Gabriel García Márquez

বাস্তবকে বোঝাতে জাদুর শরণ

কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলে আরাকাতাকা শহরে ৬ মার্চ, ১৯২৭ মাতামহের গৃহে জন্ম নেন মার্কেস। গাব্রিয়েল এলিহিয়ো গার্সিয়া ও লুইসা সান্তিয়াগা মার্কেস ইগুয়ারানের এগারোটি সন্তানের জ্যেষ্ঠ। ব্যাপ্টিজ়মের সময় যাঁর নাম দেওয়া হয় গাব্রিয়েল হোসে দে লা কোনকোর্দিয়া।

অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৬
Share:

চুয়াল্লিশ বছর আগে নোবেল মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছিলেন, চিলি, উরুগুয়ে, এল সালভাডর প্রভৃতি দেশ থেকে লাতিন আমেরিকার যত লোক দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে একটা দেশ তৈরি হলে তার জনসংখ্যা হত নরওয়ের চাইতে বেশি। এই অতিকায় বাস্তব কেবল কাগুজে নয়, “এ আমাদের অন্তরে বাস করে, আমাদের অগুনতি দৈনিক মৃত্যুর প্রতিটি মুহূর্তকে নির্ধারণ করে, আর সিঞ্চন করে চলে সদা-অতৃপ্ত সৃজনশীলতার উৎসকে, বিষাদ আর সৌন্দর্যে ভরা, ভাগ্যক্রমে এই ভ্রাম্যমাণ, স্মৃতিকাতর কলম্বিয়ান যার আরও এক নগণ্য কথকমাত্র।”

ভেনেজ়ুয়েলার উপর আমেরিকার প্রত্যক্ষ আগ্রাসন, কলম্বিয়া-সহ অন্যান্য দেশের প্রতি আগ্রাসী পরিকল্পনা ফের মনে করায় এক অতিকায় বাস্তবের কথা। একশো বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের একটি চরিত্র রেমেদিয়োস লা বেইয়া একটা চাদর মেলতে গিয়ে সেটাকে গায়ে জড়িয়ে আকাশে উড়ে যায়। সেটাই এ চরিত্রের পরিণতি। অথচ পাঠকের তা অদ্ভুত মনে হয় না। আদ্যন্ত নিষ্পাপ প্রেমের দিকে আর কোন দৃষ্টি নিয়েই বা তাকানো সম্ভব! কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না উপন্যাসের কর্নেল চিঠির প্রত্যাশায় সারাটা জীবন কাটালেন; সেই অপেক্ষা এখনও যে কোনও পাঠকের জীবনে এক অনপনেয় সত্য। ষাট বছর আগে মুখে মুখে গল্প বলার ধরনে লাতিন আমেরিকার যে বাইবেল তিনি রচনা করছিলেন, তার স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ, বিস্মৃতির মহামারি, অনিবার্য একাকিত্ব— সৃষ্টি (জেনেসিস) থেকে প্রলয় (অ্যাপোক্যালিপস)— সমস্তটাই তাঁর সৃষ্ট ‘মাকোন্দো’-র ঠিক উল্টো গোলার্ধে, অর্থাৎ আমাদের ভূখণ্ডে, আজও একই ভাবে প্রাণবন্ত ও প্রাসঙ্গিক। মার্কেসের জন্মের শততম বর্ষের প্রারম্ভে তাঁকে স্মরণ করাটা তাই শুধু সাহিত্যিক কর্তব্য নয়, ঐতিহাসিক প্রয়োজন।

কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলে আরাকাতাকা শহরে ৬ মার্চ, ১৯২৭ মাতামহের গৃহে জন্ম নেন মার্কেস। গাব্রিয়েল এলিহিয়ো গার্সিয়া ও লুইসা সান্তিয়াগা মার্কেস ইগুয়ারানের এগারোটি সন্তানের জ্যেষ্ঠ। ব্যাপ্টিজ়মের সময় যাঁর নাম দেওয়া হয় গাব্রিয়েল হোসে দে লা কোনকোর্দিয়া। পেশাগত জীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। কলম্বিয়া ও ফ্রান্সে থাকাকালীন প্রথম তিনটি উপন্যাস রচনা করেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৬১ সালে চলে যান মেক্সিকোয়। ১৯৬৭ সালে আর্জেন্টিনার সুদামেরিকানা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর চতুর্থ উপন্যাস একশো বছরের নিঃসঙ্গতা। বাকিটা ইতিহাস।

গার্সিয়া মার্কেস লিখেছেন প্রেম নিয়ে, ক্ষমতা নিয়ে, সম্মিলিত স্মৃতি-বিস্মৃতি, একাকিত্ব, মানবজন্মের আশ্চর্য সৌন্দর্য নিয়ে। এই বিষয়গুলি অবিনশ্বর। একশো বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের কল্পভূমি মাকোন্দোয় যে ইতিহাস রচিত হয় তা নিঃশ্বাস নেয়, নিজের পুনরাবৃত্তি করে, সমাজ ও পরিবারের অন্দরে কোলাহল তোলে। এই ভূমিতে সহাবস্থান করে আশা ও ব্যর্থতা, বিপ্লব ও হতাশা, স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আর সেই জন্যই এখানে পাশাপাশি বসতে পারেন প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের মানুষ।

তাঁর প্রতিটি রচনায় বাস্তব যেন বাস্তবের চাইতে অতিকায় হয়ে দেখা দেয়। সাহিত্যের ভাষায় তা জাদু-বাস্তববাদ। এই জাদু শুধু একটি সাহিত্যিক কৌশলমাত্র নয়। আসলে তা বিশ্বের দিকে তাকানোর এক বিশিষ্ট দৃষ্টি। এ শুধু লাতিন আমেরিকার নিজস্ব বাস্তবমাত্রও নয়। এই যে ভারতের নাগরিকদের হঠাৎ এক সকালে উঠে নাগরিকত্বের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, এর পরিপূর্ণ বর্ণনা বোধ হয় শুধু বাস্তবানুগ হওয়া সম্ভব নয়। জাদু-বাস্তববাদ বেশি সহায়ক হতে পারে। কারণ এই সব অত্যাশ্চর্য, অভাবনীয় ঘটনা বাস্তবকে খণ্ডন করে না, বরং তার থেকেই জন্ম নেয়। ইতিহাস যখন কিম্ভূত পথে হাঁটতে থাকে, তখন তার বিবরণে অস্বাভাবিকতাই প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তাই লেখক, পাঠক, সকলকেই মার্কেসের কাছে ফিরতে হয়।

সেই ফিরে যাওয়ার আর একটি আকর্ষণ গার্সিয়া মার্কেসের অতুলনীয় ভাষা। তিনি ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করেছেন সৌন্দর্যের আধারে, অনুভবের কথা বলেছেন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কবিতায় আর মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন প্রশান্তির সঙ্গে। আজকের সংক্ষিপ্ত, দ্রুত ও অকাব্যিক ভাষার সময়ে তাঁর শরণ নেওয়া বড়ই দরকার। পাবলো নেরুদার সঙ্গে একটি কথোপকথনে গার্সিয়া মার্কেস বলেছিলেন আজীবন তিনি গদ্যের মধ্যে কবিতার সন্ধান করেছেন।

কলেরার সময়ে প্রেম যেন এই কবির মহাকাব্যিক প্রেমের উপন্যাস। এখানে ফ্লোরেন্তিনো আরিসা আর ফেরমিনা দাসার প্রেম পরিচিত রোম্যান্স অতিক্রম করে পৌঁছে যায় অপেক্ষার জেদে, একটি অনুভূতির প্রতি আজীবন বিশ্বস্ততায়। তাৎক্ষণিক সম্পর্কের যুগে প্রেমিকার জন্য তার প্রেমিকের একান্ন বছর, নয় মাস ও চার দিনের প্রতীক্ষা যেন বৈপ্লবিক মনে হয়। মার্কেসের সৃষ্ট চরিত্রেরা আজও বেঁচে আছে, কারণ তারা আমাদের ঠিক পাশের আসনে বসা যাত্রীর মতো— তারা একই সঙ্গে ভালবাসে ও ঘৃণা করে, স্বপ্ন দেখে ও ব্যর্থ হয়, বীরত্বে উদ্ভাসিত হয় ও ভয়ে কাতর হয়। প্রশ্ন করে, সান্ত্বনা দেয়। একটি দেশ বা সময়কে জানার জন্য নয়, মার্কেসকে আমরা পড়ি মানুষকে বোঝার জন্য।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন