নীল রঙের কাঁচা ইটের খিলানের নীচে হলুদ জমিতে কালো অক্ষরে লেখা ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয়। গঙ্গামুক্তি আন্দোলন। কাগজিটোলা, কহলগাঁও। ভাগলপুর’। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন এই দরজাটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম, আরও মানুষ ছিলেন সঙ্গে। জেলেদের, যাঁদের এখানে বলে ‘মছুয়ারা’, তাঁদের মেয়েরা দেখাচ্ছিলেন, “এটা ছিল জমিদারের কাছারিবাড়ি। ওই ভিতরের উঠোনে থামের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে আমাদের ঘরের পুরুষদের মারত ওদের গুন্ডারা। আমরা দরজার বাইরে মাটিতে পড়ে কাঁদতাম। সাহস ছিল না যে ভিতরে যাই। ওরা যে দাদন দিত, তার দামে ওদের মনমতো মাছ না দিতে পারলে মার খেতে হত, জাল কেড়ে নিত। মাছ দেব কী করে, গঙ্গায় তো মাছ নেই। ফরাক্কা বনল আর মাছ ওঠা বন্ধ হল।” সংগঠনের প্রেসিডেন্ট শান্তিদেবী বলেন, ’৯১ সালে যখন তাঁরা এই কাছারি দখল করতে আসেন, গুলি করলেও পালাবে না, এ রকম একশো ভলান্টিয়ার এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সত্তর জন মেয়ে।
১৯৮৯ সালে ভাগলপুরে গিয়ে যোগাযোগ হয় গঙ্গামুক্তি আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে। অবাক হয়ে শুনেছিলাম কলকাতা থেকে মাত্র এক রাতের দূরত্বে দশ বছর ধরে চলতে থাকা এক অবিশ্বাস্য জন আন্দোলনের কাহিনি। ভাগলপুরের কাছ থেকে সাহেবগঞ্জ পর্যন্ত গঙ্গার চল্লিশ মাইল জায়গায় মাছ ধরতে হলে জেলেদের দুই পারের দুই ভূস্বামীকে খাজনা দিতে হত। স্বাধীনতার পর ১৯৫৩ সালে যখন আইন করে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হল, ভাগলপুর কহলগাঁও এলাকার ওই গঙ্গাদখল ব্যবস্থা তখনও বহাল রয়ে যায় এই যুক্তিতে যে, “এ তো জমিদারি নয়, পানিদারি।” গঙ্গা থেকে মাছ ধরে তা পানিদারদের গুন্ডাদের হাতে তুলে দিতে হত তাদের হিসেব করা দাম মেনে নিয়ে। চল্লিশ মাইল গঙ্গাতীরে থাকা গ্রামগুলোকে যে মাছ ঠিকাদারকে দিতে হত, তার দাম প্রায় আট কোটি টাকা। তবু কোনও মতে দিন চলছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সাল থেকে ফরাক্কার কারণে নদীর উজানে মাছ ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। যে ইলিশ চিতল মহাশোলের মতো দামি মাছ বর্ষায় উজান বেয়ে ঠান্ডা জলে প্রায় হরিদ্বার পর্যন্ত যেত ডিম পাড়তে, ফরাক্কার পাঁচিলে বাধা পেয়ে সে সব মাছ আর ব্যারাজের উজানে পাওয়া যায় না। আগে বর্ষাকালে জেলেরা ছোট বড় নৌকা নিয়ে চলে আসতেন গঙ্গাসাগর পর্যন্ত, নৌকা ভরে নদীর রুপোর ফসল নিয়ে ফিরতেন দাদন শোধ করতে, সেই পথও বন্ধ। ফলে অভাব অনাহার ঘটিবাটি বেচে দেওয়া নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠছিল জেলেদের। তার পরও বাড়ছিল জাল কেড়ে নেওয়া, সামান্য কারণে বেঁধে মারা। মেয়েদের গণধর্ষণ করে মৃতদেহ গঙ্গায় ফেলে দেওয়া। সত্তরের দশকের শেষ থেকে জেলে সমাজের ক্ষোভ বাড়ছিল।
১৯৮২-র ফেব্রুয়ারি থেকে গঙ্গাতীরের এই জেলেরা আন্দোলনে নামেন। তাঁরা দাদন নেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কহলগাঁওয়ের কাছে গঙ্গার একটি বাঁকের উপর কাগজিটোলা, অরিয়োপ ও বটেশ্বর থান নামে তিনটি জেলে গ্রাম থেকে নৌকা নিয়ে মছুয়ারা বাকি গ্রামগুলোয় প্রচার শুরু করেন। শহরের কিছু তরুণ নাট্যকর্মী এঁদের সঙ্গে থাকেন। এঁদের মধ্যে জয়প্রকাশ নারায়ণের সময়কার আন্দোলনের অনুগামীরাও ছিলেন কয়েক জন।
এই ‘করবন্দি’ করার ডাক দেওয়ার ফলে ঠিকাদারদের পাইক লেঠেল এবং পানিদারদের স্বার্থ রক্ষাকারী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহল সজাগ হয়। নদীতীরের অন্য ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীগুলিও ক্রমশ যোগ দিতে থাকে। এদের মধ্যে ছিল কাছাকাছি জগদীশপুর ডিস্টিলারি, মোকামায় বাটা কোম্পানির কাঁচা চামড়া পরিষ্কারের ব্যবস্থায় তীব্র জলদূষণের শিকার দরিদ্র মানুষজন। ধীরে ধীরে বড় সংখ্যক মেয়েরা যোগ দেওয়ার পর আন্দোলনের একটা গুণগত পরিবর্তন হয়। যেমন, গুন্ডারা নদী থেকে কয়েক জন জেলের জাল কেড়ে নিয়ে যাওয়ার পর মহিলারা নৌকা করে সেই ভূস্বামীর বাড়ি চলে যান এবং ঘেরাও করে বসে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সেই জাল উদ্ধার করে আনতে সক্ষম হন তাঁরা। বরাবরের মার-খাওয়াদের এই মরিয়া সাহসের ঘটনা ঘটে চলে দশ বছর ধরে।
আধুনিক বিহারের সামাজিক ইতিহাসে সত্তর-আশির দশকের ‘বোধগয়া আন্দোলন’ ও ‘গঙ্গামুক্তি আন্দোলন’ প্রায় মহাকাব্যের মর্যাদা পায়। লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে সমাজে মেয়েদের মর্যাদার ক্ষেত্রে। প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বন্ধ হয়ে যায় চোলাইয়ের নেশা আর মেয়েদের গায়ে হাত তোলা। একাধিক বার দেখেছি, ভোররাতে পুলিশ কোনও ছুতোয় কাউকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছে, খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র সব বয়সের মেয়েরা চলে গিয়েছেন থানা ঘেরাও করতে। আন্দোলনের কমিটিতে হিসেব রাখা ও টাকা দেওয়ার দায়িত্বে থাকতেন দু’জন মহিলা। স্পষ্টই বলা হত— “মরদলোগ ফিজুল খরচি বহোত করতে হ্যায়।” ১৯৮২ সালের বিজয়ের পরে লড়াইয়ের তখনকার প্রেসিডেন্ট সত্তর পার শান্তিদেবী বলেছিলেন কী ভাবে তাঁরা নিজেরা ডাক দেন প্রথমে উল্লিখিত কাছারিটি দখল করার। উল্লেখযোগ্য যে, যদিও আন্দোলন শুরু হয়েছিল জেলেদের দাদন না-নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে। কিন্তু তার নাম হয় ‘গঙ্গামুক্তি আন্দোলন’। কারণ, শুধু দীর্ঘস্থায়িত্ব বা জেলেদের জেদ নয়, সমাজের নীচে পড়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ। ১৯৯২ সালে বিহার হাই কোর্টের অধ্যাদেশের বিজয় উৎসবে পটনার গান্ধী ময়দানে উপস্থিত আন্দোলনের নেতারা ঘোষণা করেন, “আজ এখানে আমরা যে এক লক্ষ মানুষ আছি, মনে রাখবেন আরও এক লক্ষের বেশি সঙ্গী আজ এখানে আসতে পারেননি। তাঁরা আমাদের মেয়েরা।” সামাজিক আন্দোলনে কী ভাবে মুছে যায় বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গবৈষম্য— গঙ্গামুক্তি আন্দোলন তার উদাহরণ। একে হয়তো ভারতের প্রথম পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন বলা যায়। ১৯৯২ সালে বিহার হাই কোর্ট রায় দেয়, বিহারের কোনও জলপথ বা জলক্ষেত্রে মাছ ধরতে কোনও বংশানুক্রমিক জেলেকে খাজনা দিতে হবে না।
যদিও তত দিনে গঙ্গায় মাছ আরও দুষ্প্রাপ্য এবং ফরাক্কা তীরের মানুষদের বসবাস আরও বিপন্ন হয়ে উঠেছিল।
এই বছর ২১-২২ ফেব্রুয়ারি, গঙ্গামুক্তির উৎসব স্মরণের দিনে এই আন্দোলনের কর্মী ও সঙ্গীরা আবার মিলিত হলেন ভাগলপুরে। বিক্ষুব্ধ তাঁরা দেখলেন, দেশের যে অছি পরিষদের উপর ঘোষিত দায়িত্ব থাকে দেশের সম্পদসমূহ রক্ষা ও বৃদ্ধি করার, তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অকৃতকার্য। গঙ্গা সিন্ধু গোদাবরী-সহ এই দেশের প্রতিটি নদী আজ আরও অনেক বেশি বিপন্ন। অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নদী-নির্ভর দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, মানুষের জীবিকা ও জীবন। ১৯৯২ সালে গঙ্গা-সহ অন্য সমস্ত জলক্ষেত্রে মাছ ধরার কর প্রত্যাহার করার এক বছর আগেই ঠিক ওই এলাকাটিকে গাঙ্গেয় শুশুকদের অভয়াঞ্চল করে রাখা হয়েছে।
গত দশ বছর ধরে সেইখানে জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বেআইনি বলে ধরা হচ্ছে। শুশুকদের অভয়াঞ্চল রক্ষার স্বার্থে জল নাড়ানো বা সেখানে অন্য কোনও কাজ নিষিদ্ধ। চিরকাল নদীতে মাছ ধরাই যাঁদের জীবিকা, সেই মানুষরা যখন জানতে চান দুই পাশের খেত থেকে জলে নেমে আসা কীটনাশক বা রাসায়নিক সারের দূষণ বন্ধের উপায় কী, ওইটুকু এলাকার মধ্যে অন্তত সাতাশটি ছোটবড় জনপদের পুর আবর্জনা সরাসরি নদীতে এসে পড়ার প্রতিবিধান কী— উত্তর আসেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি সারা দিন সভা, বিকালে নৌকাযাত্রার পর, সন্ধ্যায় মেয়েদের প্রদীপ ভাসানোর আগে নদীর তীরে বসে বসে আমরা দেখছিলাম কহলগাঁও থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট-এর ছাই অবাধে ভেসে যাচ্ছে নদীর উপর দিয়ে শ্লথ ধারায়। এই দূষিত ধারাটির মধ্যিখানে হঠাৎ গাঙ্গেয় শুশুকদের অভয়াঞ্চলের যুক্তি কী— এ প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
মণিপুরের অপূর্ব প্রাণী সেই নাচুনে হরিণদের জন্য বহু সমারোহে ঘোষিত ও পোষিত একটি জলমধ্যস্থ অভয়াঞ্চল ছিল। ২০০৩ সাল থেকে লোকটাক হ্রদের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ঝোপঝাড়ে ভরা সেই কাইবুললামজাও সম্পর্কে কোনও কথা জিজ্ঞেস করা সোনার কেল্লা-য় ফেলুদার নির্দেশমতো উট সম্পর্কে প্রশ্ন করার চেয়েও নিষিদ্ধ।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে