Sayyad Agha Haider

‘আমি বিচারপতি, কসাই নই’

নৈরাজ্যবাদী অগাস্ত ভালিয়ান্ত ১৮৯৩-এ ফরাসি ‘চেম্বার অব ডেপুটিজ়’-এ বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। একটি মানুষকেও হত্যা করেননি; তবু ১৮৯৪-এ গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে।

সোনালী দত্ত

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫৭
Share:

ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষকে স্মরণ করা হলেও অনেকে অতীতের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যান। যেমন বিচারপতি সৈয়দ আগা হায়দার (ছবি), ব্রিটিশ আমলের বিচারক হয়েও বিদেশি প্রভুর সামনে মাথা নত করেননি। ভগৎ সিংহ, সুখদেব থাপর ও শিবরাম রাজগুরুর বিচারের রঙ্গমঞ্চে দাঁড়িয়ে সপ্তরথী-পরিবৃত অভিমন্যুর মতো লড়েছিলেন।

নৈরাজ্যবাদী অগাস্ত ভালিয়ান্ত ১৮৯৩-এ ফরাসি ‘চেম্বার অব ডেপুটিজ়’-এ বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। একটি মানুষকেও হত্যা করেননি; তবু ১৮৯৪-এ গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে। বিপ্লবী ভগৎ সিংহের মতো বিদ্রোহীরা এতে প্রবল প্রভাবিত হন। বিপ্লবী অজিত সিংহ, শহিদ স্বরণ সিংহের এই বংশধর ছিলেন ‘হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য। লাহোরে পুলিশ সুপার স্যান্ডার্স হত্যায় তাঁর নাম আসে। ১৯২৯-এ ঠিক করলেন আঘাত হানবেন দিল্লির ‘সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’-তে। ৮ এপ্রিল বটুকেশ্বর দত্তকে নিয়ে সেখানে পৌঁছে ‘স্মোক-বম্ব’ ছুড়লেন শূন্য আসনগুলিতে। হত্যা নয়, ব্রিটিশের ‘বন্ধ কানে শব্দ’ পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, অ্যাসেম্বলিতে প্রত্যাখ্যাত কিন্তু জোর করে জারি করা ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপিউটস অ্যাক্ট’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। না পালিয়ে বিপ্লবীরা স্লোগান দেন, লিফলেট ছুড়তে থাকেন, গ্রেফতার হন। এই কার্যক্রম ব্রিটিশের কাছে ছিল ‘প্রাণসংশয় ডেকে আনা, আইনবিরুদ্ধ, বিদ্বেষমূলক ষড়যন্ত্র’। পরে অভিযোগ বেড়ে হয় স্যান্ডার্স হত্যা, বোমা নিক্ষেপ, বোমার কারখানা নির্মাণ। আসামিদের প্রথম সারিতে ভগৎ সিংহ, সুখদেব, রাজগুরু।

শুরু হয় ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’; যে মামলা চলাকালীন রাজবন্দিদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ৬৩ দিন অনশন করে প্রাণ দেন বিপ্লবী যতীন দাস। বিপ্লবীদের ফাঁসিকাঠে ঝোলানোয় ব্রিটিশের তাড়া ছিল। ভাইসরয় নির্দেশ দিলেন ‘বিশেষ ট্রাইবুনাল’-এর (লাহোর অধ্যাদেশ নম্বর ৩— ১৯৩০)। অধ্যাদেশ জারি হয় ১ মে। বিচারপতি শাদি লাল ক্ষমতা পান তিন বিচারপতি নিয়োগের। দু’জনই ইংরেজ— জে কোল্ডস্ট্রিম (প্যানেল চেয়ারম্যান) এবং হিল্টন। একমাত্র ভারতীয় বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত হন সৈয়দ আগা হায়দার। তাঁর জন্ম ১৮৭৬-এ, উত্তরপ্রদেশের সহারনপুরে, জমিদার পরিবারে। আইনজীবী হিসাবে ইলাহাবাদ কোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। ১৯২৫-এ বিচারপতি হয়ে আসেন লাহোর হাই কোর্টে।

ট্রাইবুনালের কাজ শুরু ৫ মে। ওই দিনই বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে চিঠি যায়, “আমরা প্রহসনমূলক প্রদর্শনের পার্টি হতে অস্বীকার করি এবং তাই এই কাজে যোগ দিচ্ছি না।” ১২ মে বিপ্লবীদের আদালতে আনা হয়। তাঁরা বাস থেকে নামতে চাইছিলেন না। উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘সরফরোশি কি তমান্না’ গাইছিলেন। রুষ্ট কোল্ডস্ট্রিম আদালতের মধ্যেই তাঁদের দমন করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পুলিশকে আদেশ দেন। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে ওই দিনের কার্যক্রমে বিচারপতি হায়দার স্বাক্ষর করেননি। প্রতিবাদও নথিবদ্ধ করান। লেখেন, “এই আদেশের ফলে যা কিছু ঘটেছে, আমি নিজেকে তার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখছি।” এমন অমানবিক ঘটনার পর বিপ্লবী ও তাঁদের আইনজীবীরা বিচারপ্রক্রিয়া বর্জন করেন। আইনজীবী ছাড়াই তাঁদের ‘বিচার’ চলতে থাকে। বিচার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভগৎ সিংহদের প্রাণদণ্ড দিতে ব্রিটিশরাজের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ ছিল তর্কাতীত। নিরপেক্ষতা এবং দেশপ্রেমকে একটি ভারসাম্যে এনে এই প্রহসনের বিরুদ্ধে গিয়ে পুলিশের হাজির করা সাক্ষীদের নিজেই জেরা করেন বিচারপতি হায়দার। এঁদের মধ্যে ছিলেন ‘রাজসাক্ষী’ জয় গোপাল, ফণীন্দ্রনাথ ঘোষ, হংসরাজ ভোরা, সাক্ষী মনোমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে তাঁরা বিপুল ‘পারিতোষিক’ পান।

নাটকের ক্লাইম্যাক্স ৩০ মে। ‘সাক্ষী’ রামশরণ দাস স্বীকার করে ফেলে— “এই নথি এক পুলিশ অফিসার আমাকে দিয়েছিলেন এবং মুখস্থ করতে বলেছিলেন।” বিচারপতি হায়দারের জেরায় মূল সাত ‘প্রত্যক্ষদর্শী’র ছ’জনের বয়ানই উল্টে গিয়েছিল। শেষ দিকে ব্রিটিশ সরকার বুঝে ফেলেছিল তিন প্রধান ‘অভিযুক্ত’কে বিচারপতিদের মতৈক্যের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিতে দেবেন না হায়দার। সরকার শেষ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিকে প্রত্যাখ্যান করেই হায়দার সাহেব বলেন— “আমি বিচারপতি, কসাই নই!” ‘শারীরিক কারণ’-এ তাঁকে বিচার থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ‘ইংরেজসুলভ বিচার’-এর স্বার্থে। ইস্তফা দিয়েছিলেন মাথা উঁচু রেখে। রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন পরে।

৭ অক্টোবর তিন বিপ্লবীরই ফাঁসির আদেশ হয়। ১৯৩১-র ২৩ মার্চ নির্ধারিত সময়ের ১১ ঘণ্টা আগে ফাঁসি হয়। হায়দারের মৃত্যু ১৯৪৭-র ৫ ফেব্রুয়ারি। কয়েকটা দিন বাঁচলে ‘স্বাধীন’ ভারত দেখতে পেতেন। দেশভাগ, দাঙ্গা, ধর্ম-বর্ণের নামে সহনাগরিকদের নিগৃহীত হতে দেখতেন। হয়তো ‘দেশপ্রেম’কে বিশেষ শ্রেণির মানুষের কুক্ষিগত হতে, মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে বিস্মৃত হতে দেখতেন। নইলে এই সাহসী বিচারপতির নাম আমরা জানি না কেন?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন