Bangladesh

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, এখন

বলা বাহুল্য, নেপথ্যে মুচকি হাসছে ইসলামাবাদ। এই হুঙ্কারের কয়েক দিনের মধ্যেই উন্মত্ত জনতা আগুন দিয়েছে ঢাকার একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকের দফতরে। এমন দু’টি দৈনিক, যারা শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম সমালোচক, তারাও নাকি ভারতের দালাল।

সুনন্দন রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৭:০২
Share:

তারেক রহমান।

২০২৫-এর ডিসেম্বরের ১২ তারিখ। তত দিনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছেন। হঠাৎ ওই দিন গুলিবিদ্ধ হলেন ইনকিলাব মঞ্চের তরুণ নেতা শেখ ওসমান হাদি। এক সপ্তাহ পর ১৯ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যু। ২০ ডিসেম্বর হাদির জানাজা, ঢাকায় আট-দশ লাখ মানুষের জমায়েত। বাংলাদেশে ভারতের একচেটিয়া প্রভাবের বিরোধী মুখ হাদি। ছিলেন ২০২৪-এর জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সরকার-বিরোধী, ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক। তাঁর জানাজায় আকাশ-বাতাস কাঁপানো ইনকিলাবি হুঙ্কার। নেতা বলছেন, “গুলামি না আজাদি?” জনতা বলছে, “আজাদি, আজাদি।” নেতা বলছেন, “দিল্লি না ঢাকা?” জনতা বলছে, “ঢাকা, ঢাকা।”

বলা বাহুল্য, নেপথ্যে মুচকি হাসছে ইসলামাবাদ। এই হুঙ্কারের কয়েক দিনের মধ্যেই উন্মত্ত জনতা আগুন দিয়েছে ঢাকার একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকের দফতরে। এমন দু’টি দৈনিক, যারা শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম সমালোচক, তারাও নাকি ভারতের দালাল। কোনও এক অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলি হেলনে তছনছ হয়েছে রবীন্দ্রভাবনায় উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ ছায়ানট-এর কার্যালয়। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ গণতন্ত্রের দিকে যাবে, না কি মব-তন্ত্র কায়েম হবে বোঝা যাচ্ছিল না।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আর একটি মৃত্যু আর একটি জানাজা ইনকিলাবি মব-তন্ত্রকে ভোঁতা করে দিল। চলে গেলেন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। আরও এক জানাজা। এ বার আর মানুষের মাথা গোনা প্রায় অসম্ভব। স্যাটেলাইট টেকনোলজির দৌলতে আন্দাজ কুড়ি লাখ মানুষের শ্রদ্ধা ভালবাসায় ঢাকা তথা বাংলাদেশ হৃদয়ে ধরে রাখল বেগম জিয়াকে।

মায়ের মৃত্যুর অল্প আগে, দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে ইংল্যান্ডে প্রবাসে থাকা খালেদা-পুত্র দেশে ফিরেছেন ২৫ ডিসেম্বর। মায়ের শূন্যস্থান পূরণে জোরকদমে এগোলেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-র হাল ধরলেন নিমেষে। মির্জা ফখরুল, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু চৌধুরীদের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের পাশে নিয়ে তারেক চষে ফেললেন বাংলাদেশ। জেলায় জেলায়, শহরে, গঞ্জে তারেককে দেখতে, তারেকের কথা শুনতে জনতার ঢল। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’-এর আদলে তারেক সেই জনতাকে বললেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’।

ভোট হয়ে গেল ১২ ফেব্রুয়ারি, ফলাফল এত দিনে জানা। মোটের উপরে শান্তিতে এবং অনেকটাই নির্ভয়ে মানুষ ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী শাসনকালে ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বস্তুত ২০০৮-এর পর এই প্রথম ভোট দিলেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মসনদে তারেক রহমান ও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেকের পথ মসৃণ না-হতেই পারে। এক, বিএনপি’র মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকট। দুই, তারেক প্ল্যানের কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থনীতি থমকে আছে। বস্ত্রশিল্প-সহ বেশ কয়েকটি রফতানি-নির্ভর শিল্প বেকায়দায়। হাসিনার সময়ে গণতন্ত্রে ঘাটতি থাকলেও দেশের অর্থনীতি সচল ছিল। ইউনূসের দেড় বছরে অর্থনীতি বিপর্যস্ত, দেশের আইনশৃঙ্খলা তলানিতে ঠেকেছে।

তিন, জামায়াতে তারেককে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেবে না। জামায়াতেকে ঠেকাতে হাসিনাকে বাদ রেখে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে নামার সুযোগ হয়তো তারেক তথা বিএনপি দেবেন। এক দিকে জামায়াতে অন্য দিকে আওয়ামী তারেকের প্ল্যানকে ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

চার, তারেক ৩২ দফা প্ল্যানের কথা বললেও ও-দেশের রাজনীতিতে ৩৩ নম্বর দফা আছে— ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। সে দেশে আওয়ামী লীগকে দেখা হয় ভারতপন্থী হিসেবে। তারেককে সাবধানে এই ট্রাপিজ়ের খেলাটা খেলতে হবে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ঢাকার পক্ষে একান্ত প্রয়োজন, অথচ জামায়াতে বা ছাত্রযুব-চালিত ন্যাশনাল সিটিজ়েনস পার্টি (এনসিপি) সুযোগ পেলেই বলবে, বিএনপি দিল্লির কাছে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছে।

আর ভারত? বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সব সময়ই বলেন যে, ভারতের বিদেশনীতির কেন্দ্রে ভারতের স্বার্থ। তা হলে সেই নিয়মে বাংলাদেশের বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও ভারতের একই যুক্তি মেনে নিয়ে চললে ভাল হয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে মজবুত করতে হলে ভারতকে অনেক সংবেদনশীল হতে হবে। কথায় কথায় ‘বাংলাদেশি’, ‘বিদেশি’, ‘বহিরাগত’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ এমন শব্দ ব্যবহারে সংযত হতে হবে। তারেক রহমানের হাত শক্তিশালী হলে ভারত হয়তো বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী-সংখ্যালঘুর প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে পারবে। বাংলাদেশের ভিতরে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব একটি ছোট অংশের মধ্যে আছে এবং থাকবে। কিন্তু ব্যাপক ভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব যাতে তৈরি না হয়, তা দেখতে হবে।

হাদির জানাজায় ওঠা ইনকিলাবি আওয়াজ “দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা!” এখন বিএনপি-র ভোটপ্লাবনে স্তিমিত। কিন্তু এমন ভাবার কারণ নেই যে, তা ফিরবে না। দিল্লি ভেবে দেখতে পারে, এমতাবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মহলকে সঙ্গী করে এগোনো ভাল কি না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন