গণতন্ত্রী: রাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল, বালুরঘাট, ২৪ মার্চ
ফেডারালিজ়ম হল ‘ভারতীয় সংবিধানের আত্মাস্বরূপ’। কেন্দ্র সেটাকে ভাঙতে চাইলে তা হবে ‘সুলতান-তন্ত্র’ (‘সালতানেট’)। কী ভাবে কেন্দ্রীয় শাসক এমন প্রতিষ্ঠান বানাতে পারে, যা দেশের সংসদের কাছে দায়বদ্ধ (‘অ্যাকাউন্টেবল’) নয়? যা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয়তার পরিপন্থী? যা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা দখলকারী?— “ইট ইজ় অ্যান অ্যাসল্ট অন ফেডারাল স্ট্রাকচার, হুইচ গিভস দ্য রাইট টু কনট্রোল ল অ্যান্ড অর্ডার ইন দ্য স্টেটস!”
না, জওহরলাল নেহরুর কথা নয়। রাহুল গান্ধী বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও নয়। কথাগুলো নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীর মুখনিঃসৃত, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন। উক্তিগুলির অধিকাংশই ২০১২ সালের ৫ মার্চে ইন্দোরের একটি বক্তৃতা থেকে নেওয়া, তবে বারংবার, বহু বার মোদী প্রবল আক্রমণ শাণিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজ্য প্রশাসনে হস্তক্ষেপ নিয়ে। বলেছেন ‘কম্পিটিটিভ-কোঅপারেটিভ ফেডারালিজ়ম’-এর কথা, রাজ্যের স্বশাসনের মাত্রা বাড়ানোর কথা। তাঁর দলও বলেছে, দশকের পর দশক। ১৯৮৭ সালে রাজীব গান্ধীর আমলে সারকারিয়া কমিশন যখন কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বের কথা তুলেছিল, বিজেপি ছিল তার একনিষ্ঠ সমর্থক। ১৯৯৯-২০০৪’এর বাজপেয়ী সরকার বহু বার কেন্দ্র ও রাজ্যের দ্বিস্তরীয় শাসনব্যবস্থার কথা বলেছিল— যার উপর ভিত্তি করে তখন গুজরাতপতি মোদী তাঁর রাজ্যপাট সাজিয়েছিলেন।
আর তাই, সুপ্রিম কোর্টে সে দিন মহামান্য বিচারপতি যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বলছিলেন, “আপনারা যদি কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকতেন, কী করতেন তা হলে?” তখন ভাবছিলাম, আচ্ছা, কেন্দ্রে যদি ভিন্ন দল থাকত, আর নরেন্দ্র মোদী থাকতেন পশ্চিমবঙ্গের শাসক হয়ে, কী বলতেন মোদী? এই যে ভোট ঘোষণামাত্রই রাজ্যে কর্মরত গাদা গাদা প্রশাসনিক শীর্ষকর্তা, আধিকারিক, পুলিশ কর্তাকে একটানে সরিয়ে দেওয়া হল, রাজ্য প্রশাসনকে পঙ্গু করে দিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম হল— কী বলতেন ‘বিজেপি মাননীয়’, রাজ্যের শীর্ষে থাকলে?
এই যে বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গকে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর চাদরে— প্রায় কাশ্মীরের মতোই— যেন দুয়ারে যুদ্ধ, কিংবা উপত্যকায় জঙ্গি— এ সব যদি গুজরাতে বিজেপি সরকারের সঙ্গে করত কংগ্রেসশাসিত দিল্লি? ২০০২ সালের দেশকাঁপানো সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞ দেখার পর ২০০৪ সালে যদি কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোট করাত গুজরাতে? এই যে একের পর এক রাজ্যপালের আবির্ভাব যাঁরা প্রকাশ্যতই কেন্দ্রীয় শাসকের প্রতিনিধি, কিংবা এমন নির্বাচন কমিশনার যিনি সব সাংবিধানিক তকমা উড়িয়ে দলীয় মুখপাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ— আজ রাজ্যের ক্ষমতাসনে থাকলে মোদীজি কি বলতেন না ‘অ্যান অ্যাসল্ট অন ফেডারাল স্ট্রাকচার?’
কিংবা এই যে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় দেখা গেল পদ্মছাপ— ‘ক্লারিক্যাল এরর’, ‘অ্যাক্সিডেন্ট’, অবশ্যই। তবে এই ‘এরর’ এটুকু বুঝিয়ে দেয় যে, একই অফিসে পদ্মছাপ দেওয়া ও না-দেওয়া দু’টি কাজই পাশাপাশি চলতে পারে বলেই এমন ঘটল। কী বলতেন আগেকার মোদী, এই দেখে?
আর এখন কী বলছেন তিনি, তাঁরা? বলছেন, কেন পশ্চিমবঙ্গেই এত কিছু হচ্ছে? মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট চত্বরেও শোনা গেল একই প্রশ্ন— কেন পশ্চিমবঙ্গেই...? অথচ উত্তরটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কাছে নেই, কেন্দ্রের কাছেই আছে। পশ্চিমবঙ্গই আজ ঘুরে কেন্দ্রকে প্রশ্ন করুক— কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গ?
কেন সারা দেশে এসআইআর, কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিজমুখে ঘোষণা খণ্ডন করে এক কোটি কুড়ি লাখ ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নামক খুড়োর কলে ফেলে লাইনে দাঁড় করানো হল— যাঁদের ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে সংযোগ ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত? কেন নির্বাচন কমিশন জানত না যে, বাঙালি নাম-পদবিতে গরমিল বেশি, ব্যানার্জি-চ্যাটার্জি থেকে শুরু করে সমস্ত জাত-জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে, মুসলমানদের মধ্যে তো অবশ্যই। মহিলাদের পদবিও পাল্টে যায় বিয়ের পর। কেন তা হলে নাম-পদবি না মিললেই ‘বাতিল ভোটার’? কমিশনের নিজের নথিতে ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক’ হলে শোধরানো যায়, কেবল ভোটারই পড়েন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র রক্তাক্ত কোপে?
কেন এ রাজ্যেই ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ নামক আশ্চর্য বস্তুর উদ্ভাবন? কেন বিচারকদের আনতে হল সমাধানে? ভোটার তালিকা তৈরি কি বিচারবিভাগের কাজ? না কি, এ আসলে নাগরিকত্ব পরীক্ষাই চলছে, কেন্দ্র যতই অস্বীকার করুক?
কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই কমিশনকে আধিকারিক বদল থেকে তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত সব কিছু করতে হচ্ছে নিশুতি রাতে? কেন শুধু এখানেই ভোটাধিকারের মতো বিষয়ে নির্দেশ পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে এক মাসে ‘একুশ বার’, আর তা আসছে ওয়টস্যাপ বা অ্যাপে, যা সহজেই মুছে ফেলা যায়? এত মানুষের অধিকার নিয়ে ছেলেখেলা চালানো হচ্ছে এমন সফটওয়্যারে, যা একটা গোটা জাতির নাম-পদবির চিরায়ত ছন্দ-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ দিশাহীন? এমন সফটওয়্যার যাতে রাতের বেলা সব নাগরিক হয়ে যায় ‘বিচারাধীন’, কত নাম বাতিল জানতে চাইলে কমিশন বলে ‘জানি না’, আর নাম বাদ গেলে তাকে উড়িয়ে দেয় ‘ছোটখাটো ভুল’ বলে— এমন অপদার্থ, অন্যায়, দায়িত্বজ্ঞানহীন, হৃদয়হীন ‘সিস্টেম’-এর দয়ার প্রত্যাশায় রয়েছে এক কোটির বেশি বঙ্গবাসীর জীবন?
আরও আছে। ২০০২ থেকে ২০২৫-২৬, নির্বাচন কমিশন কেন মেলায়নি মানুষের নামপদবি? সিস্টেমের ভুল যদি হয়, মানুষ কেন তার খেসারত দেবে? তা ছাড়া, তামিলনাড়ু, কেরলে বা উত্তরপ্রদেশে কি একটুও চালানো হয়েছিল লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির কলকব্জা? না কি নামপদবি বিভ্রাট কেবল বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানেরই একচেটিয়া? নির্বাচন কমিশন শুনছি কোনও তথ্য দিতে বাধ্য নয়, কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ এমন ‘প্রশ্নাতীত’ ক্ষমতা দিয়েছে তাদের। তা হলে কী ভাবে জানা যাবে, অন্যান্য রাজ্যে আদৌ লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির অবতারণা হয়েছিল কি না, হলে তার ফল কী হয়েছিল? আর যদি না-ই হয়ে থাকে, তবে কেনই বা হয়নি? কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গে?
কেন এ রাজ্যে ভোট ঘোষণা হয়ে গেল যখন প্রতিটি বুথের ভোটার তালিকা সম্পূর্ণ হযবরল অবস্থায়? যে কোনও অছিলায় ভোটাধিকার হরণ করার এই নির্লজ্জ পরিকল্পনা চলছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, অথচ ভারতের বিচারদর্শন ও শাসনদর্শন বলে— অপরাধ প্রমাণ না-হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি অপরাধী নয়। ভোটার তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়লেন, পড়বেন, যাঁরা এ বারে শেষ অবধি ভোট দিতে পারবেন না— তাঁদের ‘অপরাধ’ প্রতিষ্ঠিত তো? কী বলছে কেন্দ্রের শাসনবিভাগ, বিচারবিভাগ? প্রশ্নটা ভোটাধিকারের থেকে আরও অনেক বেশি গভীর, কেননা এই ‘বাতিল’দের কী পরিস্থিতি হয়, কী ভাবে ‘অবৈধ’ বা ‘সন্দেহভাজন’ হয়ে যেতে হয় রাষ্ট্রের চোখে, তা তো আমরা দেখে ফেলেছি অসম রাজ্যের ট্রাইব্যুনাল কুনাট্যে।
কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ২৯৪টি আসনের জন্য ৪৭৮ জন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক নিযুক্ত হয়, যা ভোটমুখী বাকি রাজ্যগুলির চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি? পশ্চিমবঙ্গে কি যুদ্ধ চলছে, বা জাতি-দাঙ্গা চলছে যে কাশ্মীর আর মণিপুর থেকে আধাসেনা কোম্পানি সরিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে এ রাজ্যে ভোট করাতে? এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ কোনও অভিযোগ করতে পারবে না, কেন এমন নির্দেশ? কেন এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে বসতে দেওয়া বন্ধ, রিটার্নিং অফিসাররা ওলটপালট, নজিরবিহীন ভাবে? এ কি রাষ্ট্রপতি শাসন, না সেনা শাসন?
কেবল ভারতে নয়, পশ্চিমবঙ্গের নাম আজ বিশ্ব-ইতিহাসের অদৃশ্য খাতায় বড় হরফে খোদিত হচ্ছে। এত দিন মোদী-ভারতে গণতন্ত্রের হাল নিয়ে উদ্বেগ আশঙ্কার শেষ ছিল না, এ বার পরের ধাপ। ভারতীয় গণতন্ত্র কবেই শেষ, এখন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থার দফা রফা করে ভারতীয় রাষ্ট্র তার ‘ডিএনএ’ পাল্টে নতুন অবতারে অবতীর্ণ। এককেন্দ্রিক, কেন্দ্রসর্বস্ব, সাম্রাজ্যসমান সেই অবতার।
বাংলার ভোট অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে চলেছে। হিন্দুত্ববাদী, স্বৈরবাদী রাজনীতি যে ভাবে ভারতীয় জাতীয়তাকে তুলে ধরে— সেটাই কি ঠিক? না কি আঞ্চলিক জাতিবোধে উদ্বুদ্ধ, প্রাদেশিক সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ জাতীয়তার সমষ্টিই ভারতীয় সত্তার আসল রূপ? এ বার ভোটদানের সময়ে দক্ষিণ-বাম, হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি, তৃণমূল-বিজেপি জাতীয় নানাবিধ দ্বিত্ব বা ‘বাইনারি’ মোকাবিলার সঙ্গে সঙ্গে এই বৃহত্তর, বিপজ্জনক কেন্দ্র-রাজ্য সংঘর্ষে পক্ষ নেওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। কেননা, তার উপরই নির্ভর করবে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ, এবং ‘ফেডারাল’ ভারতীয়তার আশা।
তবে এটা স্পষ্ট— সে কালের যে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ফেডারালিজ়মই ‘ভারতীয় সংবিধানের আত্মাস্বরূপ’, এ কালের সেই নরেন্দ্র মোদীকে তাঁর ‘সুলতানি’ আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিরোধ পেতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেই। এ রাজ্যের মানুষ আগেও দেখেছে দেশভাগ, দেখেছে কী ভাবে চোখের পলকে দেশহারা হওয়া যায়। তাই আজকের ভয়ঙ্কর সঙ্কটের গুরুত্ব হয়তো বঙ্গবাসীই সবচেয়ে বেশি করে বুঝছে।
আর এখানেই লুকিয়ে আছে ওই প্রশ্নটার উত্তর: ‘কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গ!’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে