গান-রাজনীতি: জাতীয় সংসদে ‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্ক চলার সময় কলকাতার রাজপথে কংগ্রেসের মিছিল, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।
তিনি আমাদের ঋষি, তিনি আমাদের মন্ত্রকৃৎ, তিনি আমাদের মন্ত্রদ্রষ্টা, সে মন্ত্র— বন্দে মাতরম্।” (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী) এ বারের বাজেট অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে সংসদে দুই কক্ষে আলোচনার পরে নির্দিষ্ট ছিল, ‘বন্দে মাতরম্’-এর দেড়শো বছর উপলক্ষে তিন দিনের মত বিনিময়। শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সব দলের সদস্যরা অংশ নিলেন সুদীর্ঘ আলোচনায়। দক্ষিণ ভারত, বাংলা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংসদরা মূলত আঞ্চলিক ভাষায় তাঁদের বক্তব্য বললেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বাভাবিক নিয়মে সরকার পক্ষের বক্তার সংখ্যাই ছিল বেশি। তাঁরা স্বভাবতই রাষ্ট্রীয় গীত ‘বন্দে মাতরম্’-এর অঙ্গচ্ছেদের জন্য জওহরলাল নেহরুকে নির্দিষ্ট ভাবে আক্রমণ করলেন। বিরোধীরাও প্রবল যুক্তিজালে এই অভিযোগ খণ্ডন করলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, নেহরু-সুভাষচন্দ্র-মৌলানা আজাদ-নরেন্দ্র দেবের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির পরামর্শে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবক রাখার পক্ষে সুপারিশ করে। কারণ তাঁরা জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন, সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাতে নয়। এর পর বন্দে মাতরম্-বিতর্ক ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবর্তে হারিয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথের নিকটাত্মীয়া সরলাদেবীর শতগান গ্রন্থে উল্লেখ আছে, কবিগুরু ১৮৮৫ সালে ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতের প্রথম সাত লাইনে সুরারোপ করেন। জ্ঞানদাসুন্দরী দেবী সম্পাদিত ঠাকুরবাড়ির সাময়িকী বালক থেকে জানা যায়, ওই সাত লাইন গানের স্বরলিপি তৈরি করেন প্রতিভাসুন্দরী দেবী। ১৮৮৬-র ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত হল আনন্দমঠ উপন্যাসের তৃতীয় সংস্করণ। বিজ্ঞাপনে বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন, “বন্দে মাতরম্ গীতের কিয়দংশের একটি স্বরলিপি দেওয়া গেল।” ওই বছরই টাউন হলে অনুষ্ঠিত জাতীয় মহাসভার অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের সুরারোপিত ‘বন্দে মাতরম্’ গাইলেন বঙ্কিমচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
সুতরাং ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকে রবীন্দ্রনাথের সুরারোপে স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রের যে কোনও আপত্তি ছিল না তা সহজে বোঝা যায়। তাই তিনি নির্দ্বিধায় ওই গানের স্বরলিপিকে আনন্দমঠ উপন্যাসের পরিশিষ্টে সংযোজিত করেন। সাহিত্যসম্রাট নিঃসন্দেহে চেয়েছিলেন, ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীত শতকণ্ঠে উচ্চারিত হোক। তবু ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগ ‘বন্দে মাতরম্’ গান নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রবল বিতর্ক শুরু করে। তা সম্ভব হয়েছিল, যে-হেতু ওই দুই দলের বিশেষ কোনও নেতা দেশের মুক্তি আন্দোলনে কোনও অংশগ্রহণ করেনি। হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তেরঙ্গা পতাকা বা ‘বন্দে মাতরম্’ গানকে কখনও গ্রহণ করেনি। এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করে আজ দেড়শো বছর পরে তারা ‘বন্দে মাতরম্’-এর অঙ্গচ্ছেদ নিয়ে অবিরাম বৃন্দগান শুরু করলেন কেন?
একটা প্রশ্ন জরুরি। ‘জনগণমন’ সঙ্গীতেরই বা অঙ্গচ্ছেদ হল কেন? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আদেশ অনুযায়ী, প্রথম বারো পঙ্ক্তি জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে। গাইতে হবে ৫২ সেকেন্ডে। যে স্তবকগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে এই পঙ্ক্তিগুলিও ছিল: “অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন, পারসিক মুসলমান খৃস্টানী/ পূরব পশ্চিম আসে...।” জাতীয় সঙ্গীতের এই অংশ বাদ দেওয়ায় হিন্দুত্ববাদীরা নিঃসন্দেহে সে-দিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কারণ, ওই গানের মাধ্যমে কবিগুরু জাতীয় ও বিশ্বজনীন সৌভ্রাত্রের জয়গানে জনচিত্তকে উদ্বেলিত করেছিলেন। অথচ জাতীয় সঙ্গীতে সেই বাণী বাদ গেল, প্রতিবাদও হল না।
অতি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নির্দেশ জারি করেছে, জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’ সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানের শুরুতে গাইতে হবে। জাতীয় সঙ্গীত সব শেষে গাওয়া যেতে পারে। আরও নির্দেশ, ‘বন্দে মাতরম্’-এর চারটি স্তবকই গাইতে হবে, প্রায় ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডে। এই নির্দেশ দু’টি ছাড়া আর যা কিছু বলা হয়েছে তা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার নিয়মাবলির হুবহু অনুকরণ। যত দূর জানা যায়, উরুগুয়ের জাতীয় সঙ্গীতের সময় সাড়ে চার থেকে ছয় মিনিট। অবশ্য ১৫৮ স্তবকবিশিষ্ট, গ্রিসের জাতীয় সঙ্গীতের সময়সীমা প্রায় এক ঘণ্টা, যদিও তা বিশেষ গাওয়া হয় না। আরও কয়েকটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত সুদীর্ঘ হলেও তার কিছু অংশ গাইতে কোনও বাধা নেই, যেমন ‘জনগণমন’-এ নেই। ‘বন্দে মাতরম্’-এও ছিল না। জাতীয় সঙ্গীত সম্পর্কে কেন্দ্রীয় আইন আছে। জাতীয় সঙ্গীতের কোনও ধরনের অপমান করা হলে তিন বছর পর্যন্ত কারাবাস ও জরিমানার বিধান আছে। তাই ‘বন্দে মাতরম্’-এর ক্ষেত্রেও কঠোর আইন বলবৎ করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় নির্দেশ দিয়েছে, কোনও নাগরিককে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করা যাবে না। তবে যাঁরা গাইবেন না তাঁদেরও গানের সময় উঠে দাঁড়াতে হবে। এ সব নির্দেশ শোনা গেল এক দিকে, অন্য দিকে, বিজেপি-শাসিত কোনও কোনও রাজ্যের স্কুলে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক হল।
প্রশ্ন হল, দেড়শো বছর পরে কী এমন ঘটল যে রবীন্দ্রনাথ রচিত জাতীয় সঙ্গীতকে পিছনের সারিতে পাঠিয়ে দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম্’ গানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন হল? রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, সরকার বিপদে পড়েছে। পহেলগাম সন্ত্রাসী আক্রমণের পরে বজ্রনির্ঘোষে ঘোষণা হয়েছিল, এ বার প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন হামলা চালানো হবে যে সারা বিশ্ব শিহরিত হয়ে উঠবে। ‘ঘুসকে মারেঙ্গে, চুন চুন কে মারেঙ্গে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধে দেশবাসী নিঃসন্দেহে চমকিত হয়েছিলেন। কিন্তু বাহাত্তর ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সব শান্ত হয়ে পড়ল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শতাধিক বার বললেন, আমিই দুই দেশকে বাধ্য করেছি যুদ্ধ বন্ধ করতে।
হতচকিত বিদেশ মন্ত্রক, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রমুখ নির্বিকল্প সমাধিতে চলে গেলেন। শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন চিন ও ভারতের রাজধানীর রাস্তায় বারকয়েক একই গাড়িতে পাশাপাশি বসে সম্ভবত আমেরিকাকে বোঝাতে চাইলেন, চিন-রাশিয়া-ভারতের ত্রিভুজাকৃতি মিত্র শক্তি গড়ে ওঠার আর দেরি নেই। এ বার ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি: (১) ভারতকে অবিলম্বে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি বন্ধ করে ভেনেজ়ুয়েলা ও আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। (২) ভারতের বাজার আমেরিকান দুগ্ধজাত ও কৃষি পণ্যের জন্য খুলে দিতে হবে (৩) প্রতি বছর ভারতকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। এই হুঁশিয়ারি কার্যকর করতে ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ ও রাশিয়া থেকে তেল কেনার অপরাধে আরও ২৫ শতাংশ জরিমানা ঘোষণা করলেন ট্রাম্প।
পাঠক এ সব জানেন। ‘বন্দে মাতরম্’-এর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক? আছে। অন্তর্বর্তী চুক্তি রূপায়ণের প্রাক্কালে একতরফা ভাবে পেন্টাগন ঘোষণা করেছে, ভারত সব শর্তই মেনে নিয়েছে। ফলে ভারতকে মাত্র ১৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। যদিও গত বছর পর্যন্ত ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকান শুল্ক ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশ ছিল। মানে বেড়ে দাঁড়াল কমবেশি ১৪.৫ শতাংশ। তবে কি ভারত সরকার কোনও চরম বাধ্যবাধকতার মুখে এমন অসম চুক্তিতে রাজি হল! রাজধানীতে গুঞ্জন, এপস্টিন ফাইল না কী-সব বেরিয়েছে। সেখানে এক ক্ষমতাশালী অসভ্য বর্বর যৌনাচারী নরপিশাচের সঙ্গে বিশ্বখ্যাত মানুষজনের মতো ভারতের একাধিক রাজপুরুষ, শিল্পপতি, ক্রিকেটারের সংস্রবের তথ্যও নাকি উঠে এসেছে, দেশের ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি। লজ্জিত ভারতবাসীর নজর ঘোরাতেই নাকি ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে কেন্দ্রের শাসকগোষ্ঠীর এত মাতামাতি। তা ছাড়া নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলায় ‘বন্দে মাতরম্’-এর আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়া গেলে, ভালই তো।
বাঙালি বিশ্বাস রাখে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরম্পরায়। ‘হরিবোল’, ‘বন্দে মাতরম্’ ও ‘জয় হিন্দ’-এর উদ্গাতা শ্রীচৈতন্য, বঙ্কিমচন্দ্র ও নেতাজির ঐতিহাসিক মন্ত্রে। সাড়ে পাঁচশো বছর আগে শ্রীচৈতন্যের হরিবোল ধ্বনি বৈষ্ণবধর্মে অসংখ্য মানুষকে দীক্ষিত করে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ দেড়শো বছর ধরে জাতীয়তাবাদী জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে। আর নেতাজির উচ্চারিত ‘জয় হিন্দ’ ও ‘দিল্লি চলো’-র আহ্বানে ২৬ হাজার আজাদ হিন্দের সেনানী নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেন। এ ছাড়া পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত, তত পথ’ এই চারটি শব্দ বাঙালির জীবনমন্ত্র। তাঁরই শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের অনুগামীরা অদ্বৈতবাদের দর্শন বিশ্বব্যাপী আজও প্রচার করে চলেছেন।
এই বাঙালি সমাজের আঙিনায় মনুবাদীরা কখনওই প্রবেশ করতে পারবে না। যত জোরেই ‘বন্দে মাতরম্’-এর ব্যান্ড বাজানো হোক না কেন।
রাজ্যসভা সাংসদ, তৃণমূল কংগ্রেস
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে