজ্যের ভৌগোলিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকলেও, সেই সুবিধাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ দুর্বল হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের ‘সাগরমালা ২’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৫ সালে যখন সাগরমালা প্রকল্প চালু করে, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দর-নির্ভর উন্নয়নকে উৎসাহিত করা— অর্থাৎ বন্দরগুলিকে সড়কপথ, রেলপথ এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সমন্বিত ভাবে যুক্ত করা। এর অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল সরল: পরিবহণ ব্যয় কমলে এবং সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটলে শিল্পোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি হয়। গুজরাত, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং তামিলনাড়ুর মতো রাজ্য দ্রুত এই সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের বন্দর ও সংযোগ ব্যবস্থা উন্নত করেছে। ফলে তাদের বন্দরগুলি শুধুমাত্র পণ্য ওঠা-নামার কেন্দ্র হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ তখন সেই পথে হাঁটেনি। কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হওয়া আরও বহু প্রকল্পের মতো এখানেও কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক মতভেদ অর্থনৈতিক বিবেচনাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। এর ফলে এক দিকে যেমন সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ হাতছাড়া হয়েছে, অন্য দিকে রাজ্য নিজের ভৌগোলিক সুবিধাকেও কাজে লাগাতে পারেনি। গত দশ বছরে ভারতের অন্যান্য উপকূলবর্তী রাজ্য যখন নিজেদের বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ মূলত এই পরিবর্তনের বাইরে থেকে গিয়েছে এবং নিজের অবস্থানগত সুবিধাকে কাজে লাগানোর সুযোগ হারিয়েছে।
এর ফলাফল স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ছে কলকাতা-হলদিয়া বন্দর ব্যবস্থার ক্রমহ্রাসমান গুরুত্বে। সারা দেশে পণ্য পরিবহণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেলেও কলকাতা-হলদিয়া বন্দর পরিকাঠামোর জীর্ণতা, পর্যাপ্ত সংযোগব্যবস্থার অভাব এবং বড় জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যবসার খরচ বেড়েছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমেছে। উত্তরবঙ্গের চা-শিল্প হোক বা হাওড়ার এঞ্জিনিয়ারিং শিল্প— পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত তাদের বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হ্রাস করে। যখন বৈশ্বিক জোগানশৃঙ্খল গতি ও নির্ভরযোগ্যতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, তখন সংযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে ওঠে।
‘সাগরমালা ২’ বাংলাকে আরও এক বার এই পরিস্থিতি পাল্টানোর সুযোগ দিচ্ছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর। বর্তমান কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় জাহাজ প্রায়শই সেখানে ভিড়তে পারে না, ফলে পণ্য পরিবহণের ব্যবসা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরে সরে যায়। আধুনিক গভীর জলের বন্দর তৈরি হলে তা পরিবহণ ব্যয় কমাবে; রফতানির প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ফলে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পোন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রকল্পের অন্যান্য উপাদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা ওয়াটার মেট্রো, নতুন জেটি নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ জলপথে বিনিয়োগ রাজ্যের পরিবহণ বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। কার্যকর সংযোগ কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজ্যের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহণের দক্ষতাও। উন্নত পরিবহণ পরিকাঠামো উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, খরচ কমাতে এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে।
তবে সাগরমালা ২-এর গুরুত্ব কেবল পরিকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলার কাছে আরও এক বার তার উন্নয়ন কৌশলকে ভৌগোলিক সুবিধার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিচ্ছে। ঐতিহাসিক ভাবে ভারতের পূর্ব উপকূল পশ্চিম উপকূলের তুলনায় কম শিল্পায়িত ছিল। কিন্তু বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ফলে— বিশেষ করে বিমস্টেক এবং অ্যাক্ট ইস্ট নীতির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে— পূর্ব ভারতের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্যের অবস্থান নতুন করে কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করেছে।
তবে, শুধু পরিকাঠামো উন্নয়ন কখনওই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। আজকের পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা যেমন পরিকাঠামোগত, তেমনই প্রতিষ্ঠানগতও। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং সবচেয়ে বড় কথা, ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর স্থায়িত্ব— সবই বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহ করে। আধুনিক উন্নয়ন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শিক্ষা হল: পরিকাঠামো সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, কিন্তু সেই সম্ভাবনা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মতো বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত হবে কি না, তা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠান।
‘সাগরমালা ২’-এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে দু’টি বৃহত্তর সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, রাজ্যকে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। কার্যকর প্রশাসন, স্বচ্ছ জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া, যুক্তিযুক্ত ও অনুমানযোগ্য নীতি এবং দ্রুত অনুমোদন— বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পোন্নয়নের জন্য এই শর্তগুলি অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের মাধ্যমে যদি কৃষক, মৎস্যজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক এবং কর্মসংস্থানের সন্ধানে থাকা তরুণদের কাছে উন্নয়নের ফল না পৌঁছয়, তবে সেই বৃদ্ধি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, কোনও দিক থেকেই সুস্থায়ী হবে না।
অতএব, ‘সাগরমালা ২’ কেবল একটি বন্দর উন্নয়ন কর্মসূচি নয়। এটি বাংলার কাছে আরও এক বার তার ভৌগোলিক সুবিধার ভিত্তিতে বৃহত্তর উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের সুযোগ এনে দিচ্ছে। যে রাজ্য দীর্ঘ দিন নিজের অবস্থানগত সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি, তার কাছে এটি এক নতুন সূচনার সম্ভাবনা। এখন প্রশ্ন— নতুন সরকার কি সেই প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে তুলতে পারবে, যা এই ভৌগোলিক সুবিধাকে প্রকৃত সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম? যদি পারে, তবে ‘সাগরমালা ২’ বাংলার অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের সূচনাবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে