আশা জাগিয়ে শুরু, তার পর ক্রমাগত অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া
Government Hospitals

সব থাকা সত্ত্বেও নিঃস্ব

৩৪ বছরের বাম শাসনের শেষের দিকে অন্য একাধিক দফতরের মতো কার্যত থমকে গিয়েছিল স্বাস্থ্য পরিষেবাও। বেহাল পরিকাঠামো, অজস্র প্রকল্প মাঝপথে আটকে থাকা, দুর্নীতি, দালালরাজ, স্বজনপোষণ ইত্যাদি সামগ্রিক ভাবে পঙ্গু করে তুলেছিল গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৬:১৪
Share:

অব্যবস্থা: হাসপাতালের শূন্য পদে নিয়োগ, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদি দাবিতে নাগরিক মিছিল। অক্টোবর ২০২৩, কৃষ্ণনগর। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

যে সরকারের আমলে রাজ্যের অন্যতম নামী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অন্দরে ধর্ষিত ও খুন হন সেই হাসপাতালেরই এক চিকিৎসক, যে ঘটনার সূত্র ধরে একের পর এক সামনে এসে পড়ে দফতরের অজস্র দুর্নীতি, সামনে আসে মেডিক্যাল শিক্ষার ঘুণ-ধরা চেহারা, সেই সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই একটু থমকাতে হয় বইকি। দীর্ঘশ্বাসও ফেলতে হয়— কারণ, শুরুটা অন্য রকম ছিল।

৩৪ বছরের বাম শাসনের শেষের দিকে অন্য একাধিক দফতরের মতো কার্যত থমকে গিয়েছিল স্বাস্থ্য পরিষেবাও। বেহাল পরিকাঠামো, অজস্র প্রকল্প মাঝপথে আটকে থাকা, দুর্নীতি, দালালরাজ, স্বজনপোষণ ইত্যাদি সামগ্রিক ভাবে পঙ্গু করে তুলেছিল গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সেই অচলায়তনকে শুরুতেই অনেকটা নাড়িয়ে দেয়। স্বাস্থ্যের খোলনলচে বদলাতে সরাসরি উদ্যোগী হন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। সময়মতো আউটডোর চালু, ডাক্তারদের সময়মতো হাজিরা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে চালু করা হয় একাধিক ব্যবস্থা। শুরু হয় দালালরাজ ঠেকানোর চেষ্টাও। সে সময়ে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশই ভাবতে শুরু করেন, তাঁদের দুর্ভোগের দিন বোধ হয় ফুরাল। কিন্তু সেই ভাবনার মেয়াদ ছিল খুবই অল্প। বছর পাঁচেক কাটার আগেই বাইরের চাকচিক্য সরিয়ে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ল।

অনেকেই বলে থাকেন, পরিকাঠামোর দিক থেকে দেখতে গেলে গত ১৫ বছরে এই সরকার যা যা করেছে, তাতে পরের ১০ বছরে যারাই ক্ষমতায় থাকুক, স্বাস্থ্যে নতুন করে আর কিছু না করলেও চলবে। কিন্তু এই পরিকাঠামোর ফলাফল কী? পরিষেবার অর্থ তো শুধু মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বা হাসপাতালের শয্যা বাড়া নয়। একের পর এক সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল তৈরিও নয়। সামগ্রিক ভাবে রাজ্যের সমস্ত স্তরের মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য সরকারের থাকার কথা, সেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে এই সরকারও। গালভরা দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে কম ক্ষেত্রেই।

কলকাতায় রেফারের রোগ বন্ধ করা যায়নি। রেফার রেজিস্ট্রি তৈরি হয়েছে। অকারণ রেফার হলে ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে— কিন্তু সমস্যার উৎসে পৌঁছনোর চেষ্টা হয়নি। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা থেকে গিয়েছে কলকাতামুখী। জেলায় জেলায় চিকিৎসকদের ‘লবি’ তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়নি।

আগে জেলায় যে ডাক্তারদের পোস্টিং থাকত, তাঁরা শহরের বাসিন্দা হলে সপ্তাহে অন্তত দু’তিন দিন জেলায় তাঁদের দেখা মিলত। এখন অনেক জায়গাতেই তাঁদের অস্তিত্ব আক্ষরিক অর্থে কাগজ-কলমে। তাঁরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজের জায়গায় না গিয়েও চাকরিতে বহাল থেকে যান। জেলার হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা দামের যন্ত্র কেনা হয়। চালানোর জন্য কর্মী নিয়োগ হয় না। সরকারি টাকায় কেনা সামগ্রী, ওষুধ বাইরে বিক্রি হয় অবাধে। পদোন্নতি, নিয়োগ আটকে থাকে। বাড়তে থাকে ক্ষোভ, হতাশা। তার প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন কাজে।

প্রাক্তন স্বাস্থ্যকর্তারা জনান্তিকে বলেন, বাম আমলেও দুর্নীতি ছিল। কিন্তু তখন বোধ হয় অধিকাংশ ফাইল নড়তে এমন টাকার লেনদেন চলত না। শোনা যায়, বিভিন্ন হাসপাতালের ‘পোস্টিং’ পর্যন্ত বিক্রি হয় মোটা টাকায়। ডাক্তারি পরীক্ষার প্রশ্ন কেনা যায় টাকা ও আনুগত্যের বিনিময়ে— আর জি করের ঘটনার পরে তা কিছুটা কমলেও কবে আবার পুরনো চেহারা ফিরবে, তা নিয়ে শঙ্কিত শিক্ষক-চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ।

রাজ্যে এখনও বন্ধ হয়নি প্রসূতি মৃত্যু। প্রত্যন্ত জেলা নয়, খাস কলকাতা শহরেও সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে বহু প্রসূতির। চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, জাল স্যালাইন, ভুল ইনজেকশন প্রাণ কাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বেড়েছে, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব এতটাই যে, সেখানে পৌঁছতে গিয়েই মৃত্যু হচ্ছে অনেকের।

এ কথা ঠিক যে, বিপুল জনসংখ্যার একটা বড় অংশই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পান। বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার নীতি দরিদ্র মানুষের বড় সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যানসারের কেমোথেরাপিও যে ভাবে বিনা খরচে পাচ্ছেন অসংখ্য রোগী, তা সত্যি এক মডেল হয়ে থাকার মতো। প্রশংসনীয় ভাবে রোবটিক সার্জারি চালু হয়েছে।

কিন্তু সাধারণ চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রতা, ভর্তির একটা তারিখ পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস হাসপাতালের দরজায় ঘোরা ঠেকানো যায়নি। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের দরজা খুলেছে গরিব মানুষের জন্য। আবার এই স্বাস্থ্যসাথীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে দুর্নীতির নয়া চক্র। সরকারি হাসপাতালেই যে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার হওয়া সম্ভব, তার জন্য রোগীকে পাঠানো হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। জেলায় জেলায় অজস্র ছোটখাটো নার্সিংহোম তৈরি হয়েছে মূলত স্বাস্থ্যসাথীর ভরসাতেই।

সরকার দাবি করছে যে, সবার জন্য স্বাস্থ্যের স্লোগানকে এ রাজ্যে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে। প্রশ্ন তোলা জরুরি, সরকারি হাসপাতাল চত্বরে যে অসংখ্য রোগীর পরিজন রাতের পর রাত খোলা আকাশের নীচে কাটান, তাঁদের মানবাধিকার রক্ষা করা গিয়েছে? দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসার জন্য শহরে পড়ে থাকা গ্রামের যে দিন-আনা-দিন-খাওয়া মা-বাবার অজস্র কর্মদিবস নষ্ট হয়ে অনাহারে দিন কাটে, তাঁদের জন্য কোনও ব্যবস্থা করা গিয়েছে? ক্লাবগুলোকে মচ্ছবের টাকা দেওয়া কি এর চেয়েও বেশি জরুরি ছিল?

প্রশ্ন তোলা জরুরি, সরকারি হাসপাতালে সকলের জন্য সব ফ্রি করার কি কোনও দরকার ছিল? প্রভাব খাটিয়ে এক জন বিত্তবান কেন সরকারি পরিষেবা ফ্রি-তে পাবেন, সেই প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক। দলের প্রবীণ নেতাদের কেউ কেউ বলেন, জনপ্রিয়তা বাড়াতে গিয়ে আসলে একটা ফাঁদে পা দিয়েছেন মমতা। আর সেটাই ডোবাচ্ছে স্বাস্থ্যকে। অথচ উৎকর্ষের দিক থেকে এই রাজ্যের সরকারি হাসপাতাল এখনও সেরা। এখানে যে ভাবে কোভিড পরিস্থিতি সামলানো হয়েছে, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। কোভিড গিয়েছে, গয়ংগচ্ছ মনোভাবও ফিরেছে তার নিজের ছন্দে।

বেসরকারি হাসপাতালের খরচে লাগাম টানা যায়নি। টাউন হলে বৈঠকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রী যতই বেসরকারি হাসপাতালের কর্তাদের ধমক দেওয়ার লাইভ টেলিকাস্ট করুন, তাতে সাধারণ মানুষের কোনও উপকার হয়নি। অকারণ হাজার হাজার টাকার পরীক্ষানিরীক্ষা, দীর্ঘ হাসপাতালবাস, নানা প্রসিডিয়োরের চক্করে রোগী ও তাঁদের পরিবারের নাভিশ্বাস জারি আছে। বাজারে যে দামে পাওয়া যেতে পারে, তার কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সেই হাসপাতালেরই ফার্মাসি থেকে ওষুধ কেনা বাধ্যতামূলক করাও আটকানো যায়নি। কেন যায়নি, তার জবাব দেওয়ার দায় কারও নেই। প্রবীণ নেতারা অনেকেই মেনে নেন যে, দুর্নীতি এই আমলে সরকারি সিলমোহর পেয়েছে। তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে কাজ করার ও করানোর মানসিকতা। গত ১৫ বছরে স্বাস্থ্যে সবচেয়ে বেশি যা ধাক্কা খেয়েছে, তা হল কর্মসংস্কৃতি।

স্বাস্থ্যে অকুতোভয় একটা প্রজাতির জন্ম দিয়েছে এই সরকার। যে প্রজাতি বিশ্বাস করে যে, কোনও অনিয়মেরই শাস্তি হয় না। সব কিছু করেই পার পাওয়া যায়। এরা সংখ্যায় কম। কিন্তু এরাই ব্যবস্থাটাকে চালায়। আর, এর বাইরে যে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, তাঁরা ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’-তে বিশ্বাস করেন। তাঁরা নিজেদের কাজটা করেন, পাশাপাশি নীরবে সাক্ষী থাকেন যাবতীয় দুর্নীতিরও। কিন্তু, প্রতিবাদের পথে হাঁটেন না। আর জি করের ঘটনা তার একটা বড় প্রমাণ।

সব থেকেও যে কত দূর নিঃস্ব হওয়া যায়, এ রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন তারই এক নজির।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন