West Bengal Interim Budget

শেষ অবধি রাজনীতিই

বাজেট অনুমানের চেয়ে সংশোধিত অনুমানে রাজস্ব খাতে ঘাটতি বেশি হয়েছে ৫,৮৪৯ কোটি টাকা— ৩৫,৩১৫ কোটি টাকার বদলে দাঁড়িয়েছে ৪১,১৬৪ কোটি।

অশোক কুমার লাহিড়ী

শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৩
Share:

প্রশ্ন: বাজেট পেশ করার পর বিধানসভায় সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সুমন বল্লভ।

বহু বছর ধরে বাজেট ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, এমন অভিজ্ঞ আমলারাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে, বাজেট অত্যন্ত নীরস বস্তু। কিন্তু, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় অর্থ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ২০২৬-২৭’এর অন্তর্বর্তী বাজেটটিকে বেশ সরস ব্যাপার বানিয়ে তুলেছেন। এতে কবিতা আছে, আছে বুক-ভরা আশা জাগানোর উপকরণ— কত কিছুতে এগিয়ে বাংলা, কত কিছু হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকরা যা গত ১৫ বছরে করতে বিফল হয়েছেন, সে সব এ বার করে দেখাবেন!

এই বাজেটে অনেক কথা আছে, যেগুলি সত্য হলে সবারই খুব আহ্লাদ হবে। মন্ত্রীর দাবি, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গ শিল্প-উৎপাদন, পর্যটন, পরিষেবা যেমন আইটি ও ডেটা সেন্টার এবং লজিস্টিক হাবের, একটি প্রধান গন্তব্যস্থল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রশ্ন হল, এই সুখবর কি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত, না কি কোনও বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা বা সংবাদমাধ্যম সমর্থিত? “বেসরকারি ক্ষেত্রে, সরকারি ক্ষেত্রে এবং স্বনিযুক্তি মাধ্যমে রাজ্যে ২ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে”— এই তথ্যের সূত্রটিই বা কী?

চলতি বছরে (২০২৫-২৬) রেভিনিউ রিসিপ্টস বা রাজস্ব আয় কত হবে, গত বারের বাজেটে তার ঘোষিত অনুমান (বাজেট এস্টিমেট বা বিই) ছিল ২,৬৬,০৬০ কোটি টাকা। এই বাজেটে সংশোধিত অনুমানে (রিভাইজ়ড এস্টিমেট বা আরই) তা ২,৪৪,৮৬৭ কোটি— অর্থাৎ, ২১,১৯৪ কোটি টাকা কম। তেমনই, রাজস্ব খাতে ব্যয়ও গত বছরের বাজেট অনুমান ৩,০১,৩৭৫ কোটির থেকে ১৫,৩৪৪ কোটি কমে সংশোধিত অনুমানে দাঁড়িয়েছে ২,৮৬,০৩১ কোটি। ফলে, বাজেট অনুমানের চেয়ে সংশোধিত অনুমানে রাজস্ব খাতে ঘাটতি বেশি হয়েছে ৫,৮৪৯ কোটি টাকা— ৩৫,৩১৫ কোটি টাকার বদলে দাঁড়িয়েছে ৪১,১৬৪ কোটি। ২০২৫-২৬ সালে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (গ্রোস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিএসডিপি) ২০,৩১,৮০৫ কোটি ধরলে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ২.০৩%।

মূলধনি খাতে ব্যয় কমানোর প্রবণতা চলতি বছরেও সামনে আসছে। ২০২৫-২৬’এ মূলধনি খাতে ব্যয় (ঋণ পরিশোধ বাদ দিয়ে) বরাদ্দ, বাজেট অনুমান ৪০,০৮৭ কোটি থেকে কমে সংশোধিত অনুমানে ২৬,৮৬৬ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় এক-তৃতীয়া‌ংশ কম। ২০২৪-২৫ এই বরাদ্দ বাজেট অনুমান থেকে সংশোধিত অনুমানে কমেছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। তার আগের বছর কমেছিল ১০%; তারও আগের বছর ৩৫%। মূলধনি খাতে ব্যয় দু’এক বছর বাজেট অনুমানের চেয়ে কম হতেই পারে— কিন্তু, প্রতি বছরই যদি দেখা যায় যে, সংশোধিত অনুমানের অঙ্কটি বাজেট অনুমানের চেয়ে অনেকখানি কম, তবে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠতে পারে।

মূলধনি খাতে ব্যয় প্রসঙ্গে তিনটি প্রশ্ন সামনে ওঠে। প্রথমত, দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিসক্যাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৫ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৯-৩০ পর্যন্ত প্রতি বছর রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ জিএসডিপি-র ৩ শতাংশের নিম্নে রাখতে দায়বদ্ধ। রাজস্ব ঘাটতিই যদি জিএসডিপির ২.০৩% হয়, তবে মূলধনি খাতে ঘাটতির জন্য পরিসর থাকে মাত্র ০.৯৭%। মূলধনি খাতে ব্যয় যে-হেতু প্রায় পুরোটাই হয় ঋণ করে, তাই পশ্চিমবঙ্গে সে ব্যয়ও আটকে যাচ্ছে এই ০.৯৭ শতাংশে। উন্নয়ন হবে কোথা থেকে? ওড়িশায় সরকারের মূলধনি খাতে বিনিয়োগ জিএসডিপির ৬.১১%।

দ্বিতীয়ত, সরকার এত স্বপ্ন দেখাচ্ছে— পরিকাঠামোর উন্নয়ন করবে, একটি অত্যাধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তুলবে, তাজপুর পোর্ট হবে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নন-মেজর গভীর সমুদ্র বন্দর, ঘাটাল অঞ্চলের বন্যা মোকাবিলার জন্য ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান, শিলাবতী-রূপনারায়ণ নদীতে ড্রেজ়িং এবং বাঁধ মজবুত করা হবে— কতগুলির জন্য যথাযোগ্য বরাদ্দ করা হয়েছে? আমার বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৮ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সাত বছর কেটে গেছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের না আছে বাড়ি, শ্রেণিকক্ষ, বা পাঠাগার, এবং না আছেন কোনও শিক্ষক! অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের অধীনে বাজেটে পাঁচটি বাজেট হেডস রয়েছে রাজ্যের কামি, রাজবংশী, বাউরি, সার্কি এবং দামই উন্নয়ন এবং সংস্কৃতিরজন্য। এগুলিতে ২০২৫-২৬ থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বরাদ্দ শূন্য! বছরের পর বছর উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পরিষদের প্রকৃত বরাদ্দ বাজেট অনুমানের চেয়ে কম থাকছে। এ বছরও দেখা গেল, পরিষদের বরাদ্দ গত বাজেটে ঘোষিত অনুমানের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম।

তৃতীয়ত, রাজকোষ ঘাটতি মেটানো হচ্ছে ঋণের মাধ্যমে। এবং, আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করার দায়ভার বইতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। রাজ্য সরকারের ঋণের ভার ২০২৪-২৫’এ ছিল ৬,৯৮,৯৯৭ কোটি টাকা; ২০২৫-২৬’এর সংশোধিত অনুমানে তা ৭,৬২,৩২৭ কোটি টাকা; এবং ২০২৬-২৭’এর বাজেট অনুমান ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাথাপিছু দেনা ৮০,৮৮১ টাকা। আজ পশ্চিমবঙ্গে যতগুলি শিশু জন্মাবে, জন্মমুহূর্তে তাদের প্রত্যেকের মাথার উপরে এই পরিমাণ দেনা। এই ঋণের বোঝার সঙ্গে যদি আমরা তাদের শিল্প, উন্নত কৃষি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা পরিষেবা ও পরিকাঠামো দিতে পারতাম, তা হলে ব্যাপারটা এত অনৈতিক হত না। কিন্তু আমরা কি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোনও উন্নয়নের উত্তরাধিকার দিতে পারব?

শিক্ষাব্যবস্থা বেহাল, চিকিৎসার জন্য হাজারে হাজারে লোক ভিন রাজ্যে যাচ্ছে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, সেচের ব্যবস্থা অপ্রতুল, কৃষিতে একর-প্রতি উৎপাদনশীলতা অন্য অনেক প্রদেশের চেয়ে কম, আর সরকার ঘোর আর্থিক সঙ্কটগ্রস্ত। মহার্ঘ ভাতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে একটি বিশেষ ধাক্কা। সরকার কী ভাবে সামলাবে, সে উত্তর বাজেটে নেই।

নির্বাচন আসছে। জনগণ ভোট দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচন করবে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে মে মাসে। বিধানসভার অনুমোদন ছাড়া সরকারি টাকা খরচ করা যায় না। বিধানসভার অনুমোদন নেওয়া আছে ৩১ মার্চ অবধি। যত দিন না নতুন বাজেট নতুন বিধানসভা দ্বারা অনুমোদিত হচ্ছে, এপ্রিল থেকে তত দিন তো সরকারি কাজ বন্ধ রাখা যাবে না— তার জন্যই এই অন্তর্বর্তী বাজেট। এর অর্থ, সরকার ভোট অন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনুমোদন চাইছে এপ্রিল থেকে চার মাসের জন্য। এটা একটা গতানুগতিক প্রক্রিয়া, এতে কোনও সৃষ্টিশীলতা বা নতুন প্রকল্প ঘোষণার বা পুরনো প্রকল্পের পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

কিন্তু, এই অন্তর্বর্তী বাজেটে অনেক নতুন প্রকল্প ঘোষিত হল। যেমন, মালদহ-মুর্শিদাবাদে গঙ্গার ভাঙন রোধে সার্বিক পরিকল্পনা; ছ’টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকনমিক করিডর; বিভিন্ন জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পার্ক; গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার; হাওড়ার ডুমুরজলাতে স্পোর্টস সিটি। সুদীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে এগুলির কথা মনে হয়নি? হঠাৎ ঠিক নির্বাচনের আগে সমস্ত প্রথা ভেঙে এই ঘোষণাকে ভোটের রাজনীতি ছাড়া আর কী বলা যায়?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন