Unemployment in Bengal

পশ্চিমবঙ্গের যা চাই

কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়— এই প্রত্যাশা অমূলক নয়।

স্বর্ণদীপ হোমরায়

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ ০৮:৩০
Share:

বা‌ংলার রাজনৈতিক পালাবদলকে ঘিরে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— এই পরিবর্তনের প্রভাব রাজ্যের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের উপরে কী হতে চলেছে? পশ্চিমবঙ্গ এক সময় দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে ছিল। ১৯৬০-এর দশকে রাজ্যের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের উপরে ছিল। আজ তা জাতীয় গড়ের প্রায় দশ শতাংশ নীচে। সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের যে অবক্ষয় বাম আমলে শুরু হয়েছিল, তৃণমূল আমলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্কোচন। ফলে আজ পশ্চিমবঙ্গে চাকরির জোগান যেমন সীমিত, তেমনই উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের চাহিদাও দুর্বল। যে যুবসমাজ প্রথম বার ভোট দিয়েছে, তাদের বড় অংশ অচিরেই অন্য রাজ্য বা বিদেশে কাজের খোঁজে চলে যাবে। অন্য রাজ্যের প্রশিক্ষিত মানবসম্পদও আর পশ্চিমবঙ্গমুখী হচ্ছে না।

কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়— এই প্রত্যাশা অমূলক নয়। কিন্তু ছয় দশকের শিল্প অবক্ষয় পাঁচ বছরে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। অনেকেই আশা করছেন, গুজরাত বা মহারাষ্ট্রের ধাঁচে পশ্চিমবঙ্গেও নতুন করে ভারী শিল্পের বিস্তার ঘটবে, এবং সেই পথ ধরে বৃহৎ কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক শিল্প মানচিত্রে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলির পক্ষে পুরনো শিল্পক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। প্রচলিত ভারী শিল্পে প্রবেশ করতে বিপুল প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, অথচ প্রথম দিকের মুনাফার হার তুলনামূলক ভাবে কম। ফলে শিল্পপতিরা সেই ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন না। তাই পুরনো শিল্প ফিরিয়ে আনার রোম্যান্টিকতার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হল— পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিল্পভিত্তিকে নতুন শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তার বহু উদাহরণ রয়েছে। সোভিয়েট-পরবর্তী এস্টোনিয়া ডিজিটাল পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ করে নিজেদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। কোস্টারিকা চিকিৎসা-সরঞ্জাম শিল্পে জোর দিয়েছে। হায়দরাবাদের ‘জিনোম ভ্যালি’ তৈরি হয়েছে বায়োটেকনোলজি-নির্ভর নতুন শিল্পনীতির ভিত্তিতে। অর্থাৎ শিল্পোন্নয়নের নতুন পথ অনেক সময় পুরনো শিল্পের পুনরাবৃত্তিতে নয়, বরং উদীয়মান খাতের উপরে নির্ভর করে।

পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে এক সঙ্গে একাধিক স্তরে কাজ করতে হবে। এক দিকে নতুন চাকরি তৈরি করতে হবে, অন্য দিকে অসংগঠিত ক্ষেত্রকে সংগঠিত উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি বা নিম্ন-উৎপাদনশীল স্বনিযুক্ত কাজ থেকে শ্রম ও বিনিয়োগকে আরও উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এই সব প্রক্রিয়ার সময়রেখা এক নয়। নতুন শিল্প গড়ে তুলে বৃহৎ কর্মসংস্থান তৈরি করতে সময় লাগবে। ফলে প্রথম পাঁচ বছরে বিপুল চাকরি সৃষ্টির প্রত্যাশা অবাস্তব। এই কারণেই কয়েকটি প্রতীকী শিল্পপ্রকল্প দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল— যেখানে প্রথমে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, পরে ধীরে ধীরে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত গড়ে উঠবে।

দ্রুত কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বস্ত্র ও পোশাকশিল্পে। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই এই শিল্পের একটি বিস্তৃত ভিত্তি রয়েছে, যদিও তার বড় অংশ অসংগঠিত। চতুর্থ হ্যান্ডলুম শুমারি অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৬.৩৯ লক্ষ হ্যান্ডলুম শ্রমিক রয়েছেন। শহরাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা শ্রমিক পোশাক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দর্জির কাজ এবং ছোট আকারের অসংগঠিত পোশাক উৎপাদন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এখানে সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চিনের সঙ্গে পশ্চিমি বিশ্বের বাণিজ্যিক টানাপড়েনের ফলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার চাহিদা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ যদি সংগঠিত ও রফতানিমুখী বস্ত্রশিল্প গড়ে তুলতে পারে, তা হলে শুধু মূল শিল্পেই নয়, প্যাকেজিং, পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে।

কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। চাল, মাছ, আনাজ ও দুধ উৎপাদনে বাংলা জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু কাঁচামাল উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজারে রাজ্যের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। অন্য দিকে, ভারতের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানির বার্ষিক বৃদ্ধির হার ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে। ফলে মাছ, ফল, দুধ বা চাল-ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলায় ক্ষুদ্র কৃষিকে ঘিরে তীব্র আবেগ থাকলেও বাস্তব হল— নিম্ন-উৎপাদনশীল কৃষির আধুনিকীকরণ ও বাজারমুখী রূপান্তর ছাড়া বৃহত্তর আর্থিক উন্নতি অসম্ভব।

উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। এর প্রাথমিক শর্ত হল শিক্ষাক্ষেত্রকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক উদ্ভাবনী অর্থনীতি সবচেয়ে সফল উন্নয়ন মডেলগুলির একটি। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিকে ঘিরে সিলিকন ভ্যালির বিকাশ, নেদারল্যান্ডস-এর এইন্ডহোভেন অঞ্চলে প্রযুক্তি-শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ফিলিপস ও এএসএমএল-এর উত্থান, কিংবা চিন ও তাইওয়ানে উচ্চশিক্ষা ও শিল্পের সমন্বিত বিকাশ— সব ক্ষেত্রেই শিক্ষা ও উদ্ভাবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গে উচ্চমানের স্নাতকোত্তর শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের ঘিরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। অথচ এখানেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্যে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যপরিকাঠামো এবং প্রযুক্তি শিক্ষার একটি ভিত্তি আছে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি শিল্পে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

একই ভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক সক্ষমতা রয়েছে। ভারী সামরিক উৎপাদনে অন্য রাজ্য এগিয়ে থাকলেও, কাশীপুর, ইছাপুর বা দমদমকে ঘিরে গোলাবারুদ-রসায়ন, ক্ষুদ্র অস্ত্রের ধাতুবিদ্যা এবং প্রপেল্যান্ট এঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে পরিকাঠামো ও দক্ষতা তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ভারত এখন প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে এগোতে চাইছে। এর জন্য শুধু অস্ত্র উৎপাদন নয়, উন্নত সামরিক প্রযুক্তিরও প্রয়োজন। সাহা ইনস্টিটিউট, আইএসআই বা আইআইটি-র মতো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, সাইবার সুরক্ষা বা সমুদ্রতলীয় যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ভবিষ্যতে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে।

তবে কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকেও নতুন ভাবে ভাবতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের কর-রাজস্বের হার তুলনামূলক ভাবে কম, অথচ ঋণের বোঝা অত্যন্ত বেশি। এই পরিস্থিতিতে সর্বজনীন ভর্তুকি এবং লক্ষ্যহীন নগদ সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না। রাজনৈতিক ভাবে এই ধরনের প্রকল্প জনপ্রিয় হলেও, অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের পুনর্গঠন জরুরি। উদাহরণ হিসেবে অন্নপূর্ণার ভান্ডারের মতো প্রকল্পকে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা বজায় রেখেই দক্ষতা প্রশিক্ষণ বা যাচাইযোগ্য কর্মসংস্থানের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রণোদনা জুড়ে দেওয়া সম্ভব। এতে সামাজিক সুরক্ষা এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

রাজ্যে শুধু চাকরি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; দক্ষ মানবসম্পদকে আকর্ষণ করাও সমান জরুরি। আজকের অর্থনীতিতে শুধু রাস্তা বা স্কুল নয়, শহরের বাসযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক অর্থনীতির পাশাপাশি দরকার উন্নত গণপরিবহণ, সবুজায়ন, তাপমাত্রা-সহনশীল নগর পরিকাঠামো এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক পরিবেশ। সবচেয়ে বড় কথা, পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি বদলানো দরকার— যাতে এ রাজ্যের যুবসমাজ যেমন এখানে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, তেমনই অন্য রাজ্যের দক্ষ কর্মীরাও এখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। তার জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার উপর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দীর্ঘ দিন ধরে বঙ্গ রাজনীতিতে দল ও প্রশাসনের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়েছে। নতুন সরকারের দলগত মতাদর্শ যাই হোক, প্রশাসনিক স্তরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো না গেলে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট-রাজ এবং সর্ব স্তরের রাজনৈতিকীকরণ কর্মসংস্থানের পথে অন্তরায় হয়েই থাকবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন