Quota System

বন্ধ দরজা

সংরক্ষণ নীতি প্রয়োগের পর এতগুলি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও প্রশাসনের উচ্চ স্তরে পৌঁছতে বাধার সম্মুখীন অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত মানুষ। ভারতীয় শিক্ষা-পরিকাঠামোগত ত্রুটিতেই এই সমস্যার শিকড়।

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৩
Share:

সরকারি আমলার শীর্ষ চাকরিগুলিতে (আইএএস, আইপিএস ও আইএফএস) তফসিলি জাতি, জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বিষয়ক একটি প্রশ্ন রাজ্যসভায় উত্থাপিত হয়েছিল। প্রশাসন তার স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। বরং, এই চাকরিগুলিতে কত পদ রয়েছে এবং গত চার বছরে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী থেকে কত জনকে ক্ষেত্রগুলিতে নিয়োগ করা হয়েছে তার তথ্যপঞ্জি দেওয়া হয়েছে। প্রণিধানযোগ্য, এই চাকরিক্ষেত্রে অসংরক্ষিত শ্রেণি থেকে কত জনকে নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশাসন নিরুত্তর। অর্থাৎ, এই শীর্ষ পরিষেবায় সামাজিক শ্রেণিগুলির প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে আংশিক চিত্র মিলছে। সংরক্ষণের হিসাব মেনে নিয়োগ হয়েছে কি না, সরকার সে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছে। কারণ, অনুমান কঠিন নয়, সাধারণ শ্রেণির চাকুরেরা এখনও এ সব ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটু ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সব পরিষেবায় শূন্য পদের সংখ্যাও লক্ষণীয় ভাবে বেশি। সাম্প্রতিক নিয়োগে উদ্দীষ্ট শ্রেণিগুলির প্রতিনিধিত্বও তাঁদের জনসংখ্যাগত অংশীদারি তুলনায় নেহাতই অপ্রতুল।

অর্থাৎ, সংরক্ষণ নীতি প্রয়োগের পর এতগুলি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও প্রশাসনের উচ্চ স্তরে পৌঁছতে বাধার সম্মুখীন অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত মানুষ। ভারতীয় শিক্ষা-পরিকাঠামোগত ত্রুটিতেই এই সমস্যার শিকড়। আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণির মধ্যে এই পরিবারগুলির পক্ষে সিভিল সার্ভিসের মতো পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়ার সময়, আর্থিক সঙ্গতি ও সহায়তা সহজলভ্য নয়। বিভাজন সৃষ্টি করছে এই পরীক্ষাগুলির কাঠামোও। এখানে সাফল্য পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম অনুসরণই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পড়ে ব্যয়বহুল, শহরকেন্দ্রিক কোচিং ক্লাসের দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ প্রশিক্ষণের। আইআইটি-সমেত বহু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাই সাক্ষী, কেবল আসন সংরক্ষণ করেই সমতা রক্ষার দায় মেটে না। উন্নত গুণমানের স্কুলশিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, ভাষাগত কুশলতা, ডিজিটাল পরিকাঠামোর অভাবে বহু ছাত্র দৌড় শুরুর আগেই পিছিয়ে পড়েন। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এই অসাম্যের পরিণতিতেই এঁরা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রবেশদুয়ার পর্যন্তই পৌঁছতে পেরে উঠছেন না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষার এ-হেন বৈষম্য কোনও মতে মেনে নেওয়া যায় না।

রাষ্ট্রের ন্যায়সঙ্গত পরিচালনে এই পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনে তাঁদের পর্যাপ্ত মুখপাত্র না থাকলে সিদ্ধান্তগ্রহণের সময় প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা উপেক্ষিত হতে পারে। এতে উন্নয়ন একপেশে ও অসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থকে কেন্দ্র করে নীতি প্রণয়নের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। রাষ্ট্রের পক্ষেও সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরির নীতি লঙ্ঘিত হয় যা কার্যত অসাংবিধানিক। ঘটনা হল, প্রশাসনে অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বও কম। উচ্চপদে নারীদের উপস্থিতিও নগণ্য, পুলিশবাহিনীতে মহিলাকর্মী মাত্র ১১-১২ শতাংশ, শীর্ষস্তরে তো তাঁরা বিরল। প্রশাসনে, বিচারব্যবস্থায়, আইন রক্ষার কাজে নারী ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এমন সীমিত হলে অসাম্যেরই ভিত প্রস্তুত হয়। প্রমাণ করে, ক্ষমতার অলিন্দে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ কত সীমিত। এ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। শিক্ষাদান ও পরীক্ষাপদ্ধতির আমূল সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধার সমবণ্টন আবশ্যিক। প্রশ্ন হল, কী ভাবে তা সম্ভব।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন