জোধা বাই মহলের অন্দরবাটি। ১৫৮৫ সালের মে মাস। সম্রাট আকবরের রাজপুত স্ত্রী সাজ করছেন। সম্রাট তাঁর অপরূপা স্ত্রীকে দেখছেন লাল বেলেপাথরে মোড়া ঘুলঘুলির ফাঁক থেকে। অন্দরমহলের অনুপ সরোবরের জল গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহকে প্রশমিত করছে শুষ্ক বাতাসে বাষ্পীভবন-জাত শীতলীকরণের মাধ্যমে। ভিতর-বারান্দার ভেজা পর্দা ‘সুক’ এই প্রশান্তিতে যোগ দিচ্ছে। স্ত্রীর মুখদর্শন শেষে দরবার মহলের দিকে হেঁটে ফিরছেন সম্রাট। টানা ভিতর-বারান্দার দেওয়ালে দেওয়ালে ‘সালসাবিল’ (বিশেষ ধরনের জলের ধারা বা ফোয়ারা)-এর মতো স্থাপত্যকর্ম, যার শীতল বাতাস সেই মুগ্ধতাকে দীর্ঘায়িত করে তুলেছে। ষোড়শ শতকের মোগল প্রাসাদের এমনই স্থাপত্য শৈলী শুষ্ক উত্তরপ্রদেশের জন্য উপযোগী ছিল। তবে এর সুফল যে বাংলার ঘরে ঘরে কখনও পৌঁছানো যাবে না, এমনটিই বা কে বলছে?
বাংলার গ্রীষ্মে কালবৈশাখী আর প্রতি বছর ফিরে আসা বর্ষার দিনগুলি প্রশান্তি বয়ে আনে। তবে, এমন বর্ষামঙ্গল প্রতি বছর আমাদের ভাগ্যে জোটে না। কখনও তিন বছর, কখনও পাঁচ কিংবা সাত বছর পর পর এক সুতীব্র খরায় আচ্ছন্ন হয় গোটা ভারত। এর পিছনে রয়েছে উত্তর পেরুর তীরবর্তী, সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রস্রোতের উষ্ণায়ন। জানা যায় যে, সপ্তদশ শতকের কোনও এক সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে পেরুর জেলে সম্প্রদায় সোহাগ করে নাম দিয়েছিল ‘এল নিনিয়ো’, যার অর্থ ‘খোকাবাবু’। ১৮৭৭ সালের সেই এল নিনিয়ো-র প্রভাবে ভারতে প্রায় দু’কোটি আর চিনে তিন কোটি মানুষ প্রাণ হারান। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণায়নে সামুদ্রিক বাণিজ্য বায়ুর নিরবচ্ছিন্নতা বিঘ্নিত হয়। মৌসুমি বৃষ্টি সাগরের পথ পাড়ি দিয়ে ভারত পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। উপমহাদেশ থাকে শুষ্ক। ১৮৭৭ সালের ‘খোকাবাবু’কে সুপার এল নিনিয়ো বলে আখ্যা দেন বিজ্ঞানীরা। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সামুদ্রিক ও আবহাওয়া অধিদফতর শতকরা ৬০ ভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে বলছে যে, এ বছর আবার ফিরছে সুপার এল নিনিয়ো।
এই মহা প্রত্যাবর্তনের প্রভাব হতে পারে ভয়ঙ্কর। সুপার এল নিনিয়ো দিনের গড় তাপমাত্রা বাড়াবে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর রাতের ৫-৬ ডিগ্রি। এর সঙ্গে যুক্ত হবে অনাবৃষ্টি। অর্থাৎ, এ বছর মে থেকে জুলাই অবধি, শুষ্ক আর তপ্ত দিন যাপন করতে হতে পারে বাংলা-সহ পুরো ভারত উপমহাদেশের মানুষকে। এক দিকে তা যেমন ফসলের চরম ক্ষতির কারণ হতে পারে, অন্য দিকে তাপদাহে হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে উল্লেখযোগ্য হারে। নবগঠিত রাজ্য সরকারকে এই বছরের জন্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি মোগল আমলে ব্যবহৃত প্রযুক্তির পুনর্ব্যবহার করে। সালসাবিল, অনুপ সরোবর কিংবা সুকের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সহজ। জল তার চার পাশের তাপকে শোষণ করে বাষ্পীভূত হতে পারে। এই কারণেই, স্নানের পর শরীর শীতল হয়। তবে, অত্যন্ত আর্দ্র দিনে এমনটি কম ঘটতে দেখা যায়। যে-হেতু এ বছর এল নিনিয়ো-র প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করবে, তাই বাষ্পীভবন-জাত এই মোগল প্রযুক্তি বাংলাতেও যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে।
বাষ্পীভবন-ভিত্তিক শীতলীকরণের এ-হেন যন্ত্র ঘরেই তৈরি করা যায়। একটি ১০০ বর্গফুটের ঘরের জন্যে ২৫টি ছিদ্রযুক্ত ভেজা ইট দিয়ে ও ঘরের বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ইটের তৈরি এই যন্ত্রটি শুষ্ক দিনে (অর্থাৎ, আর্দ্রতা ৪০% নীচে হলে) ঘরের গড় তাপমাত্রা কমাতে পারে ৫ ডিগ্রি বা তারও বেশি। অর্থাৎ, ৪০ ডিগ্রির উত্তপ্ত দিনে ঘরের তাপমাত্রা কমে দাঁড়াতে পারে ৩৫ ডিগ্রি। রাতে, এই তাপমাত্রা আরও খানিক কমবে। শরীর রাতে অন্তত বিশ্রাম পাবে। কমবে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি। তবে, আর্দ্রতা শতকরা ৫০ ভাগের বেশি হলে গড় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। আর, অতি-আর্দ্র দিনে এই প্রযুক্তি একেবারেই কার্যকর হবে না।
বর্তমান জ্বালানি সঙ্কটের বাস্তবতায় লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনাও কি প্রকট নয়? সে ক্ষেত্রে মোগল প্রাসাদে ব্যবহৃত সুক-এর মতো পাট বা কাপড়ের তৈরি পর্দা ভিজিয়ে জানলায় ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে বাইরের উষ্ণ বাতাস শীতল হয়ে ঘরে প্রবেশ করবে। পর্দার বুনট যেন খুব ঘন না হয়; অর্থাৎ পর্দাটি যেন বায়ুপ্রবাহকে রুদ্ধ না করে। ঘরের দক্ষিণ খোলা জানলায় এই পর্দা ব্যবহার করলে তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। এ ক্ষেত্রেও, শুষ্ক দিনে এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বেশি কাজে দেবে। যে জল ব্যবহার করা হবে তা যেন বিশুদ্ধ হয়। আর পর্দাটি অতি দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে ব্যবহার করলে, তাতে জীবাণু জমতে পারে। তাই দিন দশেক এক টানা ব্যবহারের পর একে রোদে শুকিয়ে আবার টাঙাতে হবে।
এ ছাড়া ঘরের ভিতর বাতাসের প্রবাহকে সহজ করার জন্যে ঘুলঘুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির চার পাশে গাছ রোপণ করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকারের কাছে রাজপথের চার পাশে গাছ লাগানোর আবেদনও করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সব সময় অত্যাধুনিক হতে হবে, এমনটি নয়। আদিজ্ঞানের শক্তিকে অস্বীকার করা ঠিক নয়। অতীতের প্রযুক্তির যথাযথ পুনর্ব্যবহার কখনও কখনও অধিকতর কার্যকর। জোধা বাইয়ের সাজঘরের শীতল সমীরণ আমাদের সে বার্তাই জানিয়ে যায়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে